ধরাছোঁয়ার বাইরে সালথা নেপথ্যের নায়ক পিকুল

সর্বশেষ আপডেটঃ
65
0

ঊষার আলো ডেস্ক : ফরিদপুরের সালথার সহিংসতায় যে তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে তার ‘মূল নায়ক’ কথিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ইমারত হোসেন পিকুল মোল্যা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাণ্ডবের ঘটনায় তাকে আসামি করা হলেও তিনি প্রতিদিন ফেসবুকে এসে উপজেলা প্রশাসন নিয়ে নানা ধরণের উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। এতে উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত পিকুলকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলার এসিল্যান্ড মারুফা সুলতানা খান হিরামনি লকডাউন অভিযানে সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে যান। এ সময় সাধারণ জনতার ওপর লাঠিচার্জ ও অসদাচরণের অভিযাগে গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের ধাওয়া করেন। পরে পুলিশ এলে তাদের ওপরও হামলা করা হয়। এরপর তারা থানা ঘেরাও করে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার কার্যালয়, ভূমি অফিস ও দুটি সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি বাসভবন, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ভাঙচুর করা হয়। এ সব ঘটনায় মোট পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কী ধরণের গুজব রটিয়ে সেদিন সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছিল? ফুকরা বাজারে প্রশাসনের একটি অ্যাকশনের ঘটনা শেষ পর্যন্ত এ জাতীয় সংহিস তাণ্ডবে পরিণত করলো কে, তা নিয়ে এলাকাবাসীসহ রাজনৈতিক নেতাদের আলোচনার শেষ নেই। অনুসন্ধানে এ ঘটনার নেপথ্যে একটি নামই বারবার উঠে এসেছে, তিনি হলেন সালথা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইমারত হোসেন পিকুল। তবে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শওকত আলী জাহিদ বলেন, ‘পিকুলের ওই কমিটি ভুয়া। সালথায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়নি। সে ভুয়া পরিচয় দিয়ে চলছে। এ ব্যাপারে আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিকুলের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা সদরের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সরকারি জমি দখল করে এলাকায় আলোচিত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা : ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি সালথা বাজারের গুরুত্বপর্ণ স্থানে সরকারি জায়গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে উপজেলা প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ হন স্বেচ্ছাসেক লীগ সভাপতি ইমারত হোসেন পিকুল। পিকুলের ভাই এনায়েতের দখলে থাকা সরকারি জমি উদ্ধার করে প্রশাসন। এ ঘটনায় পিকুল ও তার সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হন। তারা প্রকাশ্যে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রচার করে আসছিল। ওই ক্ষোভের কারণে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই জনতার ক্ষোভের তিলকে মদদ ও রসদ দিয়ে তাল বানাতে সাহায্য করেছে তিনি ও তার অনুসারীরা।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ফুকরা বাজারসহ সালথার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে জানা গেলো এ সম্পর্কিত নানা তথ্য। ঘটনার সূত্রপাত যেই এলাকায়, সেই ফুকরা বাজার এলাকার মানুষ জানায়, ৫ এপ্রিল সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ফুকরা বাজারে করোনার লকডাউনের কার্যকারিতা পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে উপজেলা সহাকারী কমিশনারের সঙ্গে স্থানীয়দের ঝামেলা হয়। এ সময় ফুকরা বাজারে নটখোলা, তেরি সালথা ও গোপালিয়া গ্রামের তিন থেকে চার শতাধিক লোক জড়ো হন। এদের মধ্যে থেকে কয়েকজন তরুণ সালথা থানা ঘেরাও করার ঘোষণা দেন। এ সময় তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন আশাপাশের কয়েকটি গ্রামের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের ফোন করে গুজব ছড়িয়ে সালথা থানা ঘেরাও করতে আসতে বলেন। বিক্ষুব্ধ মিছিলকারীরা সালথা উপজেলা সদরে পৌঁছে উপজেলা কমপ্লেক্স ও থানা হতে আনুমানিক ১২০ গজ দূরে সালথা কলেজ রোডের সামনে অবস্থান নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানা ও উপজেলার আশাপাশে বসবাসরত একাধিক ব্যক্তি জানান, এই সুযোগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইমারত হোসেন পিকুলের হাতুড়ি বাহিনী ৫০-৬০ জনের একদল যুবক প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে এবং একপর্যায়ে ভূমি অফিসে হামলা চালায়। পরে তারা এগিয়ে এসে কলেজ সড়কের সামনে অবস্থানকারী বিক্ষুব্ধ জনতাকে উত্তেজিত করে এবং তাদের নিয়ে উপজেলা কমপ্লেক্স ও থানা ঘেরাও করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষ এসে উপজেলা পরিষদ ও থানার চারদিকে অবস্থান নেয়। এ সময় পিকুলের হাতুড়ি বাহিনীর সদস্যরা উত্তেজিত জনতার মাঝে গিয়ে বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র সরবারহ করে।
পিকুল বাহিনীকে অস্ত্র সরবারহ করতে দেখে স্থানীয় সালথা বাজার এলাকার মুরব্বীরা তাদের বাধা দেন। তবে এ বাধা উপেক্ষা করে হাতুড়ি বাহিনীর লোকজন হামলায় অংশ নেন। তারা অংশ নেয়ার পরেই মূলত সরকারি অফিস ও স্থাপনায় হামলা শুরু হয়। হামলা চলাকালে পিকুলের কয়েকজন সমর্থক ফেসবুক লাইভে এসে ক্রমাগত উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে সবাইকে উত্তেজিত করেন এবং আশেপাশের গ্রামের লোকদের এ কাজে এগিয়ে আসতে প্ররোচিত করেন।
একাধিক দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দিকে ঘটনাটি সীমিত পরিসরে থাকলেও পরে বৃহদাকার তৈরি হওয়ার পেছনে উপজেলার পাশে বসবাসরত ক্ষমতাসীন দলের নেতা পিকুলের বড় ভূমিকা রয়েছে। ওই দিন সরবরাহ করা দেশীয় অস্ত্র ঢাল-সড়কিতে বলিয়ান হয়ে উত্তেজিত জনতা সর্বপ্রথম হামলা করে ভূমি অফিসে। তারপর উপজেলা পরিষদের গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে ইউএনও-এসিল্যান্ডের গাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং বিভিন্ন সরকারি অফিস-স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, উপজেলা পরিষদের পশ্চিমে স্বেচ্ছাসেক লীগ সভাপতি ইমারত হোসেন পিকুলের বাড়ি হওয়ায় সদরের রাজনীতিতে তার আধিপত্য রয়েছে। উপজেলার পাশে থাকা এ নেতা ও তাদের সমর্থকরা যদি এই হামলায় ইন্ধন না দিতেন কিংবা অংশ না নিতেন তাহলে হামলকারীরা এভাবে হামলা করে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারতো না। হামলাকারীরা ইন্ধন পেয়েই উৎসাহ নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এই ঘটনায় অংশ নেয়া হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতপন্থীদের আধিক্য থাকলেও তাদের উসকে দেয়ার নেপথ্যে ছিল পিকুল।
পিকুলের বক্তব্য : এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ইমারত হোসেন পিকুল বলেন, ‘আমি এই হামলার সঙ্গে যুক্ত নই, বরং ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি।’ তবে তিনি (ইমারত হোসেন) অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয় প্রশাসনের সঙ্গে অসন্তোষ ও ফেসবুকে তার বিরূপ মন্তব্যের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি ইউএনওর-এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের দুর্নীতি নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করেছি, বিধায় আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনায় কোনোভাবেই জড়িত নই।’ তথ্যসূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

(ঊষার আলো-এমএনএস)

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ