করোনা সংক্রমণ রোধে দুঃসাহসিক ভূমিকা রাখছে নাসিমা

সর্বশেষ আপডেটঃ

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণ রোধে এক দুঃসাহসী নারী নাসিমা খাতুন। ১৯৮৫ সালের কোন এক শুভক্ষণে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের লক্ষীখোলা গ্রামের বাবা আইউব আলী সরদার ও মাতা সরবানু খাতুনের কোল আলোকিত করে নাসিমা খাতুন এ ধরাধামে জন্ম গ্রহণ করেন। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নাসিমা ছিল সবার ছোট। আর এ কারনেই পরিবারের সবাই তাকে খুব ভালোবাসত। সুখেই বড় হতে থাকে নাসিমা। এক সময় নাসিমার পরিবার নাসিমাকে পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। শুরু হয় নাসিমার স্কুল জীবন। আর দশটা ছেলে মেয়ের মতো নাসিমাও স্কুলে যেতে থাকে।
এরপর নাসিমা ২০০২ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে। এর পর এক এক সে এইচএসসি, অনার্স ও এমএসএস শেষ করে। লেখাপড়া চলাকালে নাসিমা প্রত্যক্ষ করে গ্রামের মানুষ হতে কত অসচেতন এবং অবহেলিত। সমাজে এতটাই অভাব ছিল যে তখনকার লোকজন দুবেলা দুমুঠো খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে দিনযাপন করত। এসব দেখে নাসিমা ভাবতে থাকে কি ভাবে সমাজের এই দুরাবস্থা দুর করা যায়। তখন থেকে সে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে ২০১২ সালে এমএসএস পড়াকালীন সময়ে নাসিমার পরিবার নাসিমাকে পার্শ্ববর্তী আলমতলা গ্রামের একান্নবর্তী পরিবারের আহমদ আলীর পুত্র আশরাফুজ্জামানের সাথে বিবাহ দেয়। শুরু হয় নাসিমার সাংসারিক জীবন। নাসিমার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেষ করে ভালো কোন চাকরি নিয়ে এলাকার জনগণের পাশে দাড়াবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য? নাসিমা লেখাপড়া শেষ করেছে ঠিকই কিন্তু ভালো কোন চাকরি সে পাইনি।
বিয়ের পরে সামাজিক কাজে নাসিমা কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু নাসিমা হেরে যাওয়ার নয়। তাইতো সে তার স্বামীর সাথে পরামর্শ করে সামাজিক সেবামুলক কাজে নিজেকে সামিল রাখে। নাসিমা যে সব সামাজিক সংগঠনে যুক্ত ছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচির আওতাধীন পল্লী সমাজ। কারণ পল্লী সমাজ হলো ওয়ার্ড ভিত্তিক নারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন সংগঠন। যেটি নারীদের দ্বারাই পরিচালিত হয় এবং নারীরা বিভিন্ন সভাসমাবেশ করে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। যেখানে নারী ও শিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসের সাথে সংযুক্ত হয়ে অসহায় অবহেলিত ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাড়ানো যায়। কিছু দিনের মধ্যে নাসিমা নিজ কর্মগুনে এ পল্লী সমাজের সভাপতি নির্বাচিত হয়।
সভাপতি নির্বাচিত হয়ে নাসিমা তার বুদ্ধিদীপ্ত কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন সংকটকালীন সময়ে পল্লী সমাজের সদস্যদের সাথে নিয়ে মানুষের পাশে দাড়াতে পেরেছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে মহা সংকট হিসাবে দেখা দেয় কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। এসময় নাসিমা শুরু থেকেই করোনা ভাইরাসকে ভয় না পেয়ে এলাকার জনগণের মনোবল বৃদ্ধি করতে কাজ শুরু করে। এছাড়াও মানুষকে তিন ফিট সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, জন সমাগম এড়িয়ে চলা, জরুরি কাজে বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক পরিধান করা, নিয়মিত বিরতিতে কমপক্ষে ২০সেকেন্ড ধরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোঁয়া ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কখনও ছোট ছোট দলে বা বাড়ি বাড়ি যেয়ে প্রচার প্রচারনা করে গেছে অবিরাম গতিতে। মহামারি করোনা ভাইরাসের মধ্যে ২০২০ সালে রোজার সময় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’।
এ সংকটকালীন সময়েও নাসিমা থেমে থাকেনি। সে পল্লী সমাজের সদস্যদের সাথে নিয়ে ঘুর্ণিঝড় পুর্ববর্তী ও পরবর্তী প্রস্তুতি সম্পর্কে এলাকায় প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। ঘুর্ণিঝড় আম্পান তার তান্ডবলিলা চালিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিলেও করোনা ভাইরাস এখনও বিদায় নেয় নি। এছাড়াও এবছর সেই রোজার সময়ে ঘুর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ আসতে আসতে আর আসেনি। কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে মহা সংকট হিসাবে দেখা দিয়েছে। এ সংকটকালীন সময়েও দুঃসাহসী নাসিমা থেমে নেই। মানুষের কল্যানে পল্লী সমাজকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলছে অবিরাম গতিতে।
(ঊষার আলো-এমএনএস)