ঢাকার যানজট কমাবে মট্রোরেল

সর্বশেষ আপডেটঃ

মুনির মাসরেক : ঢাকার যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যেখানে যাত্রা শুরুর সময় বলা যায় কিন্তু কখন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবেন এটা ধারণা করা যায় না। ঢাকা মহানগরীর মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ। ১৯৭৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখ। প্রতিবছর ঢাকা মহানগরীতে ৬ লাখ ১২ হাজার মানুষ যুক্ত হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে এ মহানগরী। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ১০৯.২৫১ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। আর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ১৯৬.২২ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি । ঢাকায় প্রতিবর্গ কিলোমিটারে মানুষের বাস ৪৭,৮০০ জন। এই জনঘনত্ব অতিমাত্রায় অস্বাভাবিক। ঢাকা মহানগরীতে বস্তি আছে প্রায় ৫ হাজার। এসব বস্তিতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করে। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকার নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এর সুবিধা পাচ্ছে না নগরবাসী। উল্টো নগরের যানজট, বায়ুদূষণ, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নাম্বির নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেইসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে সবচেয়ে যানজটের শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যানজট আর দুর্ভোগ কমাতে ফ্লাইওভার, রাস্তা প্রশস্তকরণ, লেনবেধে দেওয়াসহ অনেক কিছুই করা হয়েছে কিন্তু নগরবাসীর সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রতিদিন গড়ে তিনশর বেশি নতুন গাড়ি ঢাকার রাস্তায় নামছে। ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের এই মহানগরীতে প্রায় ১০ লাখ রিকশা চলাচল করে। ঢাকা মহানগরে ইঞ্জিন চালিত যান চলাচল করে প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় অর্ধেক। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি। অর্ধেক রাস্তা জুড়ে চলে ব্যক্তিগত গাড়ি, এগুলোতে যাত্রী বহন করে মোট যাত্রীর শতকরা ১২ শতাংশ। বাস চলাচল করে প্রায় ৪০ হাজার, যার অধিকাংশের ফিটনেস নেই। ঢাকার যানবাহনের গড় গতিসীমা ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটারেরও কম। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে আনুমানিক ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার। বর্ধিত জনসংখ্যার চাপে মৌলিক চাহিদার উপর ও ক্রমান্বয়ে চাপ বাড়ছে। যানজট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে যানজটের কারণে গাড়ির গতিসীমা ঘণ্টায় ০৪ কিলোমিটারে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হলে প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ঘণ্টা কর্মক্ষমতার অপচয় হবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে প্রায় ১১.৪ মিলিয়ন ডলার। দেশের মোট আয়তনের শতকরা ১ শতাংশ আয়তন ঢাকা মহানগরীর, অথচ জিডিপি তে অবদান প্রায় ৩৬ শতাংশ। তাই এই মহানগরীর জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে বর্তমান সরকার Mass Rapid Transit (MRT) বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

যানজট নিরসনে র্বতমান সরকার ঢাকা মহানগরী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার অত্যাধুনিক গণপরিবহণ হিসেবে (MRT) বা মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা, সার্ভে ডিজাইন, অর্থায়ন, নির্মাণ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্তে ০৩ জুন ২০১৩ তারিখের Dhaka Mass Transit Company Limited (DMTCL) গঠন কর। মেট্রোরেল নগরবাসীদের খুব কমসময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে।

মেট্রোরেল হবে দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎ চালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূর নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা। এর আওতায় ০৬টি Mass Rapid Transit (MRT)-র মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২৮.৭৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে উড়াল ৬৭.৫৬৯ কিলোমিটার এবং পাতাল ৬১.১৭২ কিলোমিটার। ১১৪টি স্টেশন এর মধ্যে উড়াল ৫১টি এবং পাতাল ৫৩টি। ২০৩০ সালের মধ্যে এ মেগা প্রকল্পটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পরিকল্পনা অনুসারে উত্তরা ৩য় পর্ব থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১০ কিলোমিটারে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল যার নাম রাখা হয়েছে MRT Line-6 যার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। এটি ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারিত থাকলেও এটির কাজ আগেই শেষ হবে। MRT-6 এর নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। আগস্ট ২১ পর্যন্ত কাজের সার্বিক গড় অগ্রগতি শতকরা ৬৯.৪৩ ভাগ। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশরে পূর্ত কাজের অগ্রগতি শতকরা ৮৮.৫৮ ভাগ। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত র্পূত কাজের অগ্রগতি শতকরা ৬৭.৯১ ভাগ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোর্ডিং স্টক (রেল কোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের অগ্রগতি শতকরা ৬২.২০ ভাগ। MRT Line-6 মোট ০৮টি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

চলমান কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে বিশেষ উদ্যোগে Third-party Inspection এর মাধ্যমে গত প্রথম মেট্রোরেল সেট, ২৩ এপ্রিল ২০২১ তারিখ দ্বিতীয় সেট, ৩ জুন ২০২১ তৃতীয় সেট ১৯ আগস্ট ২০২১ এবং চর্তুথ মেট্রোরেল ট্রেনের সেট ২০ আগস্ট ২০২১ ঢাকার উত্তরাস্হ ডিপোতে পৌঁছাবে। ডিপোর অভ্যন্তরে প্রথম মেট্রোরেলের Functional Test ও অন্যান্য কারিগরি পরীক্ষা শেষে ভায়াডাক্টরের ওপর মেইন লাইনে ২৩ আগস্ট ২০২১ প্রথম মেট্রোরেল চলাচল পরীক্ষা করা হয়ছে। এ টেস্টে সার্বিকভাবে সম্পন্ন করতে প্রায় ছয়মাস লাগবে। Performance Test শেষ হওয়ার পর প্রায় তিনমাসের Integrated Test করা হবে। মেট্রোরেলের বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পূর্বে প্রায় পাঁচমাস যাত্রীবিহীন Trial Run করা হবে।
মেট্রোরেল একসময় দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল, এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। মেট্রোরেল নগরজীবনে নিয়ে আসবে আমূল পরিবর্তন। ২৪সেট ট্রেন চলবে সাড়ে ৪ মিনিট পর পর, প্রতিটি ট্রেনে ৬টি করে কার থাকবে। তবে এর সাথে আরো দুটি কার যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। ঘণ্টায় একশ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলবে মেট্রোরেল। প্রতিঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহণ করতে পারবে। মেট্রোরেলে থাকবে আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা। যাত্রীদের সুবিধার্থে মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো হবে এলভিটেডে। টিকিট কাউন্টার ও অন্যান্য সুবিধা থাকবে দোতলায় এবং ট্রেনের প্ল্যাটর্ফম থাকবে তিন তলায়। মহিলা যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বিবেচনা করে তাদের জন্য থাকবে প্রতিটি ট্রেনে একটি স্বতন্ত্র মহিলা কোচ। স্টেশনগুলোতে মহিলা যাত্রীদের জন্য পৃথক বাথরুম থাকবে। তাতে শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তনের সুবিধার্থে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। গর্ভবতী মহিলা ও বয়স্কদের জন্য কোচের অভ্যন্তরে আসন সংরক্ষিত থাকবে। ডিসপ্লের মাধ্যমে সকল প্রকার তথ্য যাত্রীদের জানানোর ব্যবস্হা থাকবে। মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকবে। নিম্ন উচ্চতার টিকেটিং বুথ, অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ গেইট, হুইল চেয়ার ব্যবহারে সামঞ্জস্যর্পূণ ওয়াশ রুম, কোচের ফ্লোর এবং প্লাটর্ফমরে মধ্যে উচ্চতার সমতা এবং ন্যূনতম ফাঁকা, মেট্রোরেলের উভয় প্রান্তরে কোচের অভ্যন্তরে হুইল চেয়ারের জন্য নির্ধারিত স্হান, হুইল চেয়ার ব্যবহারবান্ধব লিফট। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুবিধাদি স্টেশন এলাকা, লিফট এবং ট্রেনের অভ্যন্তরে অডিও ইনফরমেসন সিস্টেম, ব্লাইন্ড স্টিক দ্বারা সহজে অনুধাবনযোগ্য টাইলস দ্বারা নির্মিত আলাদা রংয়ের চলার পথ। বন্ধুসুলভ প্রশিক্ষিত সহায়ককর্মী। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুবিধাদি ভার্চুয়াল ডিসপ্লে মনিটরে সেবা ও চলাচলে দিকনির্দেশনা, বন্ধুসুলভ সহায়কর্মী। বিশেষ চাহিদাসম্পন্নব্যক্তির জন্য লিফটে সংযোজিত সুবিধা লিফটের অভ্যন্তরে হ্যান্ড রেইল, নিম্ন উচ্চতার কন্ট্রোল প্যানলে ও আয়না, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ব্রেইলে বাটন। জরুরি নির্গমন পথে এবং স্টেশনের নীচতলায় লিফট ব্যবহারের সুবিধার সাথে সিঁড়ি পাশে ঢালু পথ থাকবে।
একজন প্রতিবন্ধী মেট্রোরেলে চড়লে তাকে কীভাবে সহযোগিতা করতে হবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ২০২২ এর ডিসেম্বরের মধ্যে মেট্রোরেল চালু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে কাজ। ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রত্যাশা নগরবাসীর।

(ঊষার আলো-এমএনএস)