অশ্লীলতার এমন কি হতে পারে কাশবনে?

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো প্রতিবেদক : আমরা কোনো অশুদ্ধতা-অশ্লীলতা একেবারে মেনে নিতে পারি না। তবে আমরা ঘুষ খেতে পছন্দ করি। ঘুষের টাকায় জমি, বাড়ি, গাড়ি, দামি সব জিনিস কিনে বুক ফুলিয়ে চলতে পারি।

শরৎকালটা বেশ ছিমছাম সুন্দর। সূর্যের আলোয় ঝলমল করে চারদিক। আর নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় স্নিগ্ধ সাদা মেঘের ভেলা। সেই স্নিগ্ধতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৃদু বাতাসে দোল খায় কাশফুল। মন ভালো করা এসব দৃশ্য উপভোগ করতে মানুষ ছুটে যায় কাশবনে। মনের স্বাস্থ্য নিয়ে উদাসীন এই দেশে এগুলো মোটেও ভালো কোনো কাজ না, রীতিমতো অশ্লীলতা! অন্তত সিলেটের গোলাপগঞ্জে সম্প্রতি কাঁশবনে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা সেই কথাই প্রমাণ করে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গোলাপগঞ্জের চৌঘরী এলাকার এক ব্যক্তির জমিতে প্রচুর কাশফুল হয়েছে। সেই কাশবন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসছিলেন। সঙ্গী কখনো স্বজন, কখনো বন্ধু-বান্ধব। মানুষের কাশবন দেখার এত আনন্দ-আহ্লাদ স্থানীয় লোকজনের ভালো লাগেনি। তাঁরা কাশবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। এই আগুন ধরিয়ে দেয়াটা বৈধ করতে চরিত্র ধরে টান দিয়েছেন তাঁরা। আরও খুলে বললে ‘অশ্লীল, অসামাজিক’ শব্দগুলো বলেছেন।

আমরা তো শুদ্ধ জাতি! আমরা কোনো অশুদ্ধতা-অশ্লীলতা একেবারে মেনে নিতে পারি না। তবে আমরা ঘুষ খেতে পছন্দ করি। ঘুষের টাকায় জমি, বাড়ি, গাড়ি, দামি সব জিনিস কিনে বুক ফুলিয়ে চলতে পারি। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারি। পর্ণ সাইট দেখতে পারি। ‘শুদ্ধ’ মানুষ হিসেবে আমাদের দেখার কথা না থাকলেও নায়িকাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ছবিগুলো মন দিয়ে দেখি। দেখতে খুব সুখ লাগে। কিন্তু এই গোপন সুখের কথা তো মানুষকে বলা যায় না। বললে জাত চলে যাবে না? লোকে কী আর ‘শুদ্ধ’ মানুষ বলবে আমাদের! ফলে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ওই সব ছবির মানুষের চরিত্র ধরে টান দিয়ে বাজে বাজে সব মন্তব্য করা। আমাদের মনটা অশ্লীলতায় ভরা তো কী হয়েছে, ‘শুদ্ধ’ মানুষ হিসেবে অন্যকে শালীনতার জ্ঞান দেওয়া আমাদের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য।

আমরা শালীন, সামাজিক, সভ্য মানুষ হলে অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতাম। আমাদের সংবিধানে এটাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না’ মর্মে ঘোষণা দিয়েছে। ব্যক্তি কোথায় ঘুরতে যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন; এটা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এটা নিয়ে আমরা তাঁকে বিরক্ত, বিব্রত করতে পারি না। ব্যক্তির কোনো আচরণ যদি উৎপাতের সৃষ্টি করে, আমরা আইনের শরণাপন্ন হতে পারি। কিন্তু কোনোভাবেই নিজেরা ‘নৈতিক পুলিশ’ সেজে শাস্তি দিতে পারি না। এটা রীতিমতো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো। কাশবনে কথিত অশ্লীলতা ঠেকাতে গিয়ে আমরা আইন ভেঙেছি। আমরা মোটেও সুনাগরিকের পরিচয় দিইনি।

এই যে কাশবনে ‘অশ্লীল কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ আনা হলো, সেখানে গিয়ে মানুষ আসলে কতটা খারাপ কাজ করতে পারে? নিশ্চয় ছবি তুলে, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে গল্প করে, প্রেমিক বা প্রেমিকা হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়। যে জায়গায় এত এত মানুষ যায়, সেখানে এর চেয়ে বেশি মানুষ কী করতে পারে! যদি এর চেয়ে বেশি কিছু এখানে ঘটে থাকে স্থানীয় লোকজন সেটা পুলিশকে জানাতে পারত। কিন্তু কথিত অশ্লীলতা ঠেকাতে গিয়ে কাশবনে আগুন দিয়ে আইন ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। কাশবন তো আর কোনো ‘অশ্লীল কাজ’ করেনি। কেন তাকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হলো? অথচ চাইলেই সুন্দর এই কাশবন ঘিরে ছোটখাটো একটা মৌসুমি পর্যটনব্যবসা করা যেত। টিকিটের ব্যবস্থা, কাছেই বসে চা-পানি পানের মতো আয়োজন, টাকার বিনিময়ে ছবি তোলার সুযোগ ইত্যাদি বেশ পর্যটকবান্ধব হতো। স্থানীয় অর্থনীতিতে টাকার আনাগোনা বাড়ত।

গণমাধ্যমে আমরা দেখি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ফুলের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে যায় এদিক-সেদিক। চেরি, টিউলিপ, গোলাপসহ নানা ফুলের জন্য মানুষের সে কী ভালোবাসা, উন্মাদনা! আমাদের চেরি-টিউলিপ নেই তো কী হয়েছে; আমাদের আছে বর্ণিল কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালু, জারুল, শিমুল, পলাশ, কাশবন। প্রকৃতিকে ভালোবেসে আমরা তাদের কাছেই ছুটে যাব, ছবি তুলব, আনন্দে সময় কাটাব।

(ঊষার আলো-এমএনএস)