এবার খুলনায় একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করবস্থানেও চাপ বাড়ছে, আগের চেয়ে দাফন তিনগুন

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো প্রতিবেদক : গত কয়েকদিনে একের পর করোনার মৃত্যুতে রেকর্ড গড়লেও এবার শণাক্তের রেকর্ড ভাঙ্গলো খুলনা বিভাগে। গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগে করোনার সর্বোচ্চ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৬৫ জনের। এ সময়ে ৮ জেলায় মারা গেছেন ৪০ জন। বিভাগে একদিনে এখন পর্যন্ত এটাই সর্বোচ্চ শনাক্তে রেকর্ড। করোনা শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিভাগে শনাক্ত হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৩০৫ জনের। বিভাগে মৃত্যুতে খুলনা জেলায় শীর্ষে, শনাক্তে কুষ্টিয়ায়। আক্রান্ত ও মৃতু্যৃর সংখ্যা বাড়ায় মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। খুলনা পরিচালক (স্বাস্থ্য) বিভাগ এর দপ্তর থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে শুধু হাসপাতালে নয় করোনার চাপ বেড়েছে কবরস্থানেও। প্রতিদিনই দাফনের সংখ্যা বাড়ছে। আগের চেয়ে তিনগুন। এমন পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে মৃত্যুর তালিকা কতোটা দীর্ঘ হচ্ছে। দাফলে করোনায় মৃত্যু কেউ গোপন করছেন, কেউ বা বলছেন। এর বাইরেও স্বাভাবিকভাবে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন চলছে। কদিন পর হয়তো নাম পলকও মুছে যাবে, শুধু স্বজনদের বুকে রয়ে যাবে প্রিয়জনদের হারানোর ব্যাথা। করোনার এই মহামারি হয়তো একদিন চলে যাবে থেমে যাবে মৃত্যুর মিছিলও কিন্তু, এই মহামারি যাদের কেড়ে নিলো সেই স্বজনদের শূন্যতা কাঁদাবে আজীবন।
খুলনা পরিচালক (স্বাস্থ্য) বিভাগ এর দপ্তরের সূত্র মতে, মঙ্গলবার (৬ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৬৫ জনের। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪০ জনের। এর আগে সোমবার (৫ জুলাই) খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২৪ ঘন্টার মধ্যে খুলনায় জেলায় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে চৌদ্দ জনের। এছাড়া কুষ্টিয়ায় তেরজন, যশোরে ছয়জন, মেহেরপুরে তিনজন, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গায় একজন করে মারা গেছেন। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে খুলনায় ৩৪৯ জন, বাগেরহাটে ১২৭ জন, চুয়াডাঙ্গায় ১৪০ জন, যশোরে ২৭৯ জন, ঝিনাইদহে ২৩০ জন, কুষ্টিয়ায় ৪৩২ জন। খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায় গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৯ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৩০৫ জন।
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ( রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা: শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা জানান, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় খুলনা মহানগরী ও উপজেলা মিলে মোট মারা গেছেন ১৪ জন। ডা: শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা বলেন, একই সময়ে ৭৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩৪৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। যা মোট নমুনা পরীক্ষার ৪৩ শতাংশ। শনাক্তের মধ্যে পুরুষ ছিলো ২০১ জন এবং মহিলা রয়েছে ১৪৮ জন। এর মধ্যে নগরীতে রয়েছেন ২৪৬ জন। এছাড়া উপজেলা দাকোপ-৫ জন, বটিয়াঘাটায়- ১৮ জন, রূপসায়- ১৩ জন, তেরখাদায়-৯ জন, দিঘলিয়ায়-৪ জন, ফুলতলায়-১৬, ডুমুরিয়ায়-২০ জন, পাইকগাছায়-১৭ জন এবং কয়রায় ১ জন শনাক্ত হয়। এদিকে নগরীর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল ৭০ শয্যা ডেডিকেটেড করোনা ইউনিট, শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের ৪৫ শয্যার করোনা ইউনিট এবং বেসরকারি গাজি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুমেক হাসপাতাল করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ৮ জন, জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে পাঁচজন ও বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরএমও ও করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ফোকাল পার্সন ডা: সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় চারজন ও উপসর্গে রয়েছে চারজন। মৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন, নগরীর চানমারী এলাকার মমতাজ বেগম (৫৫), খালিশপুরের রহিমা পারভীন, সোনাডাঙ্গার মনোয়ারা বেগম (৫০) ও বাগেরহাটের ফকিরহাটের সুব্রত পাল (৪৫)। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮০ জন। যার মধ্যে রেডজোনে ১০৯ জন, ইয়ালোজোনে ৩১ জন, আইসিইউতে ২০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৩৩ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ জন।
বেসরকারি গাজী মেডিকেল হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ডা: গাজী মিজানুর রহমান জানান, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেন- নগরীর বড় বয়রা এলাকার নোভা রানী দাশ (৭৫), খুলনার ডুমুরিয়ার নজরুল ইসলাম (৬৮), পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনির শোভা রানী সাহা (৭৫) এবং বাগেরহাট জেলা সদরের মাহমুদা বেগম (৫৫)। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১৩৪ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ৯ জন ও এইচডিইউতে আছেন ১১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৩৬ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৭ জন। পিসিআর ল্যাবে ৬২টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
খুলনা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা: কাজী আবু রাশেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন নগরীর খালিশপুরের জিল্লু মিয়া (৬৫), রহিমনগরের আমির হোসেন (৬৫), রূপসার নন্দনপুরের শরিফুল ইসলাম (৫২), বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শারমিন বেগম (৪৫) ও একই উপজেলার মারিয়া (৩৯)। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭০ জন। তার মধ্যে ৩৬ জন পুরুষ ও ৩৪ জন নারী। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২৪ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ জন।
নগরীর শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. প্রকাশ চন্দ্র দেবনাথ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে কোনো মৃত্যু হয়নি। করোনা শনাক্ত হওয়া ৪৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। যার মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ১০ জন।
এদিকে হাসপাতালের পাশাপাশি করোনার চাপ বেড়েছে কবরস্থানেও। খুলনা সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন নগরীর টুটপাড়া কবরস্থান, লবনচরা হাজী আ: মালেক জান্নাতুল বাকী কবরস্থান, বসুপাড়া কবরস্থান, নিরালা কবরস্থান, গোয়ালখালী কবরস্থান, মহেশ্বরপাশা কবরস্থান এবং দেয়ানা কবরস্থানে মৃত ব্যক্তিরা দাফন করা হয়। এর মধ্যে টুটপাড়া ও গোয়ালখালী কবরস্থানে দাফনের সংখ্যা আগের চেয়ে তিনগুন বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কবরস্থানে রেজিস্ট্রাররা জানানা।
টুটপাড়া কবরস্থান রেজিস্ট্রার মো: রফিকুল ইসলাম জানান, আগের চেয়ে দাফনের সংখ্যা তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনার লাশ পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবে মৃতু ব্যক্তিরের লাশ দাফন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগে প্রতি সপ্তাহে ৩-৪ টি লাশ দাফন করা হলেও সেখানে প্রতিদিন ৪-৫ টি লাশ দাফন হচ্ছে। আগে করোনার লাশ স্বেচ্ছাসেবীরা এসে দাফন করিয়ে যেতো। এখন মানুষের মধ্যে ভয় কমেছে। স্বজনরা এসে দাফন করাচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। গোয়ালখালী কবরস্থানে রেজিস্ট্রার শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতি এক সপ্তাহের লাশের দাফনের সংখ্যা জমা দেওয়া হয়। গত ২৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪২ জনের দাফন করা হয়েছে। এর আগের এক সপ্তাহে ৩৬ জনের লাশ দাফন সম্পন্ন করি। গতকাল মঙ্গলবার ৫ জন ছিলো। এর মধ্যে করোনার লাশও দাফন হচ্ছে। কেউ আবার করোনার মৃত্যু বিষয়টি গোপন রাখছেন। যারা বাড়িতে বসেই করোনায় মারা যাচ্ছেন মৃত ব্যক্তির স্বজনরা গোপন রাখছেন। কিন্তু পরে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। নগরীর বসুপাড়া কবরস্থানের রেজিস্ট্রার রুহুল আমিন বলেন, প্রতিদিন দুই একজন করে লাশ দাফন করা হচ্ছে। আগে এমন ছিলো। আমাদের এখানে চেয়ে টুটপাড়া ও গোয়ালাখালী লাশের দাফন বেশি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় প্রতিদিনই বাড়ছে হারানো স্বজনদের নামের তালিকা।
(ঊষার আলো-এমএনএস)