কোটি-কোটি টাকা যাচ্ছে পাবজি-ফ্রি ফায়ারে

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো ডেস্ক : দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইএসপি) সূত্রে জানা যায়, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে এ সময়ে বেশি খেলা হচ্ছে পাবজি, ফোর্টনাইট, ফ্রি-ফায়ার, ভ্যালোরেন্ট, লিগ অব লিজেন্ড, ফিফা-২০২০, কাউন্টার স্ট্রাইক, কল অব ডিউটি ইত্যাদি।
অন্যদিকে দেশে এ সময়ের শীর্ষ ফ্রি অ্যান্ড্রয়েড গেমগুলো হলো ফ্রি ফায়ার, পাবজি মোবাইল, পাবজি মোবাইল লাইট, লুডো স্টার, ক্ল্যাশ অব ক্ল্যানস, ক্ল্যাশ রয়্যাল, ড্রিম লিগ ২০২০, সাবওয়ে সারফার্স ইত্যাদি।
গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মশিউর রহমান জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের মধ্যপড়ায় একই চিত্র। গ্রামের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়ারা মোবাইলে দেদার গেম খেলছে। এরমধ্যে এগিয়ে আছে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি। সঙ্গী হিসেবে আছে আত্মীয় ও বন্ধুরা। এরাও মিডিয়া হয়ে টাকার বিনিময়ে পাবজির বিশেষ কয়েন ‘ইউসি’ টপআপ করে।
গেমসে এ ধরনের টাকা ঢালার নেপথ্যে কাজ করছে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী। তারা তাদের ফেসবুক পেইজ ও ওয়েবসাইটে অনবরত নানা অফার দিয়ে চলেছে। সার্চ করে দেখা গেছে এসব সাইট ও পেজ কয়েক হাজারের কম নয়। সংশ্লিষ্ট গেমের নাম লিখে গুগল ও ফেসবুকে সার্চ দিলেই আসবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম, কমিউনিটি, ফেসবুক গ্রুপ ইত্যাদি।
কোনও গেম বা গেমের সরঞ্জাম (ভার্চুয়াল), যেমন- গান স্কিন, পোশাক, ক্যারেক্টার ইত্যাদি কেনার অসংখ্য সাইট ও ফেসবুক পেজ আছে। এগুলোতে দেয়া থাকে বিকাশ, নগদ বা রকেটের নম্বর। তাতে টাকা পাঠিয়ে কেনা যায় ভার্চুয়াল অনুষঙ্গ।
রাজিব (ছদ্মনাম) ক্লাস সিক্সে পড়ে। মোবাইলে ফ্রি ফায়ার গেমটাই খেলে বেশি। প্রতিদিন বিকালে চারটায় মোবাইল নিয়ে বসা তার রুটিন হয়ে গেছে। ঘণ্টাখানেক খেলে। করোনাকালে ঘরবন্দি জীবনে এটাই তার বিনোদনের একমাত্র উৎস। প্রথমদিকে খেলাটাকে নিছক খেলা আর বিনোদন হিসেবে দেখলেও এখন আরও একধাপ এগিয়ে সে। বলা যায় আসক্ত হয়ে গেছে গেমে। এরইমধ্যে ইন-গেইম পারচেজ তথা গেইমের ভেতর ভার্চুয়ালি এটা-সেটা কিনতে খরচও করতে শুরু করেছে। বিকাশের মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কিনেছে ‘২৫ ডায়মন্ড কয়েন’।
টাকা কোথায় পেলো রাজিব? জানা গেলো কাজিনরাই কিনে দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারলে রাজিব কড়া শাসনের মধ্যে পড়ে। তবে এরইমধ্যে বিভিন্ন ঈদে পাওয়া সালামি ও জমানো টাকা মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে ফেলেছে ফ্রি ফায়ারের পেছনে। এখনও তাকে অবশ্য খেলতে দেওয়া হয়, তবে কিছু কেনা যাবে না এ শর্তে।
রাজিবের বাবা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গ্রামে বসবাসরত তার কাজিনরাও ফ্রি ফায়ার খেলে। তারাও টাকা খরচ করে ‘ডায়মন্ড’ কেনে। হাসিব গ্রামের বাড়ি গেলে কাজিনরা একসঙ্গে বসে রীতিমতো উৎসব করে খেলা হয়।
‘লিংক পাঠান, বন্ধ করে দেবো’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এ তো উদ্বেগজনক ঘটনা। এটা তো শিশু-কিশোরদের কৈশোর ধ্বংসের আয়োজন। দেশীয় যেসব সাইট এসব অফার নিয়ে আসছে, শিশু-কিশোরদের প্রলুব্ধ করছে’, সেসব সাইটের লিংক দেওয়া হলে তিনি তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
এ ধরনের কোনও গেমের জন্য বা গেমের ভার্চুয়াল সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি বিশেষ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা বা নীতিমালার কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আগে এগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা করি, মনিটরিংয়ের আওতায় আনি। তারপর যদি ইতিবাচক কিছু থাকে তবে তা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাবে।’
একইসঙ্গে অভিভাবকদের সন্তানের প্রতি আরও যত্নশীল ও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এসব লিংক পেলে আমার কাছে পাঠান।’
অবশ্য এর বিপরীত যুক্তিও আছে। প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক আরিফ নিজামী বলেন, ‘দেশে পাবজি, ফ্রি-ফায়ার গেমের মতো কোম্পানিগুলো সরাসরি না এলেও এ দেশে ব্যবসা আছে বলে তারা বাংলাদেশে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট গেম কোম্পানিগুলোর অফার ও আপকামিং টুর্নামেন্টের খবর প্রকাশে সহায়তা করছে। এতে সংশ্লিষ্ট গেম কোম্পানির বাজার বড় হচ্ছে। বিটিআরসি (নিয়ন্ত্রক সংস্থা) যদি কোনও নীতিমালা তৈরি করে তবে দেশে আরও অনেক কোম্পানি আসবে। তারা সরাসরি ব্যবসা করবে। ফলে এই শিল্প বড় হবে। এ খাত থেকে সরকারের আয়ও হতে পারে।’
তিনি মনে করেন, ‘এখন গেমার ও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মাঝে হাজারো কোম্পানি দাঁড়িয়ে গেছে। তারা দেশীয় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। মাঝখানের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গেম নির্মাতাদের অর্থ পরিশোধ করছে। এর বাইরে হুন্ডির (অবৈধ লেনদেন) মাধ্যমেও অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। নীতিমালা হলে এসব কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।’
গেমিং পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গিগাবাইট বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে গেমারদের জন্য টুর্নামেন্ট, কর্মশালার আয়োজন করে। গিগাবাইটের কান্ট্রি ম্যানেজার খাজা আনাস খান বলেন, আমরা গেমারদের জন্য যা করি, সবই ফ্রি। আমরা টুর্নামেন্ট আয়োজন করি, বিজয়ীদের পুরস্কার দিই। এটাকে বলা হচ্ছে ই-স্পোর্টস। টুর্নামেন্টে অংশ নিতে কোনও ধরনের এন্ট্রি ফি দিতে হয় না বলেও জানান তিনি। তবে তিনি শুনেছেন, অনেক কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইট, ফেসবুকের মাধ্যমে গেম প্লেয়ারদের কাছে গোল্ড কয়েন, গেম কোড বিক্রি করে অর্থ নিচ্ছে। বিষয়টি নেতিবাচক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দুই গেমারের গল্প
নাফিজ ইমতিয়াজ অনলাইন গেমের ভক্ত। অনেক দিন হলো খেলছেন। তার প্রিয় গেম ভ্যালোরেন্ট। তিনি খেলার জন্য কয়েন কেনেন। কখনও সরাসরি, কখনও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। জানালেন, তিনি সীমিত আকারে খেলেন এবং কোথায় থামতে হবে তা তার জানা আছে। ফলে এটা তার নেশায় পরিণত হয়নি।
নাফিজ জানালেন, এই গেম ‍দুনিয়ার অনেকে বিভিন্নভাবে খেলার অনুষঙ্গ কিনে থাকেন। এ ধরনের গেমারের সংখ্যা দেশে লাখের বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের কারেন্সিও ব্যবহার হচ্ছে গেমের অনুষঙ্গ কিনতে। মালয়েশিয়ার রিংগিত এ ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে আছে বলে তার ধারণা।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ডলার বা পাউন্ডের চেয়ে রিংগিত স্থিতিশীল। এ জন্য রিজিওনভিত্তিক কারেন্সি কেনার চলটা বেশি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরা যাক আমি গেমের জন্য কিছু একটা কিনবো। রিংগিতে কিনলে দাম কম পড়বে। যদি মালয়েশিয়ায় পরিচিত কেউ থাকে তবে সে ওখান থেকে আমার হয়ে পেমেন্ট করে দিলো। দেশে আমি তাদের লোককে পেমেন্ট দিয়ে দিলাম। আমার খরচ অনেক কম হলো (এটাই মূলত হুন্ডি)। যাদের এই সুযোগ নেই তারা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের (মধ্যস্থতাকারী) সাহায্য নিয়ে বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট করে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অগণিত বলে জানান তিনি।
আশরাফুল ইসলাম খেলেন পাবজি। মাঝে মাঝে কল অব ডিউটি। তিনিও গেমে প্রচুর কেনাকাটা করেন। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ‘ইন অ্যাপ পারচেজ’ করেন। এখন কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন। মনোযোগী হয়েছেন পেশার প্রতি।
আশরাফ জানান, বাংলাদেশ থেকে পাবজি গেমের ইন অ্যাপ পারচেজে মাসে অন্তত ৭০ থেকে ৯০ কোটি টাকার মতো চলে যাচ্ছে। পাবজিতে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন আসে তা থেকে গেম নির্মাতাদের (বাংলাদেশ থেকে) আয় হয় ১৫-২০ কোটি টাকা। গেমের বিশাল বড় বাজার এখানে। গেমস নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানির সংখ্যা হাজারেরও বেশি।
পাবজি ও ফ্রি-ফায়ারের কাছ থেকে মন্তব্য চেয়ে তাদের এ দেশীয় জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে মেইল পাঠানো হলেও বৃহস্পতিবার (২০ মে) রাত পর্যন্ত কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফ্রি-ফায়ারের জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক পিআরকে ১৭ মে মেইল করলে প্রতিষ্ঠানটি ‘ভালো প্রশ্ন’ বলে ফিরতি মেইল করে। কিন্তু কোনও জবাব দেয়নি। একই দিনে পাবজির জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান কনসিটো পিআরকে মেইল করলে তারাও কোনও সাড়া দেয়নি। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

(ঊষার আলো-এমএনএস)