হাসপাতালে মাস্কহীন দর্শনার্থী বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

সর্বশেষ আপডেটঃ
খুলনা মৃত্যু ছাড়ালো ৪০০; সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গে মৃত্যু ১০

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় স্বাস্থ্যবিধি না মানায় বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। করোনা হাসপাতালে সাধারণ মানুুুষ নমুনা পরীক্ষা করাতে এসেই সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এমনকি করোনা পজিটিভ রোগীদের দেখতে এসেও মুখে মাস্ক থাকছে না। চিকিৎসকরা বলছেন, গত বছর চুড়ান্ত সংক্রণের সময়েও এতো অল্প সময়ে রোগীর পরিস্থিতি খারাপ দেখেননি তারা। বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে অধিকাংশই রোগীকে। কিন্তু এ বছর শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে না, প্রয়োজন পড়ছে আইসিইউ। শনিবার (১০ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগের ৬ জেলায় করোনায় মৃত্যু হয়েয়েছ ৪৬ জনের। এ সময়ে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৭৭২ জনের। করোনা শুরু থেকে এ পর্যন্ত খুলনা নগরী ও উপজেলা মিলে করোনায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে ৪০২ জনের। শনাক্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৩৫৫ জনের। বিভাগের মধ্যে খুলনায় শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ। এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় নগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গে নিয়ে মারা গেছেন ১০ জন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল করোনা ইউনিটে শনিবার (১০ জুলাই) বেলা ১১টায় ফ্লোরে চিকিৎসাধীন করোনা রোগীর সামনেই অবস্থান নিয়ে মাস্ক থুতনিতে রেখে কথা বলছেন একজন দর্শনার্থী। এ ধরনের চিত্র করোনা হাসপাতালে অহরহ ঘটছে। কিন্তু দায়িত্বশীলরা এ বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। ফলে ক্রমেই বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুকি। আর খুলনা অঞ্চলে করোনা প্রসারিত হচ্ছে হাসপাতাল থেকেই।
খুলনা পরিচালক বিভাগ (স্বাস্থ্য) অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা: ফেরদৌসী আক্তার বলেন, ‘টিকা নেয়ার পর অনেকেই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাদ দিয়েছেন। বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমরা দেখছি, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের অংশগ্রহণ বেড়ে গেছে। ঘরে বা বদ্ধ রুমে যখন আমরা মিলিত হচ্ছি, তখন ফ্যান বা এসি ছাড়তে হচ্ছে। ঘরের বাতাস যেহেতু ঘরের মধ্যেই চলাচল করছে, তাই সংক্রমণের মাত্রাও বাড়ছে।
করোনা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত বছরে এত অল্প সময়ে রোগীর পরিস্থিতি খারাপ হতে দেখেননি তারা। বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে অধিকাংশ রোগীকে। কিন্তু এ বছর শুধু হাসপাতালের চিকিৎসায় চলছে না, প্রয়োজন পড়ছে আইসিইউর। শয্যা ফাঁকা না থাকায় হাসপাতাল বাধ্য হচ্ছে রোগী ফিরিয়ে দিতে। বাড়ছে মৃত্যু। সংক্রমণ হার বাড়ছে হু হু করে। কিন্তু এ পরিস্থিতিতেও কেনাকাটা সব জায়গায় উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি। মাস্ক দেখা যায় না কারও মুখে।
শনিবার (১০ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ঘুরে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে সাধারণ মানুষেরা নমুনা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছেন। গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। করোনা ইউনিটে রোগীর সামনে বসে আছে স্বজনরা। কিন্তু মাস্ক রয়েছে থুতনির নিচেতে। করোনা ইউনিট থেকে রোগীর আত্মীয়স্বজনরা বাইরে যাচ্ছেন আবারা ফিরে আসছেন।
খুলনা সিভিল সার্জন ডা: নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত সচেতনতা ছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি টিকা নিতে হবে। করোনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোনায় কোনায়। এ জন্য দেশব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসকসহ সব পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
খুলনা পরিচালক বিভাগ (স্বাস্থ্য) অধিদপ্তরের সূত্র মতে, শনিবার (সকাল ৮টা পর্যন্ত) গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগের ৬ জেলায় করোনা ভাইরাসে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ৭৭২ জনের। এর আগে শুক্রবার (৯ জুলাই) বিভাগে ৯ জেলায় সর্বোচ্চ ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত ২৪ ঘন্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। এছাড়া খুলনায় ১০ জন, যশোরে ১০ জন, ঝিনাইদহে ৪ জন, মেহেরপুরে ও নড়াইলে দুজন করে মারা গেছেন। খুলনা জেলায় নতুন করে করোনা শনাক্ত ১৬১ জনের। এছাড়া বাগেরহাটে ১২ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৭ জন, যশোরে ২৫১ জন, ঝিনাইদহে ৩১ জন, কুষ্টিয়ায় ১৭৬ জন, মাগুরায় ২৫ জন, মেহেরপুরে ৪১ জন, নড়াইলে ৩১ জন ও সাতক্ষীরায় ৩৭ জন। খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায়, গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০টি জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৬৯ হাজার ৯৫৯ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৫৩৩ জন।
এদিকে শনিবার (১০ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত নগরীর তিন হাসপাতালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় সাতজন এবং উপসর্গ নিয়ে তিনজন মারা গেছেন। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন করোনা ইউনিটে ছয়জন, জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে একজন এবং বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
খুলনা মেডিকে কলেজ হাসপাতালের আরওএমও এবং করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ফোকালপার্সন ডা: সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় তিনজন এবং উপসর্গ নিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন ফুলতলার বাসিন্দা শামসুর রহমান (৫০), বাগেরহাটের মিঠাপুকুর পাড় এলাকার রওশন আরা (৬৫) ও নড়াইলের লোহাগড়ার মো. মুজিবর রহমান (৬৫)। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে তিনজন মারা গেছেন। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১৮৮ জন। যার মধ্যে রেডজোনে ১১৫ জন, ইয়ালোজোনে ৩৩ জন, আইসিইউতে ২০ জন এবং এইচডিইউতে ২০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছিলো ৩১ জন আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন।
নগরীর জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা: কাজী আবু রাশেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে খুলনার রূপসা উপজেলার নৈহাটি এলাকার মো. হাসানুজ্জামান (৭০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭৬ জন। তার মধ্যে ৩৭ জন পুরুষ ও ৩৯ জন নারী। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন আটজন।
শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. প্রকাশ চন্দ্র দেবনাথ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের ভর্তি রয়েছেন ৪৪ জন রোগী। যার মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ১০ জন। ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন পাঁচজন ও বাড়ি ফিরেছেন চারজন।
বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেন- খুলনার পাইকগাছার গোপালপুরের আহম্মদ আলী গোলদার (৭৫), দাকোপের পানখালীর মোহাম্মদ আলী (৯০) ও চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার পুরাপাড়ার অনন্ত কুমার বিশ্বাস (৪০)। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১৩০ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন সাতজন ও এইচডিইউতে আছেন ১১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২১ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৭ জন।
(ঊষার আলো-এমএনএস)