বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো রিপোর্ট : মঙ্গলবার (১০ আগস্ট) বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী। ছিলেন চিত্রকর, সুরসাধক ও বাঁশিবাদক। তাঁর পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। তবে এস এম সুলতান নামেই তিনি অধিক পরিচিত। ১৯২৪ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়ায় বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এসএম সুলতান। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান। ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে এ চিত্রশিল্পীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন চিত্রানুরাগীরা।

৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে চিত্রশিল্পী সুলতান তাঁর তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতি মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেন বিশ্ববিখ্যাত সব চিত্র।

এস এম সুলতান জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।

সুলতানের ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও ফুটে উঠেছে। তাঁর চিত্রে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

দারিদ্রকে সঙ্গে নিয়ে বেড়ে ওঠা ‘লাল মিয়া’ তথা এস এম সুলতান ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলের অবসরে রাজমিস্ত্রি বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতেন এবং মাঝে মাঝে ছবি আঁকতেন শিশু সুলতান।

১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় জমিদার শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি এঁকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সুলতান। পড়ালেখা ছেড়ে ১৯৩৮ সালে চলে যান ভারতের কলকাতায়। সেখানে চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সুলতানের পরিচয় হয়। একাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে ভর্তি হন কলকাতা আর্ট স্কুলে।

১৯৪৪ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েন। কিছুদিন কাশ্মিরের পাহাড়ে আদিবাসীদের সঙ্গে বসবাস করেন আর তাদের জীবন-জীবিকাভিত্তিক ছবি আঁকেন সুলতান।

১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলায় সুলতানের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তনের লাহোরে আরেকটি চিত্র প্রদর্শনী হয় তার। চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ।

১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকা যান সুলতান। এরপর ইউরোপে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ সময় বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লীসহ খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীদের ছবির পাশে এসএম সুলতানের ছবি স্থান পায়।

১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে আসেন সুলতান। শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলা শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই দ্য ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্বোধন করেন যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইনাম আহম্মদ চৌধুরী।

১৯৮৭ সালে সুলতানের শিশুস্বর্গ তৈরি শেষ হয়। অবশ্য অনেক আগেই স্বপ্নের শিশুস্বর্গ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি বাঁশি এবং সুরযন্ত্র বাজাতেও পটু ছিলেন তিনি। সুলতান বিষধর সাপ, ভাল্লুক, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিগ, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশুপাখি পুষতেন। সুলতান হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি পছন্দ করতেন না।

চিত্রশিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে রেসিডেন্ট আর্টিস্ট, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন।

এছাড়াও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যান অব দ্য ইয়ার, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকেম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ম্যান অব এশিয়া পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

প্রাণঘাতি মহামারি করোনার জন্যে এবারও এস এম সুলতানের জন্মবার্ষিকী সীমিত আকারে পালিত হবে। জন্মদিন উপলক্ষে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা।

(ঊষার আলো-এমএনএস)