বিশ্ব মান দিবস হোক ভোক্তার অধিকার

সর্বশেষ আপডেটঃ

তারিক মোহাম্মদ : বিশ্ব মান দিবস (World Standards Day) প্রতিবছর ১৪ অক্টোবর তারিখে আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপন করা হয়। পণ্য, সেবা প্রভৃতির মান উন্নয়নের লক্ষে বিশ্বব্যাপী কর্মরত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের অবদানের প্রতি সম্মান জানানোর জন্যই এই দিনটির অবতারণা। এই দিবসটি মূলতঃ পণ্য, সেবা প্রভৃতির মানোন্নয়ন ও মান বজায় রাখার প্রতি কর্তৃপক্ষ, উদ্যোক্তা, উৎপাদনকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তাদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।

১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর তারিখে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে বিশ্বের ২৫টি দেশের মোট ৬৫ জন প্রতিনিধি বিশ্বব্যাপী পণ্য, সেবার মান বজায় রাখার জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নির্ধারক সংস্থার বিষয়ে ঐকমত্য পোষন করেন যা পরের বছর থেকে International Organization for Standardization (ISO) নাম ধারণ করে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ঐ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই আইএসও ১৯৭০ সাল থেকে দিবসটি বৈশ্বিকভাবে পালন করে আসছে।

আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও) একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যা বিভিন্ন দেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ে গঠিত। ১৯৪৬ সালে ১৪ অক্টোবর তারিখে লণ্ডনে বিশ্বের ২৫টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরের বছর ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আইএসও প্রতিষ্ঠিত হয়। আইএসও’র প্রধান কাজ শিল্প ও বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয়ের উপর মান নির্ধারণ, প্রণয়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মানের সনদপত্র প্রদান।

আইএসও (ISO) নিজেকে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তবে মান প্রণয়নে এর ক্ষমতা অনেক বেশি এবং এর প্রণীত অধিকাংশ মান চুক্তি কিংবা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়। এ কারণে অধিকাংশ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আইএসও অনেক শক্তিশালী। বাস্তবে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্টের সরকারের সাথে আইএসও’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে আইএসও’র সদস্য সংখ্যা ১৬৫। আইএসও’র সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত।

আইএসওর সাথে ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রো-টেকনিক্যাল কমিশন (IEC)-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে যারা ইলেকট্রনিক পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে। বিশ্বে অন্যান্য যে সকল আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে তাদের মধ্যে American Society of Mechanical Engineers (ASME), International Ethics Standards Board for Accountants (IESBA), International Telecommunication Union (ITU), Institute of Electrical and Electronics Engineers (IEEE), Internet Engineering Task Force (IETF) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের প্রধান মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম হলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই বিএসটিআই ১৯৭৪ সালে আইএসও’র সদস্যপদ লাভ করে। বিএসটিআই শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা যা মূলত পণ্য ও সেবার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে গঠিত। এই সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

বিএসটিআই আইএসও ব্যতীতও বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মান নির্ধারক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেছে যার মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর লিগ্যাল মেট্রোলজি (ওআইএমএল); কোডেক্স আলিমেন্টারিয়াস কমিশন (সিএসি); ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রো-টেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি); এশিয়া প্যাসিফিক মেট্রোলজি প্রোগ্রাম (এপিএমপি); এশিয়ান ফোরাম ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি (এএফআইটি); স্ট্যান্ডিং গ্রুপ ফর স্ট্যান্ডারডাইজেশন, মেট্রোলজি, টেস্টিং অ্যান্ড কোয়ালিটি; আন্তর্জাতিক ওজন ও পরিমাপ ব্যুরো (International Bureau of Weights and Measures) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক পণ্য মানসম্মতকরণে বিএসটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মান প্রণয়নে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিতে প্রতিবছর আইএসও যে বিশ্ব মান দিবস উদযাপন করে তার সাথে সংহতি প্রকাশ করে বিএসটিআই এর উদ্যোগে বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়। মান দিবস বিশ্ব অর্থনীতি ও মানবজীবনে মান প্রমিতকরণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি সুযোগও বটে।

প্রতিবছর মান দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে চলমান বিষিয়াদিকে ঘিরে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় “Shared Vision for a Better World – Standards for SDG’s” অর্থাৎ ‘সমন্বিত উদ্যোগে টেকসই উন্নত বিশ্ব বিনির্মাণে-মান’। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণ, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা সীমিতকরণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। এসকল লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনের সহযোগিতা ও সমন্বয় এবং সম্ভাব্য সকল উপকরণের সফল ব্যবহার ও প্রয়োগ। আন্তর্জাতিক মান ও সামঞ্জস্য নিরূপণ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সকলের সুরক্ষার জন্য অন্যতম হাতিয়ার। পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সকল ক্ষেত্রে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

চলমান কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক সমাজসমূহের দৃঢ়ীকরণ, সংহতকরণ ও সমতা আনয়নে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-কে অন্তর্ভূক্ত করা আজ সময়ের দাবি। ক্ষতিগ্রস্থ সমাজ পুনর্নিমাণে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনে আন্তর্জাতিক মান অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর প্রাসঙ্গিক।

পূর্ণাঙ্গ মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণের ক্ষমতায়ন না করা হলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন কঠিন। সহযোগিতার শক্তির উপর নির্ভর করেই আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সহায়তা করবে। অর্থাৎ, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও বৈশ্বিক মান পরষ্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট জাতিসংঘ কর্তৃক ২০১৫ সালে গৃহীত হয় যা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে প্রতিস্থাপিত করে। ইহা ‘এজেন্ডা-২০৩০’ নামেও পরিচিত কারণ এর মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা এবং সর্বমোট ১৬৯টি সূচক রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত এসব লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে এই ১৭টি লক্ষমাত্রা হলো: (১) দারিদ্র দূরীকরণ (২) ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব ও খাদ্য নিরাপত্তা (৩) স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ (৪) গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণ (৫) লৈঙ্গিক সমতা আনয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন (৬) সুপেয় পানির সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ (৭) দূষণমুক্ত জ্বালানি সহজলভ্যকরণ (৮) সার্বজনীন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (৯) উদ্ভাবন, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়ন (১০) সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ (১১) টেকসই নগরী ও বসবাসযোগ্য সমাজ (১২) দায়িত্বশীল উৎপাদন ও পরিমিত ভোগ (১৩) জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা হ্রাসকরণ (১৪) সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ (১৫) স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা প্রদান (১৬) শান্তি স্থাপন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ (১৭)অভীষ্ট বাস্তবায়নে বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব ও পারস্পারিক সহযোগিতা।

সহযোগিতা ও সমন্বয়করণের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সুসংহত ও সামঞ্জস্যকরণ করা যায় তবে তা শেষ বিচারে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে। মান কেবল টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সাহায্যই করবে না বরং তরান্বিত করবে। এ প্রসঙ্গে ভুলে যাওয়া যাবে না যে, পৃথিবী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আবির্ভাবে তথ্য প্রযুক্তির সর্বব্যাপী প্রসার এবং উৎপাদন ব্যবস্থার যান্ত্রিকীকরণের কারণে মানবসমাজে যে অভিঘাত সৃষ্টি হবে তার জন্য এখন হতেই আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। বিশ্বায়নের কারণে অবধারিতভাবে যোগাযোগ প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন হয়েছে। বিশ্বায়ন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের পরিচিত পৃথিবী এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসবে। পরিবর্তিত পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মান এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

বিশ্বায়ন উত্তর পৃথিবীতে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বব্যাপী প্রসারে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যসমূহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে গমনাগমন করে। বাণিজ্য সম্প্রসারণে মান নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মতকরণ অতি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রমে ‘মান’ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত নগরায়ণ ও ত্বরিত বিশ্বায়ন সংঘটিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ব নেতৃত্ব ইতোমধ্যে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তিগত বাধা অতিক্রম করে নবনব সুযোগ, সম্ভাবনা ও সমাধান উন্নয়নকল্পে মানসম্মতকরণ ও মানসমূহ নিয়ন্ত্রণ একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। মানকরণ প্রথা ও পদ্ধতি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উত্তর বিশ্বে জ্বালানি অপচয় রোধ এবং বায়ু, পানি ও ভূমির দূষণ রোধপূর্বক গুণগত মান বৃদ্ধি করে সার্বিকভাবে পরিবেশের মান উন্নতকরণে সহায়তা করবে।

পরিশেষে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি বিশেষায়িত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে শিল্প উদ্যোক্তা, উৎপাদক, বিক্রেতা, কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা সাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে। এই দিবসের তাৎপর্য অনুধাবন করার মাধ্যমে শিল্প উৎপাদক এবং আমদানি ও রপ্তানিকারকগণ মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও বিতরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রত্যাশিত সেবা প্রদানে অধিক মনোনিবেশ করতে পারেন। বাংলাদেশে সাধারণ ভোক্তাগণের আস্থা অর্জনের জন্য যদি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটশন (বিএসটিআই) অধিকতর দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করে তবে তা বিদেশি ও দেশীয় পণ্য ও সেবাসমূহের মান প্রণয়ন ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হবে।
লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট

(ঊষার আলো-এমএনএস)