বিশেষ প্রতিনিধি:
উচ্চ বেতনে বৈধ চাকরি ও দুই বছরের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চার লাখ টাকা নেওয়ার পর ট্যুরিস্ট ভিসায় ভিয়েতনামে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে একটি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। এর পরিণতিতে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর চরম দুর্ভোগ, অনাহার-অর্ধাহার ও বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে যশোরের ইমরান হোসেনকে। অবশেষে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় দেশে ফিরলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই প্রবাসী এখন পরিবারের কাছে শয্যাশায়ী অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী ইমরান হোসেনের অভিযোগ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সাইফুল নামের এক ব্যক্তি তাঁকে বৈধ কর্মসংস্থান ও দুই বছরের ওয়ার্ক পারমিটের আশ্বাস দিয়ে চার লাখ টাকার বিনিময়ে ভিয়েতনামে পাঠান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন, তাঁকে ওয়ার্ক পারমিটের পরিবর্তে ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে। বৈধ কর্মসংস্থানের কাগজপত্র না থাকায় তাঁকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের ভয়ে আত্মগোপনে থাকা, অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটানো এবং কাজ করেও পারিশ্রমিক না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একপর্যায়ে দেশে ফেরার আশায় পরিবারের সহযোগিতায় জরিমানার অর্থ হিসেবে আরও তিন লাখ টাকা প্রস্তুত করেন।
দূতাবাসে গিয়েও সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ
ইমরান হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি হো চি মিন সিটি থেকে প্রায় তিন দিনের দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা করে আরও দুই বাংলাদেশির সঙ্গে হ্যানয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যান তিনি। সেখানে গিয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
ইমরানের অভিযোগ, দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাঁদের ভেতরে নিয়ে কথা না বলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েই সমস্যার বিবরণ দিতে বলেন এবং লিখিতভাবে আবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন। এরপরও তাঁদের কার্যকর সহায়তা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বাধ্য হয়ে তাঁরা হোটেলে অবস্থান করেন। সেখানে আরও কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফেরার বিষয়ে সহায়তার অপেক্ষায় ছিলেন বলে ইমরান জানান।
তবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে দূতাবাসের বক্তব্য নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে বন্দিজীবন, শারীরিক অবস্থার অবনতি
ইমরানের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২৭ জানুয়ারি ভিয়েতনাম ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁদের পাসপোর্ট জমা নেয় এবং দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর আশ্বাস দেয়। কিন্তু এরপরও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল পরীক্ষার পর তাঁকে হ্যানয়ের ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসার অভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে জরিমানার অর্থ প্রস্তুত রাখা এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ গ্রহণের পরও দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা হয়নি বলে তাঁর দাবি। ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন পুলিশ ও আদালতের তত্ত্বাবধানে তাঁকে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়।
দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন, অপুষ্টি ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতেও পারছেন না বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পরিবারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পরিবারের উদ্যোগে সরকারের সহযোগিতা
ইমরানের পরিবার দেশে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত সমাধান না পেয়ে খুলনার নিকটাত্মীয়, সমাজসেবক ও মানবাধিকারকর্মী মো. রাশেদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে রাশেদ রানা লন্ডনপ্রবাসী বন্ধু ও সাংবাদিক মো. অহিদুজ্জামান রুমুর মাধ্যমে বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আনার উদ্যোগ নেন।
ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি, দেশে তাঁর পরিবারের আর্থিক ও মানবিক সংকট এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সাংবাদিক অহিদুজ্জামান রুমু সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাঁর উদ্যোগে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, সরকারের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতায় ইমরানের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরতে পারলেও তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
ইমরানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রতারণার বিচার ও জবাবদিহি দাবি
দেশে ফিরে ইমরান হোসেন তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বৈধ চাকরি ও ওয়ার্ক পারমিটের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের ভূমিকা তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ইমরান ও তাঁর পরিবারের দাবি, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা, দ্রুত দেশে প্রত্যাবাসন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার।
