দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিসিএস ক্যাডার মাহবুব

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো রিপোর্ট : চোখ ছাড়া পৃথিবী কল্পনাই করা যায়না। যেটি আমরা চোখ বুজলে কিংবা অন্ধকারে গেলেই বুঝতে পারি। কিন্তু সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ৩৪তম বিসিএসে দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন সিলেটের মাহবুবুর রহমান। চোখে আলো নেই, তবে মনের আলো আর মনের জোরেই জয় করেছেন সবকিছু, হয়েছেন ৩৪তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার।

৩৪তম বিসিএসে মাহবুবুর রহমানের সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়ার গল্পটাও অনন্য।

মাহবুবুর রহমানের বাড়ি সিলেটে। মা-বাবা আর ৩ বোনকে নিয়ে তার পরিবার। শৈশবে তাকে স্থানীয় এক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়েছিল। এরপর ১৯৯৫ সালে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে স্কুলজীবন শুরু করেছিলেন ঢাকার মিরপুরের ১৪ নম্বরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০০০ সালে। তখন সিলেটে সমন্বিত অন্ধ শিক্ষা প্রকল্পের অধীনে কোন স্কুল ছিল না। মৌলভীবাজারে বিদ্যালয়ে ছিল। সেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের দেখভাল করার জন্য একজন শিক্ষক ছিল। এ কারণেই তিনি সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি ঐ স্কুলের মানবিক বিভাগ থেকে ২০০৫ সালে জিপিএ–৪.৮৮ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। তিনে সিলেট জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে থেকে ২০০৭ সালে জিপিএ–৪.৪০ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

মাহবুবুর রহমান কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে পারতেন না। এ জন্য বিভিন্ন কোচিং থেকে লেকচার শিট সংগ্রহ করতেন আর সেগুলো তার বোনেরা রেকর্ড করে দিতেন আর তিনি তা শুনতেন। এরপর তিনি একজন শ্রুতলেখকের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ঢাবিতে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

স্নাতকের শেষ দিকেই নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন তিনি সাথে বিসিএস-এর প্রস্তুতিও। অনেক আন্দোলনের পর ৩২তম বিসিএস থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন, কিন্তু কেউ চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি। তিনি ৩৪তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করেন। ৩৪ম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় তিনি শ্রুতলেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এরপর লিখিত পরীক্ষা শেষে মাহাবুর রহমানসহ ৩ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভাইভার জন্য ডাক পেয়েছিলেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে মাহাবুর রহমানই দেশের প্রথম বিসিএস ক্যাডার।

মাহবুবুর রহমান বর্তমানে সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর মতো যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তাদেরকে এগিয়ে নিতে গড়ে তুলেছেন সাংস্কৃতিক সংগঠন গঙ্গাপদ্মা শিল্পীগোষ্ঠী। এর মাঝে শিক্ষাছুটিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন সেখানকার বোস্টন কলেজে পাঠক্রম শিক্ষাদান বিষয়ে এমএড সম্পন্ন করেছেন তিনি। প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি প্রকল্পের অধীনে সিলেটের গোয়াইনঘাটের একটি স্কুলে সহযোগী শিক্ষক হিসেবে।

বিসিএস ভাইভা শেষ হতেই নরওয়ে থেকে মাহবুবুর রহমানের ডাক আসে। ভাইভার দিন রাতেই নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলো থেকে একটি ই-মেইল আসে। বার্তায় জানানো হয় তিনি সেখানে এমফিল করার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর তিনি পাড়ি জমান সুদুর নরওয়ে।

বর্তমানে মাহবুবুর রহমান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে বেশ কিছু গবেষণার কাজ হাতে নিয়েছেন। তাঁদের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজছেন, অনুসন্ধান করছেন। ভয়েস ওভার, ভয়েস অ্যাকটিংসহ এমন কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনায়াসে ভালো করতে পারেন। তিনি তার মেধা-শ্রম দিয়ে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছেন, তাঁদের এগিয়ে নিতে তার সবটুকু প্রয়োগ করে তাঁদের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

(ঊষার আলো-এমএনএস)