কাউখালীতে করোনায় মৃত নারীর গোসল ও দাফন করে ইউএনও’র মানবতার দৃষ্টান্ত

সর্বশেষ আপডেটঃ

বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি : প্রাণঘাতী করোনা মানুষের ভেতরের খোলসটা উন্মোচন করে দিয়েছে। কঠিন এক সত্যের সঙ্গে দিয়েছে পরিচয় করিয়ে। পিতৃত্ব, মাতৃত্ব, ভগ্নি-ভ্রাতৃত্ব, স্বামীত্ব ও স্ত্রীত্ব সর্বপরি সব সম্পর্কই নিছক এক স্বার্থের সুতোয় বাঁধা। স্নেহ, শ্রদ্ধা, প্রেম-ভালবাসা এ সবই স্বার্থান্বেষণ ব্যতীত কিছুই নয়। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক সত্তায় বেড়ে ওঠে, নিজের সুখশান্তি বর্ধনের জন্য সে সমষ্টিগত রূপে কেবল রূপদান করে- যা নিতান্তই অভিনয়। এ অভিনব চরিত্র দিয়েই ঘরে বাইরে তার আধিপত্য বিস্তার করে। রক্তের উত্তরাধিকার বলে পারিবারিক যে সম্পর্কের বেড়াজাল তা যে নিজ-নিজ প্রাণ রক্ষায় ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে, প্রাণঘাতী করোনা চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখাচ্ছে। ‘রক্তের টান’, ‘প্রাণের টান’ বা ‘আত্মার টান’ এগুলো মূলত কথার কথা। দু-চারটি ব্যতিক্রম ঘটনা লক্ষ্য করা গেলেও তা তো বিরল বিদগ্ধ প্রাণের টান। মানুষ স্বার্থান্ধ। সে নিজের স্বার্থে অন্যকে ভালবাসে বা আত্মীয় পরিজনকে সূত্র ধরে ব্যবহার করে। রক্তের অপেক্ষা অনেকে আত্মার সম্পর্ককে বড় বন্ধন বলে জাহির করি। অবশ্য সমাজবাদীরা রক্তের বন্ধন-কে এগিয়েই রেখেছেন। সমাজের চোখও রক্তকেই প্রকৃত বন্ধন বলে বিবেচনা করে আসছে। সেটাও পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সহায় সম্পদের ভাগবাটোয়ার বিষয়। প্রত্যেকটি বন্ধন আজ ফাঁপা বেলুনের মতো ফেটে যাচ্ছে। বন্ধনের কোনই স্থায়ীত্ব নেই। মানুষ নিজের সুখবর্ধনের জন্যই স্বার্থান্ধে পরিণত হন। ফলে ঘটে বিপত্তি। স্বার্থে বেঘাত ঘটলেই যেকোন ধরণের বন্ধন চুকে যাওয়ার ঘটনা অহরহ। করোনা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে পিতার– আর পিতার লাশ রাস্তায় কিংবা হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে পুত্র-কন্যা! করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী পালিয়ে যাচ্ছে বাপের বাড়ি। কিংবা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে স্ত্রী পালিয়েছে স্বামী। বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ঘটনা যদি হয় নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক তাহলে করোনায় যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাকে কি বলবো? আবার রক্তের বন্ধনের চেয়েও কিছু বিবেকবান মানুষের দায়িত্ববোধ সবকিছু ছাপিয়ে যায়। পিরোজপুরের কাউখালীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালেদা খাতুন রেখা করোনায় মৃত এক নারীকে নিজ হাতে গোসল ও দাফনের ব্যবস্থা করে এমনি এক মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার এ মহতী ও মানবিক উদ্যোগের খবর শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ইউএনওর এমন মহতী কাজকে সাধুবাদ জানিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
রেখা আক্তার (৪৫) নামের ওই নারীর লাশ দাফনে আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীরা যখন কেউ এগিয়ে আসেননি ঠিক তখন মানবিক ইউএনও ও দুই নারী উন্নয়ন কর্মী মিলে তার লাশের গোসল করিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন। শুক্রবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে কাউখালী উপজেলার উজিয়ালখান গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে ওই নারীর লাশ দাফন করা হয়। তিনি ওই গ্রামের সোলায়মান হোসেনের স্ত্রী। তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ১০দিন অসুস্থ ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, কাউখালীর উজিয়ালখান গ্রামের ওই নারী শুক্রবার দুপুরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। করোনার ভয়ে স্বজনরাও লাশ ফেলে রেখে গা ঢাকা দেন। অপরদিকে সংক্রমণের ভয়ে প্রতিবেশীরাও কেউ এগিয়ে আসেননি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ পড়ে রয়েছে বাড়িতে। এমন খবর নাড়া দেয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার খালেদা খাতুন রেখার কোমল হৃদয়কে। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে লাশের গোসল করাতে উদ্যোগী হন ইউএনও খালেদা খাতুন রেখা। তার এর আগে কখনো লাশ গোসলের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাৎক্ষনিক শিখে নেন নিয়মরীতি। তারপর তিনি ওই নারীর লাশের গোসল করান। তাকে সহযোগিতা করেন স্বেচ্ছাচ্ছাসেবী উন্নয়ন কর্মী মাহাফুজা মিলি এবং শামীমা আক্তার। লাশ গোসল করানোর আগে সুরক্ষাসামগ্রী (গাউন, হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, ক্যাপ ও বুটজুতা) পরে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল করানো হয় এবং কাফনের কাপড় পরানো হয়। রাত ১২টার দিকে কাউখালী উজিয়ালখান গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়। এ প্রসঙ্গে কাউখালী নির্বাহী কর্মকর্তা খালেদা খাতুন রেখা বলেন,মানুষ মানুষের জন্য। আর একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এটি মানবিক দায়িত্ব। তবে করোনায় কেউ মারা গেলে সংক্রমণের ভয় থাকা ভুল ধারণা। মানুষের সচেতন হওয়া উচিত। আমরা এক কঠিন দুঃসময় পার করছি।
(ঊষার আলো-এমএনএস)