উচ্চ উৎপাদনশীলতা হোক আমাদের অঙ্গীকার

সর্বশেষ আপডেটঃ

এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ : কোন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উৎপাদনশীলতা অর্থনৈতিক অগ্রগতির মান ও ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। সহজ কথায় উৎপাদনশীলতা হলো পূর্বের চেয়ে কমসম্পদ ব্যবহার করে অধিক পরিমাণে কিংবা বেশি মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদান। যে দেশ যত উন্নত, সে দেশের উৎপাদনশীলতাও তত বেশি হয়। উৎপাদনশীলতা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও ২ অক্টোবর ‘জাতীয় উপাদনশীলতা দিবস’ শিল্প মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল প্রোডাকটিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও) এর উদ্যোগ সপালন করা হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্র হলো- ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় উৎপাদনশীলতা’।

২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে সরকার উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। এজন্য দেশের অর্থনৈতিক খাতের উৎপাদনশীলতাকে কাঙ্ক্ষিতমানে উন্নীত করতে আন্তঃসরকার প্রতিষ্ঠান এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানিজেশন (এপিও) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও) যৌথভাবে ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান ২০২১-২০৩০ প্রস্তুত করেছে। মাস্টার প্ল্যানে ২০৩০ সাল নাগাদ উৎপাদনশীলতার গড় ৫.৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে শক্তিশালী ও টেকসই করতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মোকাবেলায় উৎপাদনমুখী যে-কোনো প্রতিষ্ঠানকে জ্ঞানভিত্তিক মূলধন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন উদ্ভাবনের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। একইসঙ্গে, ভবিষ্যতেও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে টেকসই পদ্ধতিতে যাতে উৎপাদন করা হয়, সে বিষয়েও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। উৎপাদনশীলতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির সকলখাতে উচ্চ উৎপাদনশীলতাকে উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার আলোকে প্রতিবছর ২ অক্টোবর জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত হচ্ছে। এছাড়া, উৎপাদনমুখী বিভিন্নখাত, উপখাত এবং কুটিরশিল্পসহ এসএমই ও শিল্প/সেবা প্রতিষ্ঠান খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড এবং ইনস্টিটিউশনাল এপ্রিসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ হতে এসকল সহায়তার ফলে অর্থনীতির প্রতিটিখাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ সালে আমাদের জাতীয় উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ছিল বার্ষিক ৩.৮ শতাংশ। এটি এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশন (এপিও)-এর সদস্যভুক্ত ২০টি দেশের গড় উৎপাদনশীলতার চেয়ে বেশি।

উৎপাদনশীলতার টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার মৌলিক লক্ষ্য নিয়ে জাপানের সহায়তায় এনপিও ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান ২০২১-২০৩০ প্রস্তুত করেছে। মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য দক্ষজনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত রূপান্তর বা স্ট্রাকচারাল ট্রানসফর্মেশনের কোনো বিকল্প নেই। তবে এর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট একটি উপায় নেই, বরং উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সেই বিবেচনায় বহুমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এমন প্রভাবকসমূহের সঠিক ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রবণতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রাপ্ত সুযোগগুলোর দ্রুত ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হবে।

মাস্টার প্ল্যানে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ৫.৬ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি এক্ষেত্রে আরো পাঁচটি গুণগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসকল গুণগত লক্ষ্য অর্জনে ১১টি কৌশলগত থ্রাস্ট (strategic thrust) শনাক্ত করা হয়েছে। প্রথম লক্ষ্যটি হলো উদ্ভাবনমুখী ও দক্ষ উদ্যোগ সৃষ্টিসহ উৎপাদনশীল উদ্যোগকে সম্প্রসারিত করা। এর ফলে কাঁচামালের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম ব্যবহার, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্ভাবনা ও সুযোগকে কাজে লাগানো এবং পণ্যে উচ্চমূল্য সংযোজন করা সম্ভব হবে। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ‘কম উৎপাদন-কম প্রবৃদ্ধি’র চক্র হতে বের করে আনার পাশাপাশি বড়ো শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। দ্বিতীয় লক্ষ্যটি হলো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য ও সেবা উৎপাদনকারীখাত সম্প্রসারণ করা। এজন্য টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে আপোশহীন নীতি বজায় রেখে সকলখাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা হবে, কৃষিখাতকে আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় করা হবে, তৈরি পোশাক উৎপাদন শিল্পের ওপর নির্ভরতা হতে বেরিয়ে এসে সামগ্রিক শিল্পখাতকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করা হবে। এছাড়া, প্রথাগত সেবাখাতের উন্নতির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী আধুনিক সেবাখাত তৈরি করা হবে। তৃতীয় লক্ষ্য উচ্চ সক্ষমতাবিশিষ্ট ও পরিশীলিত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম এমন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। চতুর্থ লক্ষ্য ব্যবসা পরিচালনায় শক্তিশালী সহায়ক শক্তি (business enabler) গড়ে তোলা। পঞ্চম লক্ষ্য অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার উন্নয়নকে টেকসই করতে বৃহৎ পর্যায়ের সামষ্টিক সহায়ক শক্তি (macro enabler) তৈরি করা। এটি বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, অবকাঠামো, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নসহ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ভূমিকা পালন করবে।

অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার উন্নয়নে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের সাথে জড়িত সকলকে সচেতন হতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীলতার উন্নয়নকে আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করে এর সাথে জড়িত সকল প্রক্রিয়াকে জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে, উৎপাদনশীলতার সঙ্গে জড়িত তিনটি প্রধান টার্গেট গ্রুপের (শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা ও উৎপাদনখাত) নিকট পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান (Key institutions) ও অংশীদারদের একসাথে কাজ করতে হবে। উৎপাদনশীলতার উন্নয়নে ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি কাউন্সিল সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে, যেগুলো ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল। এছাড়া সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ, এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক, বিসিএসআইআর, বিএসটিআই, এনএসডিএ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে।

ইতিমধ্যে উৎপাদনশীলতার উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্নখাতের চাহিদা নিরূপণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি কাউন্সিল ও শিল্প মন্ত্রণালয়। কৃষি, সেবা ও শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতার বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ (labour force survey) মাধ্যমে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীদের মাঝে উৎপাদনশীলতার বিষয়ে ধারণা সৃষ্টিতে নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে উৎপাদনশীলতা বিষয়ক রচনা অন্তর্ভুক্ত এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে জনসাধারণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সংবাদপত্র, টেলিভিশনসহ অন্যান্য গণমাধ্যমকে কাজে লাগানো হবে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার মানউন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের মাঝে উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের মনোভাব আরও জোরদার করা প্রয়োজন। উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন হলেই শিল্পব্যবস্থাপনা, পণ্যেরমান, পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন, শিল্পবর্জ্য হ্রাস ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে দক্ষতার কাঙ্ক্ষিতমান অর্জন করা সম্ভব হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো, এটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর।

(ঊষার আলো-এমএনএস)