একজনই শেখ হাসিনা : কেন তাঁকে নিয়ে লিখব

সর্বশেষ আপডেটঃ

আফরোজা নাইচ : আমি একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো দেখিনি, জানি একুশ শতকের বিশ্বময় রুদ্ধশ্বাসের গল্পগুলো, যে গল্পরা বলে দূরে দূরে কাছে থাকার কথা। আমি মুজিবকে দেখিনি, দেখেছি তাঁরই করে রাখা গুছিয়ে ; সোনার বাংলার দূরদর্শন। আমি এক তর্জনীর মহান শক্তি দেখিনি, মিলেছে এক মহান মানবের আড়ষ্টহীন দুর্দমনীয় মানবতার। আমি শেখ হাসিনাকে নিয়ে লিখব কারণ বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু মানে শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশের বিকল্প শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ হলো আমাদের মা। মাকে জানতে হলে জানতে হবে এর ইতিহাসকে। আর ইতিহাসই হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাবা যাঁকে আদর করে হাচু বলে ডাকতেন। শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড়ো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ছোটো বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে দীর্ঘ সাড়ে ছয়বছর নির্বাসিত জীবনযাপনের পর অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয় বাবার হাতে গড়া সংগঠনের, তৃণমূল চষে বেড়িয়ে দলকে করেন সুসংঠিত। হাল ধরেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের।

শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই সব গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠিত করেন। আর এভাবেই সংসদ হয়ে ওঠে জনবান্ধব, প্রতিফলিত হয় জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা, হয়ে ওঠেন একজন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত , দুর্নীতি ও শোষণহীন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। ‘বাংলার মানুষের মুক্তি’ এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁরই দেখানো পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নিম্ন মধ্যআয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার সকল শর্ত পূরণ করেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উদযাপনের মুহূর্তে ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০২১) বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘ কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২,২২৭ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন ৪১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। দেশ স্বাধীন হবার সময় আমাদের গড় আয়ু ছিল ৪৭, এখন ৭২ বছরের উপরে। প্রাথমিক স্কুলে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় শতভাগ। স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার বর্তমানে অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়েই সারাদেশে ৫৬০ টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
স্বপ্নের পদ্মাসেতু যোগ করেছে বাংলাদেশের স্থান বিশ্বের দরবারে নতুন মাত্রা। মেট্রোরেলের চলমান নির্মাণ কাজ, পায়রা সমুদ্রবন্দরের কাজ এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে বহুলেন টানেল নির্মাণের প্রথম টানেল সমাপ্ত হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মাতারবাড়িতে নির্মাণ করা হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পর আবার ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত আন্তর্জাতিকমানের এক্সপ্রেস হাইওয়ের যুগে পা রাখলো বাংলাদেশ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘মুজিববর্ষ’ এ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২৯৮টি কর্মসূচি সংবলিত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা বছরব্যাপী নিয়েছে নানাধরনের পিতাল্যাণধর্মী কার্যক্রম, এর মধ্যে সারাদেশে এক কোটি বৃক্ষরোপণ ও সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিতকরণে গৃহহীন ও আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওয়তায় ১,৫৩,৭৭৭টি গৃহহীন পরিবারকে তাদের নিজ জায়গায় ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। সারাদেশে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে আধা পাকা ঘর দিচ্ছে সরকার। এছাড়া ৩৬টি উপজেলায় ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সবমিলিয়ে মুজিববর্ষে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর দিচ্ছে সরকার, এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০ উদ্যোগ পেয়েছে অনবদ্য সাফল্য।

বৈশ্বিক করোনা মহামারির বিধ্বংসী উপেক্ষা করে সরকার দ্রুততম সময়ে পিসিআর ল্যাব স্থাপন থেকে শুরু করে সমস্ত সেক্টরে সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ১ লক্ষ ২০ হাজার ১৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মোট জিডিপির চার দশমিক তিন-শূন্য শতাংশ। সরকার ২৭ জানুয়ারি থেকে প্রথম করোনার টিকা দিতে শুভসূচনা করেছে, যা গোটা মানবজাতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা, উৎকণ্ঠা, গুজব থেকে মুক্তি দিয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ প্রকাশিত ‘কোভিড রেজিলিয়েন্স রেঙ্কিং’ এ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্থান প্রথম এবং বিশ্বে ২০তম।

শুধু রাজনীতির সাথেই জড়িত নন তিনি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘ওরা টোকাই কেন?’, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, ‘দারিদ্র্যমোচন, কিছু ভাবনা’, ‘আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম’, ‘আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘সাদা-কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, ‘Miles to Go, The Quest for Vision-2021’ ইত্যাদি ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’। সেই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান বাঙালি জাতি করোনা মহামারির ভয়াবহতা উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়তে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন তথ্যপ্রযুক্তিখাতে উন্নয়ন ও বিকাশ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ একটি উন্নত জাতি ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে শেখ হাসিনার মত একজন দৃঢ়প্রতয়ী নারী অটল। আর এখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, শতবর্ষে তিনি একটি ইতিহাস, একটি পতাকা, একটি দেশ এবং শেখ হাসিনা হলেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি ,একজই শেখ হাসিনা।

জীবদ্দশাতেই একজন মমতাময়ী মা,একজন দূরদর্শী ও প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতিবিদ, বিচক্ষণ কূটনীতিক, একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী এবং সর্বোপরি একজন যোগ্য ও সাহসী উত্তরসূরি শেখ হাসিনা নিয়ে আমাদের দরকার প্রচুর গবেষণা। আর তখনই আমরা জানতে পারব দেশপ্রেম কি,মানবতা কি, শত সহজ বাধা ডিঙিয়ে জীবনের জন্য, দেশের জন্য তথা জনগণের জন্য কি করে চ্যালেঞ্জ নেয়া যায়।

শেখ হাসিনা সম্বন্ধে লিখতে গেলে জানতে হবে শেখ হাসিনাকে, পড়তে হবে শেখ হাসিনাকে, আবিষ্কার করতে হবে শেখ হাসিনাকে।তখনই একজন ব্যক্তি তাঁর কি দায়িত্ব ও কর্তব্য জানতে পারবেন, বুঝতে পারবেন। এভাবেই শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন একজন, হয়ে উঠবেন একজনই শেখ হাসিনা, যুগ থেকে যুগান্তরে সকল সময়ের ঊর্ধ্বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর।