সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকান্ডে ক্ষতিপূরণের দাবিতে স্কপের স্মারক লিপি

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো রিপোর্ট : সেজান জুস কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকান্ড এবং ৫৪ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে দায়ীদের শাস্তি ও নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ ও কর্মক্ষেত্র নিরাপদ করার দাবিতে শ্রমিক কর্মচারি ঐক্য পরিষদ (স্কপ) খুলনার নেতৃবৃন্দ স্মারক লিপি পেশ করেন। গতকাল সকালে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শ্রম প্রতিমন্ত্রীর নিকট এ স্মারক লিপি পেশ করা হয়।

স্মারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৮ জুলাই’২১ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় সজীব গ্রুপের মালিকানাধীন হাসেম ফুড লিঃ এর সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকান্ড এবং ৫৪জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এই ধরণের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড এবং শ্রমিকের মৃত্যু এটাই প্রথম নয়।এ যাবত ছোট বড় প্রায় ২৫০টি কারখানায় অগ্নিকান্ড, ভবন ধ্বস, বয়লার বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৫ হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু এবং ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক আহত, পঙ্গুত্ব বরণ করে মৃত্যু যন্ত্রনায় ধুঁকছে। এসব ঘটনার মধ্যে রানা প্লাজা ধ্বস এবং তাজরিন সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। বিশ্ব বিবেক নাড়া খেলেও এখনও কর্মক্ষেত্র শ্রমিকের জন্য নিরাপদ হয়নি। ফলে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনহানির আশংকা থেকেই যাচ্ছে। অতীতের প্রতিটি দুঃখজনক ঘটনার পর বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশিত না হওয়ার ফলে ঘটনার সঠিক কারণ, কারখানা ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা, অগ্নিনির্বাপণের যথাযথ প্রস্তুতি, দুর্ঘটনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও উদ্ধার প্রস্তুতির দুর্বলতা, নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং শ্রম আইন, বিল্ডিং কোড মানা হয় কিনা সে ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের ভুমিকা বিষয়ে কোন কিছুই জানা যায়নি। কোন ক্ষেত্রেই শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিক পক্ষের কাউকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। বরং একটি ঘটনার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতে আর একটি ঘটনায় শ্রমিকের জীবনহানি ঘটে। এসব ঘটনার পরে কিছুদিন আলোচনা হয় তারপর ঘটনা চাপা পড়ে যায়।

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ স্কপ প্রতিটি ঘটনায় সঠিক তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্থদের যথাযথ ক্ষতিপূরণদাবী করে আসছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু বিশেষ ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়া আর কোন কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। দেশী বিদেশী মালিক, ক্রেতা এবং বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা পেলেও শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে তেমন কোন অগ্রগতি ঘটেনি।

সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকান্ডের পর সেই পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। সে কারণে স্কপের পক্ষ থেকে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এই কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে, শ্রমিক কর্মচারী, কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করে একটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।

স্কপ এর পর্যবেক্ষণে সেজান জুস কারখানায় নানা গুরুতর অসঙ্গতি দৃশ্যমান হয়েছে, যার দায় মালিকপক্ষ, অগ্নি নির্বাপণ কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রশাসন, শ্রম দপ্তর, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর কোনভাবেই দায় এড়াতে পারে না। বিশেষ করে ভবন নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা বিধি অনুযায়ীপর্যাপ্ত না থাকা, প্রতিটি ফ্লোর তালাবদ্ধ করে রাখা, শিশু শ্রমিক নিয়োগ, মালিক পক্ষের শ্রম আইন ও বিধি মেনে না চলা, পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী পরিদর্শন কাজে অবহেলা, স্বল্প মজুরীতে কাজ করানো, ট্রেড ইউনিয়ন না থাকা এই কারখানার অগ্নিকান্ডকে অনিবার্য করে তুলেছে। দায়িত্ব অবহেলা, শ্রম আইন তোয়াক্কা না করা, অগ্নিকান্ড ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এবং কারখানায় কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনার নামে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটতেই থাকবে।

ইতিমধ্যে নিহত-আহতদের জন্য কিছু সহায়তা করা হলেও তা আইন ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিতান্তই অপ্রতুল। ফলে সেজান জুস অগ্নিকান্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে নিম্নোক্ত দাবিসমুহ উত্থাপন করা হলো- দাবিগুলো হচ্ছে,সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক কারণ উদঘাটনের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। সেজান জুস কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিকপক্ষ এবং কর্তব্য অবহেলার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্টসরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তি দিতে হবে। মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের আই এল ও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদানকরতে হবে।

এ ক্ষেত্রে হাই কোর্টের নির্দেশনা এবং রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের হারকে বিবেচনায় নেয়াযেতে পারে। ক্ষতিপূরণের একই হারে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। অগ্নিকান্ডের পরবর্তিতে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকা অবস্থায় কর্মহীন শ্রমিকদের মজুরী প্রদান করতে হবে। খুলনায় বন্ধকৃত শিল্পকারখানা চালু ও শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

স্কপ এর পক্ষে-প্রধান যুগ্ম সমন্বয়ক খালিদ হোসেন ও যুগ্ম সমন্বয়ক রনজিত কুমার ঘোষ, জাতীয় শ্রমিক লীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোতালেব মিয়া, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি নাজিরু রহমান নজরুল, রংগলার মৃধা, আব্দুল করিম, জনার্দন দত্ত নান্টু, মোসাঃ ডলি, চৌধুরী হাবিবুর রহমান, মোঃ ফারুক।

(ঊষার আলো-এমএনএস)