কন্যা শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজন সকলের সহযোগিতা

সর্বশেষ আপডেটঃ

তন্ময় সরকার : কন্যা তুমি তুচ্ছ নও, নও তুমি ক্ষুদ্র যদি তুমি জেগো উঠো, তবে করবে বিশ্বজয়। ২০০০ সালে আমাদের দেশে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সরকারি আদেশে শিশু অধিকার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনকে কন্যা শিশু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সে থেকেই প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘জাতীয় কন্যা শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর ফলে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করা হয়। আর আমাদের দেশে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত হচ্ছে প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর। এবারের জাতীয় কন্যা শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে –‘‘আমরা কন্যা শিশু-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হব, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ব’’।

ছেলে হোক বা মেয়ে হোক প্রতিটি সন্তানেরই বেড়ে উঠার অধিকার রয়েছে এবং তাই হওয়া স্বাভাবিক। অথচ আমাদের দেশে সবসময়েই কন্যা শিশুকে অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখা হয়। এজন্যে এ দেশের অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে ছেলে শিশু জন্মগ্রহণ করলে সৃষ্টিকর্তার ‘নিয়ামত’ এবং কন্যা শিশু জন্মগ্রহণ করলে ‘অভিশাপ’ হিসেবে ধরা হয়। ছেলে শিশু জন্মগ্রহণের পর অনেক পরিবারেই আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু মেয়ে শিশু জন্ম মানেই যেন ওই পরিবারে টেনশনের বার্তা। কন্যাসন্তানরা শিশুকাল থেকেই সামাজিক, পারিবারিক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নানা বৈষম্যের শিকার হতে হতে বেড়ে উঠে। কন্যা শিশুর প্রতি অবহেলা অনেক সময় তাদের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। কন্যা শিশুদের অধিকাংশই শিশুকাল থেকেই ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি, এসিড সন্ত্রাস, অপহরণ, ধর্ষণ ইত্যাদির শিকার হয়। নানা বৈষম্য, অত্যাচারের শিকার হয়ে অনেকেই নিজ পরিবারেই হয়ে পড়ে অসহায়।

কন্যা শিশুরা আমাদের সমাজে কতটা অসহায় তা সহজেই প্রতিয়মান। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে গত জুলাই মাসে মোট ১৮১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ কন্যা শিশু এবং ১০৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৪৩১ জন কন্যা শিশুসহ ৬৯৭ নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৬৭ জন। তন্মধ্যে ২৮ কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার, পাঁচ কন্যা শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, দুই কন্যা শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ও ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যার শিকার হয়েছে এক জন। এছাড়াও চার কন্যা শিশুসহ ৯ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এক কন্যা শিশুসহ পাঁচজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসিড দগ্ধ ও অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে তিন জন। নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা ঘটেছে সাতটি। বিভিন্ন কারণে পাঁচ কন্যা শিশুসহ ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ জন এরমধ্যে দুই জনকে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে তিন কন্যা শিশুসহ ১০ জন। বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে দুইটি ও বাল্যবিবাহের চেষ্টা করা হয়েছে একটি। এক কন্যা শিশুসহ সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছে ছয় জন।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু এবং এদের শতকরা ৪৮ শতাংশই কন্যা শিশু । একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩১ লাখ কন্যা শিশু অসহায়ত্বের শিকার। এদের এখান থেকে উঠিয়ে আনতে না পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কোনো অবস্থাতেই সম্ভব হবে না। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৩ লাখ কন্যা হতদরিদ্র। এর মূল কারণ পারিবাকির দারিদ্র্যতা। শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামঞ্চলের অবস্থা বেশি খারাপ। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার অনেক কন্যা শিশু র কপালে জোটে না। ফলে অনেক কন্যা শিশু শিকার হচ্ছে নানা রোগব্যাধির। রাস্তায় বেড়ে ওঠা অনেক কন্যা শিশু অজ্ঞতাবশত পতিতাবৃত্তির মতো জঘন্যতম কাজে জড়িয়ে পড়ে। যা সামাজের একটি দৃষ্টক্ষত এ ক্ষত দূর করতে প্রথমেই প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাল্যবিয়েতে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বাল্যবিবাহের হার ৪৯ শতাংশ। শত প্রচার আর আইন করেও বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী শতকরা ৬৬ ভাগ কন্যা শিশুর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এর মধ্যে ৬৪ ভাগ কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণ করে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়।

শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রণীত হয়েছে শিশু আইন ১৯৭৪। সবশিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ২০১০। এটি শিশুদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বির্নিমাণে সুদূরপ্রসারী রূপকল্প। এছাড়াও শিশু অধিকার রক্ষায় প্রণয়ন করা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০, জাতীয় শিশুশ্রম নীতিমালা ২০১০, বাংলাদেশ জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ এবং শিশু অধিকার আইন ২০১৩। জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ এর ৮ অনুচ্ছেদে রয়েছে কন্যা শিশুর উন্নয়ন ও সকল ধরনের বৈষম্য দূর করতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতি- ২০১১ এর ১৮.১ অনুচ্ছেদে রয়েছে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা ৫.৩ অনুযায়ী শিশু বিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহের মতো সকল ধরনের প্রথার অবসান করতে হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বাজেটের ২ শতাংশ শিশুদের জন্য বরাদ্দ রাখেন যা কন্যা ও পুত্র সকল শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়।

কন্যা শিশুদের জীবনের শুরু ভালো হলে পরিবার দেশ ও বিশ্ব সবচেয়ে উপকৃত হবে। দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্যমোচনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় শিশুদের জন্য বিনিয়োগ বিশেষ করে কন্যা শিশুদের জন্য বিনিয়োগ। সরকার সকল প্রকার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কন্যা শিশুর অন্তর্ভুক্তি করার ওপর জোর দিচ্ছে। অধিক পরিমাণে নারী শিক্ষক দেওয়া হচ্ছে। কন্যা শিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং পরিবারসহ সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি করা হয়েছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কন্যা শিশুর অংশগ্রহণ বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২ কোটি শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। স্কুলে হেলথ সার্ভিস প্রদান করবে সরকার । শিক্ষার্থীদের আরো বেশি শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হবে।

সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করবে সরকার। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ ও সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একদশক আগে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ যা বর্তমানে ৯৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাত যথাক্রমে ৫০.৭৫ ও ৫৩.৯৯ শতাংশ। কন্যা শিশুর উন্নয়ন ও সুরক্ষায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন কঠোরভাবে দমন এবং প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদারকরণের লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ধারা ৯ এর উপ-ধারা(১) এর অধীন ধর্ষণের অপরাধের জন্য ‘‘যাবজ্জীন সশ্রম কারাদণ্ড’’ শাস্তির পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে।

আমাদের কন্যা শিশুরা আমাদের দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারা আমাদের কন্যা-জায়া-জননী। তাদের নিরাপদে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। সেইসঙ্গে তাদের সবঅধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কন্যা শিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান, আইন ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণসহ তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশের কন্যা শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপত্তার দাবিদার। তা তাদের নিশ্চিত করতেই হবে। তবেই তারা উপার্জনক্ষম এবং স্বাবলম্বী নারী হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে। এতে প্রথমেই প্রয়োজন কন্যা শিশুর অধিকারকে সমুন্নত রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় সচেতন হওয়া।

(ঊষার আলো-এমএনএস)