রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে ডিএমপির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে এ ঘটনায় ডিএমপির সংশ্লিষ্ট জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওসি ছাড়াও এসি (সহকারী পুলিশ কমিশনার), এডিসি (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার) ও ডিসি (উপ-পুলিশ কমিশনার) কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে শাহ আলী থানার ওসিকে সংযুক্ত করা হয়েছে।’
ডিএমপির সংশ্লিষ্ট বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জানা নেই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের একাংশের এক নেতা বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বাইরে কিছু করার ক্ষমতা পুলিশের নেই। বিষয়টি সব সিনিয়র স্যাররাই জানেন। তা ছাড়া শুধু ওসি কেন প্রত্যাহার হবেন? ওসি দায়ী হলে ডিসি, এডিসি ও এসিও দায়ী হবেন।’
জানা গেছে, রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের এক আদেশে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে সংযুক্ত করা হয়। ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহরিয়ার আলী এই আদেশে সই করেন।
তবে ওসি জাহাঙ্গীরকে প্রত্যাহার করার বিষয়ে ডিএমপির আদেশে বলা হয়, নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক জাহাঙ্গীরকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহার করে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলায় জড়িতদের মধ্যে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।
তদন্ত কমিটির প্রধান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের দারুসসালাম জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) সালেহ মুহম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা শনিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’
এ ঘটনায় কারা দায়ী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গোপনীয়। এ বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই।’
ধ্বংসস্তূপের সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। তবে যন্ত্রপাতি ও ওষুধের অভাবে অনেকে চিকিৎসা নিতে পারেননি। রোববার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থা দেখতে আসেন অনেকে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘ঢাকা শহরে আমি যদি আমার বাড়িও এক্সকাভেটর দিয়ে ভাঙতে চাই, তাহলেও পুলিশের অনুমতি নিতে হয়, সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হয়। সেখানে পুলিশ এসে নিশ্চিত করেছে, যেন মবতন্ত্রকারীরা নিরাপদে মবতন্ত্র কায়েম করতে পারে।’
পরিদর্শনকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা যদি এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে দেশবাসী মনে করবে—এর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে সবাই অবগত আছেন এবং সবাই এর ভাগ পাবেন।’
রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারল না? এমন পরিস্থিতি থাকলে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কীভাবে আস্থা রাখবে?’
তাসনিম জারা বলেন, ‘এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয় একদল দুর্বৃত্ত। হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুই নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে রেখে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, টাকাসহ অন্যান্য মালামাল লুট করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এই ধ্বংসযজ্ঞ।
হামলার সময় এক্সকাভেটর দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা দুটি সাইনবোর্ড ও দুটি ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা।
প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীলদের ভাষ্য, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এদিকে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে সব মিলিয়ে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত শুক্রবার রাত থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শাহ আলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান আছে।’
ধ্বংসস্তূপের সামনে চিকিৎসাসেবা
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের সামনে বসেই কর্মীরা রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৭ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় আরও অন্তত ১৫ জনকে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে কেন্দ্রটি থেকে দিনে গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ জনকে সেবা দেওয়া হতো। এখন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকায় সেবাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
টিকাদানের পাশাপাশি সেন্টারটিতে মা ও শিশুদের নানা সেবা দেওয়া হতো। গর্ভবতী নারীদের কম খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ ছিল—যা এখন বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসা নিতে এসে অনেকে বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন আশপাশের রোগীরা।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেছেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রায় দেড় কোটি টাকার মালামালের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি, যে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়েছিল, সরকার যেন সেটা ধরে তদন্ত করে সঠিক বিচার করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক শিশুর রুটিন টিকা মিস হয়ে যেতে পারে। টিকা মিস হয়ে গেলে এই এলাকাতেই আবার সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখতে পারি। তাই খুব দ্রুত ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। প্রসব-পরবর্তী যেসব সেবা দেওয়া হতো, তাও এখন বন্ধ। এ ছাড়া প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের কার্যক্রমও চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’
ঊষার আলো-এসএ
