নগরীর আতংক নয়া কিশোর গ্যাং ‘বাংলা বয়েজ’

429
0
ফাইল ফটো: মহানগরী খুলনা

চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত

বিমল সাহা : মহানগরী খুলনায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় মোবাইল ফোনসহ ছোট-বড় চুরির ঘটনা ঘটছে। পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু তৎপরতা থাকলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। আবার ভুক্তভোগীরা নানা আইনী ঝামেলায় এড়াতে বিষয়টি গোপন রাখেন। ফলে অনেক ঘটনায়ই অন্তরালে রয়ে যায়। সম্প্রতি পুলিশের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে এমন একটি ভয়ংকর অপরাধ চক্রের নাম। এই চক্রটি এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগরীর অলিগলিতে। প্রতিনিয়ত তারা মোবাইল ফোন-ল্যাপটপ চুরিসহ নানা অপরাধ চালিয়ে আসছে। চোরাইকৃত এসব মোবাইল ল্যাপটপ বিক্রির জন্য তাদের রয়েছে এলাকাভিত্তিক পৃথক টিম। নয়া কিশোর গ্যাংয়ের নাম ‘বাংলা বয়েজ’। ইতিমধ্যে একাধিক মোবাইল ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত হিসেবে নাম উঠে এসেছে এই বাংলা বয়েজ’র।




অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার ও পশ্চিম টুটপাড়ায় গড়ে উঠেছে নতুন কিশোর গ্যাং ‘বাংলা বয়েজ। গ্রুপের মূল হোতা বাচ্চু (২৫) ওরফে জেন বা জিন। বাচ্চুর পিতার নাম মো. আব্বাস ও মা জোসনা বেগম। ২০১৯ সালে একটি ছাগল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাচ্চু এলাকাছাড়া। এলাকার বাইরে থেকেও সে দিব্যি পরিচালনা করছে তার গ্যাং। এই গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ২৫-৩০ জন। যাদের সিংহভাগই কিশোর সদস্য। তাদের মধ্যে অন্যতম হানিফ (২৩), সিজান (২২), জিতু (২৩), ডালিম (২৩), সুমন (২২) এর নামডাক রয়েছে। এদের মধ্যে দু’জন জিতু ও সিজান গত বছর নভেম্বরে নিউমার্কেট এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়ে। খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর শাহীন পারভীনের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ধরে ফেলে স্থানীয় জনতা। পরে এ ঘটনায় সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাই জিনিসপত্র বিক্রি ও এই গ্রুপের সদস্যদের নানাভাবে সহযোগিতা করে স্থানীয় কতিপয় লোকজন। টুটপাড়া মওলার বাড়ির মোড় এলাকার ইকবালের পুত্র বাপ্পি (২৮) তাদের একজন। গ্রুপের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চুরি, ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে।




যেভাবে বাংলা বয়েজ গ্যাং-এর সন্ধান : সোনাডাঙ্গা খাঁ বাড়ি এলাকায় গত ১৩ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে মৃত মোস্তাক শেখের বাড়িতে তার দুই পুত্র রাস্তি শেখ ও সোয়াত শেখের দুটি মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পরদিন ১৪ অক্টোবর সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় রাস্তি শেখ একটি জিডি করেন (নং-৮৬২)। এই দুই ভাইয়ের মোবাইল ফোন চুরি হওয়ায় তারা বিভিন্ন জায়গায় ফোনের জন্য অনুসন্ধান শুরু করেন। মোবাইল ফোনের লোকেশন অনুসন্ধান করে তারা গত ২৪ অক্টোবর টুটপাড়া করপাড়া রোডে মোবাইল ফোন চোর ও বাংলা বয়েজ গ্যাং-এর অন্যতম সদস্য হানিফকে ধরে ফেলে। হানিফের কাছ থেকে তাদের চুরি যাওয়া একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়। চুরি যাওয়া অপর মোবাইল ফোনটি দেওয়ার জন্য তারা হানিফকে চাপ দেয়। আর এতে বাধা দেন স্থানীয় বাসিন্দা চুন্নু, অপু ও মনি। তারা কৌশলে হানিফকে সরিয়ে দেয়। তারা অন্য তিনটি চোরাই মোবাইল ফোন রাস্তিদের হাতে তুলে দিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানাতে নিষেধ করে। এরপর অনুসন্ধান চালিয়ে ‘বাংলাবয়েজ’ কিশোর গ্যাং-এর সন্ধান পায় পুলিশ।

ছবি: “বাংলাবয়েজ” গ্যাং এর অন্যতম সদস্য হানিফ।

রাস্তি শেখ বলেন, স্থানীয় ওই তিনজন (চুন্নু, অপু ও মনি) তিনটি চোরাই মোবাইল ফোন আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বলে তোমরা এই তিনটি মোবাইল ফোন নিয়ে যাও। এ বিষয়ে পুলিশকে কিছু বলার দরকার নেই। পরবর্তীতে তোমাদের অন্য মোবাইল ফোনটিও দিয়ে দেওয়া হবে। আমরা পুলিশকে বিষয়টি জানিয়ে চোরাই তিনটি মোবাইল ফোন হস্তান্তর করে দিয়েছি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চুন্নু, অপু, মনি ও বাপ্পি মাদকসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় লোকজন তাদের ভয়ে কিছু বলতে সাহস পান না, নানা অপকর্মের সাথে জড়িত থাকলেও কতিপয় পুলিশের সাথে তাদের সখ্য রয়েছে।




নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, এদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। একই সাথে মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত। এলাকায় তাদের সকলে ভয় পায়। চোরদের সাথে তাদের সখ্য রয়েছে। চোরাই মোবাইল ফোন-ল্যাপটপসহ মালামাল বিক্রিতে তারা সহযোগিতা করে।
বাংলা বয়েজ গ্যাং ও অভিযুক্ত কিশোরদের সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জেড এ মাহমুদ ডন বলেন, এসকল কিশোরদের সম্পর্কে মাদক, চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের খবর প্রায়ই শোনা যায়। তবে এরা এলাকায় তেমন কিছুই করে না। যা করে এলাকার বাইরে। এদের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ মাসুদুর রহমান ভূঞা বলেন, কিশোর অপরাধীদের মধ্যে যারা শিশু অর্থাৎ ১৮ বছরের নিচে বয়স তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। আর ১৮ বছরের ওপরে বয়স যাদের তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী সে যেই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।