অন্যরকম এক ব্যবস্থা যশোরের বাঘারপাড়ায়

কোরবানি না দিলেও পৌঁছে যায় মাংস

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো ডেস্ক : কোরবানির পশুর গোশত নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে অন্যরকম এক ব্যবস্থা চলে আসছে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে। এই গ্রামে কোরবানির পশুর মাংস এক জায়গায় জড়ো করে গ্রামের যারা কোরবানি দেয়নি তাদের বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দেয়া হয়।
ঈদের দিন দুপুর দেড়টার দিকে মাংসের ব্যবস্থাপনায় থাকা মথুরাপুর গ্রামের ওষুধ দোকানি মো. আশরাফুল ইসলামের ফোনে একটি কল আসে। ওপাশ থেকে জানানো হয়, তাদের মাংস হয়েছে ৫ মণ ২১ কেজি, ঠিক ১৫ মিনিট পরেই ভ্যানযোগে বস্তা ও গামলায় ৬০ কেজি মাংস দিয়ে যান একই গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান ও তার অংশীজনরা।
এভাবে ধীরে ধীরে মাদ্রাসা এলাকায় আসেন ইসলাম, মাহবুব, আক্তারসহ অন্যরা। তারা কেউ সাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ভ্যানে কিংবা কেউ পায়ে হেঁটে তাদের মাংস দিয়ে যান এখানে।
গত ২২ বছর ধরে এই গ্রামের বাসিন্দা, যারা কোরবানি দেন তারা মাংসের তিনভাগের এক ভাগ এখানে দিয়ে যান।
গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোহাব্বত আলী জীবন বলেন, বছর ২২-২৩ আগে এক ঈদে মুরব্বি কয়েকজনের সঙ্গে বাঘারপাড়ার দোহাকুলা গ্রামে এক কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি, কোরবানির লুটের মাংস (কোরবানির তিনভাগের একভাগ মাংস, যা গরিবদের দেয়া হয়) এক জায়গায় জমা হচ্ছে। পরে সেগুলো ভাগ করে গ্রামের অন্য বাসিন্দা, যারা কোরবানি দেয়নি বা গরিব মানুষ, তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। পদ্ধতিটি আমার ও মুরব্বিদের বেশ মনে ধরে। পরে এলাকায় ফিরে পরের বছর থেকে আমরাও একই প্রক্রিয়ায় মাংস দেয়া শুরু করি।
তিনি আরও বলেন, প্রথমদিকে কোরবানি আমাদের মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই হতো। সেখানে জমা করা মাংস গ্রামের মানুষদের আমরা ভ্যানযোগে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতাম। তবে মাদ্রাসার পরিবেশ রক্ষার্থে এখন যারা কোরবানি দিতে চান, তারা পছন্দসই স্থানে কোরবানি দিয়ে লুটের মাংস মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। এরপর গ্রামের যারা কোরবানি দেননি, তাদের পরিবারের লোকসংখ্যার ওপর নির্ভর করে দেড় থেকে আড়াই কিংবা আরও বেশি মাংস বণ্টন করা হয়। এরআগে স্থানীয় মুরব্বিদের উপস্থিতিতে তালিকা প্রস্তুত করা হয়, যোগ করেন তিনি।
একই গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব ইমারত হোসেন, তিনি কোরবানি দিয়েছেন একটি ছাগল। জমাকেন্দ্রে মাংস দিয়েছেন সাড়ে ৫ কেজি। তিনি বলেন, গত ২০ বছর ধরে এখানে মাংস দিই। যারা কোরবানি দিতে পারে না কিংবা কারও কাছে যেতে পারে না- এখান থেকে তাদের বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেয়া হয়। ঈদের আনন্দ যেন সবাই উপভোগ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই প্রক্রিয়া চলে আসছে বলে জানান তিনি। এখানে মাংস দিলে সবাই পায়।
আক্তারুজ্জামান নামে এক যুবক বলেন, আমার চাচা, ভাইসহ জ্ঞাতিরা এবার তিন জায়গায় কোরবানি দিয়েছি। যথারীতি মাংস মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই আমরা দেখছি মাদ্রাসায় মাংস দিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটি সেই মাংস প্যাকেটজাত করে পরিবারের লোকসংখ্যা অনুযায়ী দেড় কেজি, দুই বা আড়াই কেজি করে বণ্টন করেন। তালিকায় থাকা কেউ মাংস না নিলে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়।
মথুরাপুর বাজারের চা দোকানি তরিকুল ইসলাম বলেন, বছর তিন আগে আমি গ্রামে ফিরি। বর্তমানে দোকানদারি করে কোনওরকমে চলছি। তখন থেকেই প্রতি কোরবানির ঈদে কমিটির লোকজন আমাকে মাংস দিয়ে আসছে। এতে অন্যদের সঙ্গে আমরাও ঈদ আনন্দে শামিল হতে পারি।
গত পাঁচ বছর ধরে মাংস সংগ্রহ ও বণ্টনের কাজ করে আসছেন ওষুধ দোকানি মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এলাকার মানুষদের তালিকা তৈরি করা হয়। মুরব্বিরা এসে সেই মাংস যারা এখানে উপস্থিত থাকে, তালিকা অনুযায়ী তাদের হাতে দিয়ে দেন। যারা অনুপস্থিত থাকেন, তাদের বাড়িতে স্বেচ্ছাসেবকরা মাংস পৌঁছে দেন।
বন্দবিলা ইউপি চেয়ারম্যান সবদুল হোসেন খান বলেন, বাঘারপাড়ায় আরও কয়েক স্থানে এভাবে কোরবানির মাংস বণ্টন হয়ে আসছে। মথুরাপুরেরটি বেশ ক’বছর ধরে চলে আসছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ, এতে ধনী-গরিব সবাই ঈদ আনন্দ ভাগ করে নিতে পারছেন।
তিনি জানান, এই বছর গ্রামের ৪৩ জন কোরবানি দিয়েছেন। তাদের পাঠানো মাংসের পরিমাণ ৫৫৫ কেজি। এরমধ্যে গরুর মাংস ৫১০ কেজি ও ছাগলের মাংস ৪৫ কেজি। এবার ২৭৫ ঘরে মাংস দেয়া হয়েছে। আর গত বছর আমাদের ৩১ জন কোরবানির মাংস দিয়েছিলেন। মাংসের পরিমাণ ছিল ৫৬১ কেজি। এরমধ্যে গরুর মাংস ছিল ৪৫৮ কেজি ও ছাগলের মাংস ১০৩ কেজি। ২৫০ ঘরে আমরা মাংস পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম।
(ঊষার আলো-এমএনএস)