অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অবদান

সর্বশেষ আপডেটঃ

সেলিনা আক্তার : যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের শুরুতেই জাতির পিতা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। স্বাধীনতা লাভের নয়মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু জাতিকে উপহার দেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। যে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। ২৮(১) অনুচ্ছেদে রয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’ এবং ২৮(২) অনুচ্ছেদে আছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন’। সরকার গঠনের শুরু থেকেই নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে জাতির পিতার নির্দেশনা ছিল। দেশে রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু সরকারই প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে।

সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রই নারীদের চলাচল এবং বসবাসের জন্য হবে নির্বিঘ্ন। যার নিশ্চিত পরিবেশ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। নারীর কর্মক্ষেত্র আরও বেশি নির্বিঘ্ন করতে হবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের যে লক্ষ্য নিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে তা পূরণ করতে হলে পুরুষের সঙ্গে নারীকেও এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এজন্য আমাদের রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। এই বিশাল জনসংখ্যার অংশ হলো নারী ও পুরুষ। যে দেশগুলো বিশ্বে উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়াতে পেরেছে সেইসব দেশই নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করেছে। একসময় যে-যে ক্ষেত্রগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ চিন্তা করা যেত না অথবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেত সেই ক্ষেত্রগুলো এখন মুক্ত। ফলে নারীরা স্বাধীনভাবে এসব ক্ষেত্রে অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। দেশ যতই এগিয়ে চলেছে পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন হলো দেশের উন্নয়ন কাজে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ।

আজ প্রতিটি কাজে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষ, কৃষি, শিল্প, ব্যাবসাবাণিজ্য, প্রবাস, আইসিটি মোটকথা অর্থনীতির প্রতিটা ক্ষেত্রে নারীর অবদান বাড়ছে। যেখানে নারীরা ঘরের কাজ করত এখন সেখানে কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা করছে। বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংসার পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে তারা চাকরি না হয় ব্যাবসা করছে। গ্রামে প্রায়ই ছোটোখাটো দোকান চালাতে দেখা যায় নারীদের। ঘরে বসে আজ ইকমার্সের যুগে নারীরা ব্যাবসা করছেন বাংলাদেশে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে যেখানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১৬ দশমিক ২ লাখ সেখানে ২০১৬-১৭ সালে এস তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬ লাখ।

১৯৭৪ সালে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশে এটি শ্রমবাজারে পুরুষ শ্রমিকের হার বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বিগত বছরগুলোতে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ। ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে গ্রমীণ নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার শহরের নারীর তুলনা বেশি।

এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)- এর জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট ৪২ লাখ ২০ হাজার পোশাক শ্রমিকের মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৯৮ হাজার। পোশাক খাতের পরই প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্নরকম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাদের অনেকে দেশে ফিরে আসছে। বহুনারী প্রবাসে শত কষ্ট সহ্য করেও গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী প্রবাসে কাজ করতে গেছেন।

শহরে কর্মজীবী নারীর সঙ্গে গ্রামীণ নারীরাও হাতের কাজ যেমন- নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে হাঁস-মুরগির খামার, গাভী পালন, কৃষিকাজ ইত্যাদি নানাভাবে সংসারের আর্থিক অবস্থা পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে এবং কোনো কোনো সংসারে আর্থিক আয়ে নারীই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী কৃষিকাজে নিয়োজিত রয়েছে।

কৃষি তথ্যসার্ভিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেশে মোট কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কৃষিকাজে নারী শ্রমশক্তির ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়োজিত কৃষিকাজে। প্রবাসী আয় প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। নিঃসন্দেহে এ অবস্থানে নিয়ে যেতে দেশের নারী শ্রমিকেরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সূত্রে, বর্তমানে দেশে ৩ লাখ মানুষ অনলাইনে ব্যাবসা পরিচালনা করছেন আর এদের অর্ধেকই নারী ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা। এই উদ্যোক্তরা নিজের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে মাসে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছে। দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সংঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির মধ্যে ৫০ লাখই নারী।

বাংলাদেশের আজ যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এর পেছনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান রয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা কিন্তু অতীতকাল থেকেই অবহেলিত। পৃথিবীতে আজ আমরা যে অধিকার বলে চিৎকার করি সে অধিকার আদায়ের শুরুটা পৃথিবীর আলো দেখিয়ে একজন নারীই করেছে। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করে নিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নারীদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। ঘরের কোণ থেকে বের হয়ে আজ মহাশূন্য পর্যন্ত তাদের পদচিহ্ন রাখছে সফলতার সঙ্গে। তবে কাজের ক্ষেত্র বাড়লেও কমেনি নারীর ওপর সহিংসতার হার। তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখা হচ্ছে, বাসে ট্রামে গণধর্ষণ শেষে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এতসব করেও নারীরা আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সমান অংশীদার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অর্ধেক শক্তি। নারী শক্তি বাদ দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার দর্শন অনুসারে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন ধারা সূচিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগের ফলে উচ্চশিক্ষাসহ সকল ধরনের শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা ও নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর নিরাপত্তা, সুরক্ষা, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। নারী ও শিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন কঠোরভাবে দমন এবং প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদারকরণের লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ধারা ৯ এর উপ-ধারা (১) এর অধীন ধর্ষণের অপরাধের জন্য “যাবজ্জীন সশ্রম কারাদন্ড” শাস্তির পরিবর্তে “মৃত্যুদন্ড” করা হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ফোরাম ২০২০ এর প্রতিবেদন অনুসারে নারীপুরুষের বৈষম্য হ্রাস করে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শীর্ষে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম।বাংলাদেশ আজ নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোল মডেল। এরই স্বীকৃতি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে “পিস ট্রি”, ২০১১ ও ২০১৩ সালে দুইবার “সাউথ সাউথ”, ২০১৬ সালে “প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন”, ২০১৬ সালে “এজেন্ট অব চেঞ্জ” ও ২০১৮ সালে “গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড” পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনীতির সকল কার্যক্রমে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০৪১ সালের পূর্বেই বাংলাদেশ উন্নতসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

(ঊষার আলো-এমএনএস)