গরমে স্বাদে ভরা আইসক্রিমের কদর

সর্বশেষ আপডেটঃ
18
0
ছবি: স্বাদে ভরা আইসক্রিম

ঊষার আলো রিপোর্ট : আইসক্রিমের নাম শুনলেই চৈত্রের দাবদাহের মধ্যেও কী যেন এক শীতল পরশ বয়ে যায় দেহ–মনে। হিমায়িত মিষ্টিজাতীয় এ খাবারটি ছেলে-বুড়ো সবারই খুব প্রিয়। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তাঁর মতো প্রকাশ্যে একটার পর একটা না খেলেও আইসক্রিমের প্রতি বুড়োদেরও যে বেজায় আকর্ষণ আছে। সেটা না বললেও চলে। গ্রীষ্মের দুপুরে আইসক্রিমওয়ালার ডাক শুনে ছোটবেলায় কী করেছিলেন, সেটাই একবার ভেবে দেখুন না!

আইসক্রিমের গল্প কিন্তু অতি প্রাচীন বলে জানা যায়। চায়না, ইরান, ইতালি, গ্রিস ও ভারত—সব দেশেরই আছে আইসক্রিম নিয়ে নিজস্ব ইতিহাস। সব অঞ্চলেই প্রাচীনকালে মানুষকে আইসক্রিমের জন্য পাহাড় থেকে আনা বা হিমায়িত জলাশয় থেকে খুঁড়ে নেওয়া বরফের ওপরে নির্ভর করতে হতো। তাই বরফ বিশেষ উপায়ে হিমাগারে সংরক্ষণ করা হতো। বরফের দুষ্প্রাপ্যতার জন্য আইসক্রিম জনসাধারণের নাগালের বাইরেই ছিল বলা যায়।

যখন আঠারো শতকে রেফ্রিজারেটরে বরফ জমানোর কায়দা জানা গেল, ওই সময় প্রথম সাধারণ মানুষ কনকনে ঠান্ডা আইসক্রিমের স্বাদ পেল। যখন উনিশ শতকে আইসক্রিম বানানোর মেশিন আবিষ্কার হয়ে গেল। তখন এ ক্রিমি স্বাদের আধুনিক যুগের চিরচেনা আইসক্রিম যুগের শুভসূচনা ঘটল। সত্যি কথা বলতে গেলে, সাধারণভাবে আমরা সব ধরনের ফ্রোজেন ডেজার্ট বা হিমায়িত মিষ্টিজাতীয় খাবারকেই আইসক্রিম বললেও এগুলোর আছে বৈচিত্র্যময় রকমফের। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ পাশে রেখে এবার প্রধান কয়েকটি হিম হিম আইসক্রিমের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

বরফকে কুরিয়ে মিহি তুষারের মতো পেঁজা ভাব এনে সেটিতে ফলের রস, বিভিন্ন পানীয়, সিরাপ ও রকমারি ফ্লেভার ইত্যাদি মিশিয়ে ১মে হিমায়িত মিষ্টি খাবারের চল হয়েছিল। অঞ্চলভেদে এতে দুধ, বিভিন্ন ফল, বাদাম, মধু, জেলি, গম, চালের আটা ও সাবুর তৈরি বুন্দিয়া, সেমাই ও ফিরনির মতো খাবারও মেশানো হতো। কুচানো বরফ দেওয়া এমন সব মিষ্টি খাবারের মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে পারস্য এবং আমাদের উপমহাদেশের ফালুদেহ বা ফালুদা, ফিলিপাইনের হালো হালো, জাপানি কাকিগোরি ইত্যাদি। এগুলো ঠিক সে অর্থে আইসক্রিম নয়। বরং পাশ্চাত্য দেশে স্নো কোন বা স্নো বল ও আমাদের অঞ্চলের গোলা বা চুস্কি আইসক্রিমে কুচানো বরফ চেপে চেপে আকৃতি দিয়ে তাতে বিভিন্ন ফলের রস, রঙিন সিরাপ দিয়ে খাওয়া হয় যুগ যুগ ধরে। আমাদের দেশে সেই ৪০-৫০’র দশক থেকেই এই গোলা আইসক্রিম খুবই জনপ্রিয়। ইতালিয়ান গ্রানিতা আইসক্রিমে আগে থেকে ফ্লেভার দেওয়া বরফকেই কুচিয়ে বাটিতে দেওয়া হয় খেতে।

তাই ফলের রস বা দুধ জমিয়ে বরফ করে নিলেই পপসিকল, আইস ললি বা সোজা বাংলায় কাঠি আইসক্রিম হয়ে যায়। আইসক্রিমের শুরুর গল্পটি কিন্তু ভারি মজার। ১৯০৫ সালে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের ১১ বছর বয়সী ছোট এক ছেলে তার পানিতে গোলানো পাউডার সোডার গ্লাসটি একটি নাড়নকাঠিসহই বাইরে ফেলে গিয়েছিল ভুলে। বরফে ঢাকা ওই স্থানে রাখা গ্লাসটির পানীয় তীব্র ঠান্ডায় জমে একেবারে বরফ হয়ে গিয়েছিল। পরদিন বেরিয়ে কাঠিসহ মিষ্টি মজাদার বরফ খেয়ে অভিভূত কিশোর ফ্র্যাংক এপারসন বড় হয়ে পপসিকলের পেটেন্ট নিয়ে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয়ের সূচনা করেছিলেন।

আইসক্রিম আমাদের দেশে সেই ষাটের দশক থেকেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন রং এবং ফ্লেভার দেওয়া চিনি-পানি বা দুধ জমিয়ে বাঁশের চ্যাপ্টা কাঠি দেওয়া আইসক্রিম সবার খুব প্রিয় ছিল। অরেঞ্জ ফ্লেভার, লেমন ফ্লেভার, ওভালটিন দুধ আর নারকেল দুধের বেবি আইসক্রিম কোম্পানির আইস ললি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল এ দেশে। ওই পথ ধরে ষাটের দশকে ইগলু এসে দেশের আইসক্রিম জগৎটি পাল্টে দিল একেবারেই। ধীরে ধীরে দেশের আনাচকানাচে সব জায়গায় জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং সুলভে মিলতে লাগল কাঠি আইসক্রিম বা আইস ললি।

ঘন দুধ, মালাইয়ের সঙ্গে চিনি, এলাচিগুঁড়া, গোলাপের নির্যাস, পেস্তা, কাজু, কিশমিশ, কাঠবাদাম এবং ক্ষেত্রবিশেষে আমের মসৃণ ঘন ক্বাথ মিশিয়ে আইস ললির প্রক্রিয়াতেই ছাঁচে জমিয়ে কুলফি বানানো হয়।

উপমহাদেশে ১৬ শতকে মোগল প্রভাবেই প্রথমে কুলফির প্রচলন হয়। রাজকীয় স্বাদের এ হিমায়িত মিষ্টান্ন ধাতব ছাঁচে পুরে তাপনিরোধী বড় বাক্সে বরফ আর লবণের মিশ্রণে ডুবিয়ে রেখে জমানো হতো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে বরফকল প্রতিষ্ঠার পর আমাদের দেশে ত্রিশ-চল্লিশের দশক থেকে বড় মাটির মটকায় লবণ-বরফে চুবানো কুলফি পাওয়া যায় দেদারসে। কিন্তু আজকাল আর আধুনিক আইসক্রিমের দৌরাত্ম্যে মালাইয়ে ভরপুর মটকা কুলফির দেখা মেলা ভার।

ক্ল্যাসিক আইসক্রিমের ইতালীয় সংস্করণ জেলাটোর কথা না বললেই চলে না। আইসক্রিম বোদ্ধাদের কাছে জেলাটোর এক অন্য রকম আবেদন আছে। কথিত আছে, সেই ১৬ শতকেই প্রোকোপিও নামের এক ইতালীয় মিষ্টির কারিগর তাঁর ক্যাফে প্রোকোপে প্রথম জেলাটো পরিবেশন করেছিলেন। আইসক্রিমের মতো মিল্কফ্যাট না ব্যবহার করেই জেলাটোতে দুধ দেওয়া হয়। আইসক্রিমের মতো অত ফেটানো হয় না। সেজন্য জেলাটোর ফ্লেভার বেশ ভালো রকম বোঝা যায়। জেলাটো আইসক্রিমের চেয়ে আরও একটু নরম অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। ইতালিয়ান হিমায়িত ডেজার্ট সেমিফ্রিডোতে এর ব্যবহার রয়েছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও এখন ক্লাব জেলাটোর মতো অভিজাত জেলাটো পারলার রয়েছে অনেক।

ফলের ক্বাথ আর চিনির সঙ্গে কোনো দুগ্ধজাত উপকরণ ব্যবহার না করেই চার্নিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় সরবেট বা শেরবেট–জাতীয় আইসক্রিম। এতে চিনির ঘনত্বের ফলে বরফের হিমাঙ্ক নেমে আসার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানটি কাজে লাগানো হয়। এতে চিনির শিরার জলীয় অংশ দ্রুত বরফের স্ফটিক তৈরি করতে শুরু করায় দ্রবণের শিরা আরও ঘন হতে থাকে। আর সাথে যদি ফলের পাল্প বা ক্বাথটি আম, পিচ ইত্যাদি ফলের মতো আঁশযুক্ত ও ক্রিমি হয় অথবা স্ট্রবেরির মতো প্রাকৃতিকভাবে জেল তৈরি করতে পারে তবে তো কথাই নেই। লেবুর রসের মতো অম্লীয় এবং তরমুজের মতো পানিসর্বস্ব ফলের সরবেট তৈরি করতে চিনির বেশি ঘন শিরা আর বেশ খানিকটা মুনশিয়ানার প্রয়োজন পড়ে। আইসক্রিমের আবেদন আসলে সর্বজনীন নয়, একেবারে বিশ্বজনীন। গরমকালে হিমশীতল আইসক্রিমের তুলনা আর কিছুর সাথেই দেওয়া যায় না। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, জন্মদিন ও যেকোনো খুশির খবর আইসক্রিমের সাথে উদ্‌যাপিত হলে যেন খুশি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

(ঊষার আলো-আরএম)

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ