ই-বর্জ্য: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

সর্বশেষ আপডেটঃ

গাজী শরীফা ইয়াছমিন : পুরান ঢাকায় সাজ্জাদ হোসেনের পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকান। ছোটবেলা থেকে বাবার এই দোকানে আসা-যাওয়ার মধ্যদিয়েই কাজ শেখা ও হাতেখড়ি তার। সাদাকালো টিভির যুগ পেরিয়ে বর্তমানে তার দোকানে শোভা পাচ্ছে নানা মডেলের রঙ্গিন টিভি, ফ্রিজ, ওভেন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য। পরবর্তীতে তিনি সেসব থেকে প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক, লোহা আলাদা করে বাকিগুলো ফেলে দেন। এসব ভাঙ্গা বা আলাদা করার কাজ খালি হাতেই করে থাকেন তিনি। এজন্য তার বাড়তি কোনো প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন তিনি।

ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য বলতে পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতিকে বোঝায়। এগুলো মূলত ভোক্তার বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন- ফ্রিজ, ক্যামেরা, মাইক্রোওয়েভ, কাপড় ধোয়া ও শুকানোর যন্ত্র, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি। দৈনন্দিন ব্যবহার্য এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে-সাথেই তা বর্জ্য পদার্থে পরিণত হয়। এসব যন্ত্রপাতিতে মানবস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অনেক ক্ষতিকর এমন সব উপাদান থাকে। যেমন- কম্পিউটারের সিপিইউ বা কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রাংশটির মতো কিছু-কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে সীসা, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম ইত্যাদি ক্ষতিকর পদার্থ থাকা সম্ভব, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র, যকৃৎ, বৃক্ক, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, ত্বক ইত্যাদির জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও পুরানো জাহাজ, যেগুলো ভাঙ্গার জন্য দেশে আনা হয়, সেগুলোর মধ্যেও ই-বর্জ্য থাকে। এসব বিষাক্ত উপাদান মাটি এবং পানির মাধ্যমে চক্রাকারে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে সৃষ্ট এসব ‘ইলেকট্রনিক বর্জ্য’ বা ‘ই-বর্জ্য’ শব্দটির বিষয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের এখনো সচেতনতার অভাব রয়েছে, এমনকি এ শব্দদুটিও দেশের অধিকাংশ মানুষের অজানা রয়ে গেছে। সময় এসেছে এর দ্বারা সৃষ্ট বিপদ ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অনুধাবন করার।

এশিয়ার ই-বর্জ্য নিয়ে ইউনাইটেড ন্যাশনস ইউনিভার্সিটির ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে এশিয়ায় ই-বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। মানুষের আয় বৃদ্ধি, নতুন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা এবং যন্ত্রগুলো দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া ই-বর্জ্য বাড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে ১ লাখ ৪২ হাজার মেট্রিক টন ই-বর্জ্য বের হয়েছে। এ হিসেবে ২০২১ সালে ১ হাজার ১৬৯.৯৮ টন মোবাইল ই-বর্জ্য বের হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিশ্বে দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে চলছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ব্যাপক ক্ষতিকর। এর কারণে ক্যান্সারে পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। এ বর্জ্যে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। অধিদপ্তরের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৪ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়েছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে এটি ১২ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে গত ১০ বছরে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ গুণ।

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স মার্চেন্টাইস ম্যানুফ্যাকচার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৩২ কোটি টন ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহার করা হয়। প্রতি বছর ৫০ হাজারের মতো কম্পিউটার আমদানি করা হয়। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার পরিমাণ ২০২৩ সালে দাঁড়াবে প্রায় ১২ লাখ টন।

ঢাকায় মানবাধিকার সংগঠন ‘ভয়েস’ আয়োজিত ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৮ লাখ মেট্রিকটন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়ে থাকে। গত দুই দশকে শুধু সেলফোন থেকে উৎপন্ন হওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫০৪ টন। এছাড়াও প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০২টি টিভি অকেজো হয়ে যায় এবং তা থেকে ১৭ লাখ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। প্রায় ৫০ হাজার শিশু এই বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর যে পরিমাণ শিশুশ্রমিক মৃত্যুবরণ করে, তার প্রায় ১৫ শতাংশ ই-বর্জ্যজনিত কারণে হয়ে থাকে। এছাড়াও ৮৩ শতাংশ মানুষ বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসে।
বাংলাদেশ মোবাইল ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশে ই-বর্জ্য রোধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে। নষ্ট মোবাইল ফোন ফেরত দিলে যাতে ফোনের মালিক কিছু টাকা পান, এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে করে ই-বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে না রেখে মানুষ তা নির্দিষ্ট স্থানে দেয়ার জন্য উৎসাহিত হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এবং মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’ প্রণয়ন করেছে। এ বিধিমালার আওতায় ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্য বা ই-বর্জ্য উৎপাদনকারী বা সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানকেই ফেরত নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবহারের পর নষ্ট বা বাতিল মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ অন্যান্য ই-বর্জ্য ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ পাবেন ব্যবহারকারীরা, এ মর্মেও বিধিমালায় শর্ত আরোপ করা আছে। এমন শর্ত রেখেই এই বিধিমালার ফলে বিদেশ থেকে এখন আর কেউ পুরনো বা ব্যবহৃত মোবাইল বা ল্যাপটপ আনতে পারবেন না। বিধিমালার কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত, ২০১০)’ এর ১৫ (১) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধের ক্ষেত্রে দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা দুই থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রদানের বিষয়ে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিধিমালায় প্রস্তুতকারক, সংযোজনকারী ও বড় আমদানিকারকের ই-বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বিধিমালা বাস্তবায়নের প্রথম বছর প্রস্তুতকারক, সংযোজনকারী ও বড় আমদানিকারককে উৎপাদিত ই-বর্জ্যের ১০ শতাংশ সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয় বছরে ২০ শতাংশ, তৃতীয় বছরে ৩০ শতাংশ, চতুর্থ বছরে ৪০ শতাংশ ও পঞ্চম বছরে ৫০ শতাংশ ই-বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে বলেছেন, এর জন্য বিজনেস প্ল্যান বা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়। তাহলে এটা আর ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে না। তার মতে, বর্তমান সময়ে ই-বর্জ্য কমানো যাবে না, বরং আমাদের ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল পণ্যের ব্যবহার আরো বাড়বে। পুরনো প্রযুক্তি বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে হবে। পাশাপাশি এ সংশ্লিষ্ট যথাযথ ব্যবস্থাপনাও করতে হবে।

বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে এনএইচ এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে জানা যায়, টেলিকম অপারেটর থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এখানে সীমিত পরিসরে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের দিয়ে পুরোনো হ্যান্ডসেট কিনে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বড় আয়োজন করে এমন আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ই-বর্জ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সাথে বাংলাদেশের জন্যও বড় ধরণের সমস্যা হয়ে উঠছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও এর কারণ হিসাবে ধরা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রথমেই প্রয়োজন কি পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়, তা নিরূপণের ব্যবস্থা করা। এরপর এগুলোর জন্য স্থায়ী ভাগাড় ও রিসাইক্লিং কারখানা স্থাপন করা। ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। প্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখা। এতে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ট্যাব বেশিদিন ব্যবহার করা যাবে। দ্বিতীয়ত, গুরুত্ব দিতে হবে পুরোনো সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর। একই যন্ত্র একাধিক কাজ করবে, এমন মাল্টিপারপাস ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, একই চার্জারে সব কোম্পানির, সব মডেলের মোবাইল চার্জ করা যায়, এমন চার্জারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ইউনিফরমের ব্যবহার, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি উৎপাদন, আমদানি, বিপণন, ব্যবহার এবং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।সরকারের পাশাপাশি সচেতন

নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত যত্রতত্র ই-বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং অপরকে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিকল্পনা না নিলে আগামীতে এগুলো জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য ভয়ংকর ঝুঁকি তৈরি করবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম (৫ম পর্যায়) প্রকল্প কার্যক্রম।

(ঊষার আলো-এমএনএস)