খুমেক হাসপাতাল পরিচালকের নেতৃত্বে অভিযানে হাসপাতালে দুর্নীতিবাজরা আতংকে

সর্বশেষ আপডেটঃ
23
0

বহি: বিভাগের ফার্মাসিতে অনিয়মে ঘটনায় তদন্ত কমিটি

ঊষার আলো রিপোর্ট : খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা: এটি এম মঞ্জুর মোর্শেদ এর নেতৃত্বে হাসপাতালের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করছেন। এতে হাসপাতালে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্ণীতিবাজরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। চলতি মাসেই পরিচালকের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযান চালিয়ে হাসপাতালের ফার্মাসিতে নিয়মবহির্ভূত ওষুধ মজুদের অভিযোগ পান। এতে ফার্মাসিস্ট মফিজকে শোকজসহ অনিয়মের ঘটনায় ৬ সদস্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগেও ভর্তি রোগীদের পরিমান মতো খাবার না পাওয়া ও খাবারের অনিয়ম পাওয়ায় তত্ত্ববধায়ক (বর্তমান পরিচালক) তৎকালীন দুই জনকে শোকজও করেন। তারপর থেকে সিডিউল অনুযায়ী রোগীরা তাদের প্রাপ্য খাবার পেতে শুরু করেন। এদিকে করোনা মোকাবেলায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সয্যা বৃদ্ধি প্রক্রিয়া, নতুন করোনা ইউনিট নির্মাণ ও লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
এছাড়া নন কভিড রোগের ক্ষেত্রে, ১০০ শয্যা বার্ণ প্লাষ্টিক, নেফ্রোলোজি, নিউরোসাইন্সসহ বিশেষায়িত অনেক বিভাগ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ যত দ্রুত সম্ভব কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান পরিচালক। তবে এ সব কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই আগামী ২৯ এপ্রিল বিদায় নিতে যাচ্ছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপালের পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ। তার এই চলমান উন্নয়নের কাজে যাতে ভাটা পড়ার আশংকায় পরিচালকের মেয়াদ বৃদ্ধি দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসক-কর্মচারিরা।
হাসপাতালের সূত্র মতে, ২০২০ সালের ১১ মার্চে খুমেক হাসপাতালের বহির্বিভাগের ফার্মেসীতে ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পান এসএম আব্দুল মফিজ এবং ২০ মার্চ তাকে ইনচার্জের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দায়িত্ব হস্তান্তর করলেও ফার্মেসীতে অবস্থানরত আলমারীর চাবি বুঝিয়ে দেয়নি। বিষয়টি পরিচালকের নজরে আসলে তিনি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডাঃ অর্পনা বিশ্বাস, সার্জারি কনসালট্যান্ট ডাঃ বিপ্লব বিশ্বাস, মেডিকেল অফিসার ডাঃ জিল্লুর রহমান তরুণকে সাথে নিয়ে ফার্মেসীতে স্টক রেজিস্ট্রার অনুযায়ী ওষুধ মিলাতে যান। এ সময় অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়মবহির্ভূতভাবে ক্যাপসুল সেফিক্সিক (৪০০ মিঃ গ্রাম) ৬০০ পিস, ট্যাবলেট ক্লোপিড (৭৫ গ্রাম) ৪৫০ পিস এবং ক্যাপসুল ফ্লুক্লক্স ১ হাজার ২শ’ পিস ওষুধ মজুদের সত্যতা পায় ফার্মাসিস্ট মফিজের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মফিজকে শোকজ করা হয়। এছাড়া ওই ফার্মেসীতে কিছু অনিয়ম এবং স্টক লেজার অনুযায়ী ওষুধ অতিরিক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়ায় ৬ সদস্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল ওই তদন্ত কমিটিকে আজ ( ১৮ এপ্রিল) তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তদন্ত কমিটিতে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: বিধান চন্দ্র ঘোষকে সভাপতি করে ৬ সদস্য কমিটি করা হয়। কমিটিতে অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন জুনিয়ার কনসালটেন্ট (র্সার্জারি) ডা: বিপ্লব বিশ্বাস, সহকারি পরিচালক ডা: অর্পনা বিশ্বাস, আরএমও ডা: অঞ্জন কুমার চক্রবর্তী, আরএমও ডা: সুহাস রঞ্জন হালদার ও প্রশাসনিক কর্তকর্তা মো: হাফিজুর রহমান।
সূত্র জানায়, খুমেক হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ হাসপাতালের সকল প্রকার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি হাসপাতালের রান্না ঘরের অনিয়ম, আউটডোর, ইনডোরের ওষুধ পাচাররোধ, বহিরাগত এ্যাম্বুলেন্স বিতারিত, দালাল নির্মূলে ব্যাপক ভূমিকা রেখে হাসপাতালের সেবার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখেছেন।
খুমেক হাসপাতালের সূত্র মতে, ২০১৭ সালের ২৮ জুন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রথম দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ। এর পর থেকে রোগীদের সেবার মান বৃদ্ধিতে একে একে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেন। ভর্তি রোগীদের পরিমান মতো খাবার না পাওয়া ও খাবারের অনিয়ম পাওয়ায় তত্ত্ববধায়ক তৎকালীন দুই জনকে শোকজও করেন। এরপর থেকে সিডিউল অনুযায়ী রোগীরা তাদের প্রাপ্য খাবার পেতে শুরু করেন। আগে নির্দিষ্ট শয্যা সংখ্যার বেশি ভর্তি রোগীর জন্য খাবার বরাদ্দ ছিল না। হাসপাতালটির জন্মলগ্ন থেকে এই নিয়মটি চালু ছিল না। ওই তত্তবধায়কের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে হাসপাতালে এই সুবিধা পেতে শুরু করেছে। এর পর হাসপাতালের পরিচালক পদ সৃষ্টি হলে তিনি প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় দায়িত্ব থাকাকীন পরিচালক ডা: মঞ্জুর মোর্শেদ মানসিক রোগ বিভাগ চালুসহ ২৭টি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুলো হচ্ছে হাসপাতালে নিয়মিত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত, রোগীদের খাবারের মান বৃদ্ধি, লাশঘর স্থানান্তর করা, দালাল প্রতারক প্রতিরোধ করা, ১টার পূর্বে ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট বন্ধ করা, প্যাথলজি বিভাগে স্যাম্পল কালেকশন সময় বৃদ্ধি করা, ব্লাড ব্যাংকের পাশে নতুন করে কক্ষ নির্মান, অনুমোদিত ৫শ’ শয্যার রোগীর পরিবর্তে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ভর্তিকৃত সকল রোগীর খাবার ব্যবস্থা করা, ওয়ার্ড ইনচার্জদের দায়িত্ব পরিবর্তন করে নতুনদের দায়িত্ব অর্পন করা, জখমি সনদপত্র প্রদানের জন্য বোর্ড গঠনপুর্বক কেবলমাত্র থানা ও আদালত থেকে চাহিদার প্রেক্ষিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে জখমী সনদপত্র প্রদানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সবই তার অবদান।
হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, হাসপাতালে আসা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও কতিপয় দুর্ণীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করায় তাদের গাত্র দাহ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি আমাকে একজন মোবাইলেও হুমকি ধামকি দিয়েছেন। এতে আমাকে কেউ দমাতে পারেনি, পারবেও না। তিনি বলেন, ঝঢ়বপরধষ ঈধৎব ঘবনিড়ৎহ টহরঃ (ঝঈঅঘট) সেবাটি চালু করা হয়েছে। পূর্বে এ হাসপাতালে ছিলো না। এছাড়া হাসপাতালে রোগীরা প্রায় অক্সিজেনে সংকট থাকায় রোগীরা বাইরে থেকে ভাড়া করে আনতেন এখনো অক্সিজেন রোগিদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন তিন ওটি চালুর জন্য সকল প্রস্তুতি ওই সময় আমি দায়িত্ব থাকাকালীণ সম্পন্ন করেছি। নতুন আঙ্গিকে বার্ন ও প¬াস্টিক সার্জারি বিভাগের পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা পৃথক ওয়ার্ড করেছি। এখন আবারও পরিচালক হিসেবে এই হাসপাতালে দায়িত্ব পাওয়ার আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করে যেতে পারি এ জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জানা যায়, ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ এর আগেও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রথমে তত্বাবধায়ক ও পরে পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তখনই রোগীদের খাবার থেকে শুরু করে নতুন ইউনিট চালু, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে দালাল নিয়ন্ত্রণ। এভাবে প্রথম দফায় দায়িত্ব পালনকালে ৩০টির বেশি পয়েন্টে হাসপাতালের সেবার মান বাড়িয়েছিলেন তিনি। এ সময় সেবারমান বৃদ্ধির কারণে বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা যেমন বেড়েছিলো তেমন আন্তঃবিভাগেও ভর্তি রোগী বেড়েছিলো অনেকাংশে। কিন্তু করোনার প্রকোপ শুরু হলে নকল মাস্কের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মিডিয়ায় বক্তব্য দেয়ায় তাকে বদলী করা হয়েছিলো পাবনার মানসিক হাসপাতালে। এরপর পানি গড়িয়েছে অনেক। নকল মাস্কের বিরুদ্ধে সাফাই গাওয়া স্বাস্থ্য অধিদদপ্তরের মহাপরিচালক, সিএমএসডির মহাপরিচালকসহ বড় কর্তাদেরও ছাড়তে হয়েছিল তাদের চেয়ার। তবে মাত্র নয় মাসের মাথায় আবারো ডাঃ এটিএমএম মোর্শেদকে নিজের চেয়ার ফিরিয়ে দিয়েছিলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় দফায় খুমেকের পরিচালক পদে যোগদান করেছেন গত ১১ জানুয়ারি। এবার তিনি হাসপাতালকে সেবার মানে তিনে করেছেন দেশ সেরা। সারা দেশের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাালগুলোর মধ্যে সেবার মানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন ১ নম্বরে। দিন দিন এ পয়েন্ট আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডাঃ দেবনাথ তালুকদার বলেন, পরিচালক স্যার এই হাসপাতালের সেবায় আমুল পরিবর্তন করেছে। প্রত্যেকটি সেক্টরে নিজের মত করে সাজিয়ে তা রোগী বান্ধব করেছে। তার চলে যাওয়া হাসপাতালের জন্য অনেক ক্ষতি। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও যদি তাকে পাওয়া যেত তাও অন্তত ভালো হত। সূত্র মতে, হাসপাতালের চলমান উন্নয়ন সব কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই আগামী ২৯ এপ্রিল বিদায় নিতে যাচ্ছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপালের পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ। করোনা মহামারীর এই দুর্যোগকালে তার নেতৃত্ব না পেলে বিভাগের একমাত্র করোনা হাসপাতাল পরিচালনা নিয়ে সন্দেহ কর্মরত চিকিৎসক কর্মচারীদের মধ্যে। তাই পরিচালকের চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি করে অন্তত করোনা দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করে খুলনার মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে তারা।
খুলনা বিএমএ সভাপতি ডাঃ শেখ বাহারুল আলম বলেন, ডাঃ মঞ্জুর মোর্শেদ হাসপাতালটিতে সেবা নিশ্চিত করেছে। একটি পরিপূর্ণ রোগী বান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে। বিশেষ করে করোনা সেবা দেয়া বিভাগের একমাত্র হাসপাতালটির নেতৃত্ব দিয়ে সরকারের ভাবমুর্তি বজায় রেখেছে। এই জররী পরিস্থিতিতে তার চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলে এতে হাসপাতাল ও খুলনার মানুষই উপকৃত হবে।

(ঊষার আলো-এমএনএস)

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ