UsharAlo logo
, |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নারিকেলের বাজারে আগুন

ঊষার আলো রিপোর্ট
অক্টোবর ১৩, ২০২৬ ৪:০৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দুর্গাপূজার আনন্দের মধ্যে এবার বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নারিকেলের চড়া দাম। পূজার অন্যতম অনুষঙ্গ নারিকেলের নাড়ু তৈরি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার অপরিহার্য হওয়ায় উৎসব ঘিরে বেড়েছে চাহিদা। আর সেই সুযোগে বাজারে নারিকেলের দামও বেড়েছে কয়েক দফা।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে যে নারিকেলের জোড়া বিক্রি হয়েছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়, এখন তা কিনতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। গত বছর একই সময়ে জোড়াপ্রতি দাম ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা।

সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাড়তি দামের চাপে প্রয়োজনের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন অনেক ক্রেতা। অন্যদিকে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঠিক রাখতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে মণ্ডপ কমিটিগুলোকে।

রংপুর বিভাগের আট জেলায় চলতি বছর ৫ হাজার ৩৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ উৎসব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্রতিটি মণ্ডপে গড়ে ৮০ থেকে ১০০টি বা তারও বেশি নারিকেল প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি পূজা উপলক্ষে অনেক পরিবার ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত নারিকেল কেনে। নাড়ু তৈরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নারিকেলের ব্যবহার থাকায় উৎসবের মৌসুমে এর চাহিদা বেড়ে যায়।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান এলাকার বাসিন্দা ভবেশ চন্দ্র রায় (৬৫) বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার নারিকেলের দাম অনেক বেশি। আমাদের পরিবারের ২০টি নারিকেল প্রয়োজন হলেও দাম বেশি হওয়ায় মাত্র ১০টি কিনেছি। দুই সপ্তাহ আগেও দাম কম ছিল। দুর্গাপূজায় নারিকেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

রংপুরের নজিরের হাট এলাকার অ্যাডভোকেট নিরবালা রায় (৪০) বলেন, নারিকেল কিনতে গিয়ে এবার মাথায় হাত পড়েছে। দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নারিকেল ছাড়া নাড়ু তৈরি করা যায় না, তাই কম হলেও কিনতে হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার এলাকার কৃষক রজনী মোহন্ত (৬৫) বলেন, শুধু নারিকেল নয়, পূজার অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে পূজার সামগ্রিক খরচ বেড়ে গেছে।

নাজিমখান হাটের নারিকেল ব্যবসায়ী আজিজুল হক বলেন, আমরা ১০০টি নারিকেল ১০ হাজার টাকা দিয়ে কিনি। বিক্রি করি ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।

বড়বাড়ী হাটের ব্যবসায়ী মোবারক আলী জানান, তাদের এলাকায় নারিকেলের উৎপাদন খুবই কম। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নারিকেল আনতে হয়। এবার পরিবহন খরচ বেড়েছে, পাইকারি বাজারেও দাম বেশি।

তিনি বলেন, আমরা প্রতি জোড়া নারিকেলে ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ করি। মাঝেমধ্যে পচা নারিকেলও থাকে। এখন বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর হাটের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, এলাকায় নারিকেলগাছ কম এবং ফলনও তেমন হয় না। পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। এতে ক্রেতারা আগের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন।

রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়া দুর্গামন্দিরের কোষাধ্যক্ষ অশোক সরকার বলেন, এ বছর নারিকেলসহ পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আয়োজনের খরচ অনেক বেড়েছে। তাদের মন্দিরে প্রতিবছর পূজার জন্য ১২০টি নারিকেল প্রয়োজন হয়। এবার প্রতি জোড়া ৩০০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে, যেখানে গত বছর দাম ছিল ২০০ টাকা।

তিনি বলেন, বাড়িতে ব্যবহারের জন্য নারিকেলের চাহিদা কিছুটা কমানো গেলেও মন্দিরের পূজায় তা সম্ভব নয়। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কিনতে হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, ১২০টি নারিকেল কিনতে এবার ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর একই পরিমাণ নারিকেলের দাম ছিল ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু নারিকেল কিনতেই মন্দিরটির অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার টাকা।

লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী দুর্গা ও কালীমন্দিরের সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, দুর্গাপূজায় নির্দিষ্ট পরিমাণ নারিকেল ব্যবহার করতেই হয়। দাম যতই বাড়ুক, ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বছর শুধু নারিকেল কিনতেই মণ্ডপপ্রতি বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি শ্যামল ভৌমিক বলেন, দুর্গাপূজায় নারিকেলের নাড়ুর বিশেষ কদর রয়েছে। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও নাড়ু খুঁজে থাকেন। তাই দাম বেশি হলেও মানুষ সাধ্যমতো নারিকেল কিনছেন। তবে নারিকেলের পাশাপাশি অন্যান্য পূজার উপকরণের দাম বাড়ায় মন্দির কমিটিগুলোকে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বাজারে নারিকেলের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা পাইকারি মূল্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন। তবে সরবরাহের প্রকৃত অবস্থা এবং খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির কারণ যাচাই করা প্রয়োজন। ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎসবের বাড়তি চাহিদার মধ্যে তাদের বেশি দামে নারিকেল কিনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার তদারকি জোরদার করে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন সবার সাধ্যের মধ্যে রাখতে নারিকেলের বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতা ও পূজাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঊষার আলো-এসএ