একটি রম্য রচনা “গুরু-শিষ্য”

সর্বশেষ আপডেটঃ
প্রতিকি ছবি

প্রশান্ত কুমার রায় : জনৈক গুরুদেব তার শিষ্যের জন্য উপদেশ বাণী দিয়ে একখানা পত্র লিখেছেন। “পত্রখানা পড়ে শিষ্য হতভম্ব। তাই গুরুকে মোবাইলের মেসেঞ্জার অপশনে গিয়ে প্রশ্ন করছে। গুরুদেব তার উত্তর দিচ্ছেন। সেই প্রশ্নোত্তর পর্বটি বেশ চমৎকার।

শিষ্যঃ গুরুদেব, নমস্কার। মেসেঞ্জার অপশনে গিয়ে আপনার পত্রখানা পড়েছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে লজ্জা নেই, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। গুরুঃ আরে মুর্খ, তোমার জ্ঞান চক্ষু এখনো উন্মোচিত হয়নি। তোমার norisment লাগবে। শিষ্যঃ ক্ষমা করবেন গুরুদেব। কী লাগবে বললেন? Norisment, সেটা আবার কী? আমার জ্ঞান কম, তাই অভিধান খুঁজে দেখেছি। কিন্তু Norisment বলে কোনো শব্দ সেখানে নাই। গুরুঃ দূর বোকা, s এর পরে একটা h লাগিয়ে দাও। তাহলে হবে Norishment. শিষ্যঃ গুরুদেব, Norishment ও অভিধানে নাই। সেখানে একটা word আছে Nourishment , আপনি কি সেটা বলতে চেয়েছেন? গুরুঃ হবে হয়তো। তোমার জ্ঞানের পরিপক্বতা আসেনি এখনো। ওটা আরো দৃড় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে। শিষ্যঃ দৃড় ভিত্তি কী গুরুদেব? ওটা কি দৃঢ় হবে না? গুরুঃ আরে বোকা, দৃড়তর হলে তবে দৃঢ় হয়। শিষ্যঃ বুঝেছি গুরুদেব। ঐ কৌতুক অভিনেতা ভানুর পিলার লেখার মতো। একটা ‘এল’ দিলেও হয়, তবে দুটো ‘এল’ দিলে পিলার পোক্ত হয়। আপনি আমার জ্ঞানকে পোক্ত করতে চান বলে ওভাবে লিখে আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আপনি মহান গুরুদেব। গুরুঃ হুম, বুঝেছো তাহলে। ধন্যবাদ। শিষ্যঃ গুরুদেব, আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। গুরুঃ করো। শিষ্যঃ আমাদের তো দেব দেবতার অন্ত নাই। তা আমি কোন দেবতায় বিশ্বাস করবো? গুরুঃ আরে পাগল, এতো বিশ্বাস টিশ্বাস লাগবে না। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসের ধর্ম না। আচারন করে যাও। শিষ্যঃ গুরুদেব, এবার মাথায় গোল বেধে গেলো। যা বিশ্বাস করি না তার তো কোনো অস্তিত্ব নেই আমার কাছে। যা বিশ্বাস করি না তা মানব কেমন করে? একটু যদি ব্যাখ্যা করেন তো ভালো হয়। গুরুঃ বিশ্বাস ধুয়ে জল খাবে? আচারন করে যাও। শিষ্যঃ আচারন করা মানে কী গুরুদেব? অভিধানে আচার পাই, আচরণ পাই। কিন্তু আচারন পাই না। সাহস দিলে একটা কথা বলি গুরুদেব। গুরুঃ বলো যা প্রাণে চায়।

শিষ্যঃ আপনার লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে আপনার বর্ণনায় ভাষাগত দুর্বলতা আছে। আপনি প্রচুর বানান ভুল লেখেন। বিরাম চিহ্নের ব্যবহার একদম ঠিক হয় না। নত্ব বিধান সত্ব বিধান মানেন না। সাধু চলিতের পার্থক্য করতে পারেন না। পাঁচটি বাক্য লিখলে চারটে ভুল করে ফেলেন। তাই আমার বন্ধু বান্ধবেরা আপনাকে নিয়ে মশকরা করে। তাতে আমি একটু অপদস্থ হই। গুরু নিন্দা শুনতে খুব কষ্ট হয়। তাই অনুরোধ করি এদিকে যদি একটু মনোযোগ দিবেন। গুরুঃ আরে মুর্খ, আমি যা বলি তা সব কি আর তোমার অভিধানে থাকবে না ব্যাকরণে থাকবে? আমাকে অনুসরণ করে প্রণীত হবে অভিধান ও ব্যাকরণ। আমি যাহা রচিব তাহাই সত্য। গুরুর গুরুত্ব তুমি এখনো বুঝে উঠতে পারো নাই বৎস। শিষ্যঃ ঠিকই বলেছেন গুরুদেব। আমি অধম, তাই আপনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। তবে নিন্দুকেরা কত কথা বলে। গুরুঃ নিন্দুকের কথায় কান দিও না। তুমিও তো বানান ভুল করো। একবার লিখছো কি, আবার লিখছো কী। একই শব্দ দুই জায়গায় দুই রকম লিখেছো কেন? তোমার ভাষাজ্ঞান তো আরো দুর্বল। এগুলো ঠিক করো। শিষ্যঃ গুরুদেব, আপনি আমার আধ্যাত্মিক জগতের শিক্ষক। আপনাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমিও যে বাংলার শিক্ষক সে কথাটা ভুলে গেলে তো চলে না প্রভু। এই সুযোগে আপনার জ্ঞাতার্থে নীচে দুটো উদাহরণ দিলাম। ১. What do you want? মানে তুমি কী চাও? অর্থাৎ তুমি কোন জিনিষটি চাও। ২. Do you want? মানে তুমি কি চাও? প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ / না জানতে এই বানান হবে (হ্রস্ব) ই-কার দিয়ে। দুঃখিত গুরুদেব। সুযোগ পেয়ে আপনাকে একটু জ্ঞান দিয়ে ফেললাম। আপনার ভাষাজ্ঞানের দুর্বলতা দেখে নিন্দুকেরা আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। গুরুঃ তুমি তাদের বলে দিও যে তোমার গুরুদেব কারিগরি বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী প্রাপ্ত। সুতরাং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন অবান্তর। শিষ্যঃ গুরুর সম্মানের জন্য তা আমি বলেছি গুরুদেব। কিন্তু মান সম্মত বিদ্যা ও যোগ্যতার অভাবে আপনি নাকি কোনো ভালো চাকরি জোগাড় করতে পারেননি। সেই জন্য নাকি আপনি frustrated. তাই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। গুরুঃ আমার যোগ্যতা পরিমাপ করার মতো কোনো ইন্টারভিউ বোর্ড এদেশে তৈরি হয়নি। আমি যা উত্তর দেই, তার তাৎপর্য বুঝার ক্ষমতা তাদের নেই। যারা আমাকে চাকরি দেয়নি, সেটা তাদের ব্যর্থতা। সে দায় আমার নয়। শিষ্যঃ ঠিকই বলেছেন গুরুদেব। আপনি কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। আপনি স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের খোদ শিষ্য। মহাদেবের প্রসাদে ধন্য হয়ে যখন আপনার হাতে কলম ওঠে, তখন তার সরল অর্থ করা কি এত সহজ? মুর্খের অশেষ দোষ। ওসব বাদ দিন গুরুদেব, আসুন আমরা প্রসাদ পেয়ে ধন্য হই, ধ্যানস্থ হই। ব্যোম ভোলানাথ।

(ধ্যানভঙ্গ হওয়ার পরে শিষ্যের আবার আত্ম জিজ্ঞাসা দেখা দিলো। গুরুদেবকে পুনরায় প্রশ্ন।) শিষ্যঃ গুরুদেব, গতকাল কার্ল মার্ক্স পড়েছিলাম। তিনি বলেছেন ধর্ম মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে রাখে। এটা কি সেই নেশা যার দ্বারা আমরা এতক্ষণ বুদ হয়ে ছিলাম? গুরুঃ ঐ নাস্তিকের কথা বাদ দাও। ওরা মুর্খ। শিষ্যঃ তাহলে এ কোন নেশা? যে নেশায় ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য বলি প্রদান করা হয়? অন্তরের কথা না বুঝে মায়ের মুখের কথাকে সত্য মেনে কোলের সন্তান নদীবক্ষে বিসর্জন দিতে হয়। এ কি সেই নেশা? যে নেশায় নিয়মিত আচারনিষ্ঠ পূজা অর্চনার পরে ব্যবসায়ী দোকানে গিয়ে অসৎ পন্থায় মুনাফা অর্জন করে আর ফেরার পথে বিগ্রহের জন্য সোনার গহনা কিনে আনে। ধর্মের বহিরঙ্গে এই যে বাহ্য আচার সে কি আফিম তুল্য নয় গুরুদেব? গুরুদেবঃ আচার না থাকলে তো ধর্ম টেকে না বৎস। শিষ্যঃ গুরুদেব, আমি মনে করি ধর্মের আচরণ যুক্তি ও বিচারভিত্তিক হওয়া উচিত। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সমন্বয় হওয়া দরকার। অন্ধভক্তি, কুসংস্কার ও বাহ্য আড়ম্বর এই নিয়ে গঠিত আচার সর্বস্বতা দেখেই কার্ল মার্ক্স বলেছেন – ধর্ম আফিমের মত। যুক্তি ও বিচারহীন ধর্মাচরণ মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে। তাকে অবিবেচক করে তোলে। গুরুদেব, যা জেনেছি ও বুঝেছি, মানুষ ধর্মের মর্ম না বুঝে তার বহিরঙ্গ নিয়ে মেতে থাকে। ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ তার অন্তরঙ্গে। বহিরঙ্গে থাকে বাহ্য আচার। সেই আচার ধর্মের মর্মবাণী বাদ দিয়ে মাথা উঁচু করে যখন দাঁড়ায় তখন তা হয় অনাচার। বিবেকের বাণী, সত্যনিষ্ঠা ন্যায়পরায়ণতা, জগতের কল্যাণ বিবর্জিত যে আচার ধর্মাচরণ হিসাবে দেখা দেয় তা অবশ্যই আফিম তুল্য। প্রকৃত সনাতন ধর্ম যুক্তিবিচার করে। মানুষের মধ্যে যে দেবতুল্য গুণাবলী আছে, সেগুলোর বিকাশের উপায় হলো সনাতন ধর্ম। জগতের কল্যাণই এখানে মুখ্য। তার সাথে সাংঘর্ষিক আচার আচরণ পরিত্যাজ্য বলে বুঝেছি গুরুদেব।

গুরুদেবঃ তুমি অনেক বেশী বুঝে ফেলেছো দেখছি। কিন্তু গুরুবাদের মাহাত্ম্য তুমি বুঝে উঠতে পারনি বৎস। গুরুর পাণ্ডিত্য হতে হবে শিষ্যের বোধগম্যতার বাইরে। এমন সব কুহেলিকাময় বক্তব্য দিতে হবে যাতে শিষ্যরা হতভম্ব হয়ে মনে করে গুরু কত বড় বিদ্বান। নইলে শিষ্য গুরুকে মান্যতা দেয় না। একটা গল্প বলি বৎস। একজন চিত্রকর ছবি আঁকতে গিয়ে একটা অতিরিক্ত বোর্ড রেখেছিলো তুলি মোছার জন্য। এক দুষ্ট লোক তুলি মোছার জন্য ব্যবহৃত বোর্ডটি আর্ট কম্পিটিশনে পাঠিয়ে দিলো। কম্পিটিশন এর বিচারকেরা ঐ চিত্রটির থিম অনুধাবন করতে পারছে না। থিম ব্যাখ্যা করার জন্য চিত্রকরকেও পাওয়া গেলো না। তখন সিদ্ধান্ত হলো চিত্রকর্মটি বিচারকদেরও বোধের উপরে অবস্থান করছে। সুতরাং সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হলো। কিছু বুঝলে বৎস? সুতরাং আমার পাণ্ডিত্য তোমাদের বোধগম্যতার বাইরে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। শিষ্যঃ বুঝেছি গুরুদেব, বুঝেছি। জয় গুরু। লেখক: প্রশান্ত কুমার রায়, সদস্য, ট্যাক্সেস এপিলেট ট্রাইব্যুনাল, বেঞ্চ-৪, ঢাকা। (এই রম্য রচনাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোনো ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রতি কটাক্ষ করা এর উদ্দেশ্য নয়। তথাপি কোনো চরিত্রের সাথে মিলে গেলে আমি দুঃখিত।)