করোনার ভয় ভুলে সৌহার্দ্যের কোলাকুলি

সর্বশেষ আপডেটঃ
ছবি: সংগৃহীত

ঊষারআলো ডেস্ক: গেলো দুই বছর করোনা ভাইরাসের মহামারির চোখ রাঙানি সহ্য করতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে। জনজীবনে এমন স্তব্ধতা নেমে এসেছিল উৎসব আনন্দেও স্বজনদের কাছে এসে মিলিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। হাত মিলিয়ে কোলাকুলি না করলে ঈদের পূর্ণতা পেতো না। সেখানে করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের নিষেধাজ্ঞাই ছিল কোলাকুলি-করমর্দন না করার। তবে এবার স্বস্তি ফিরেছে মহামারির বিনাশে। হাতে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলি হয়েছে ঈদের সকালে।
আজ মঙ্গলবার (৩ মে) পবিত্র ঈদুল ফিতর। ৩০ দিনে রমজান মাস শেষে শাওয়াল মাসের শুরু। এই মাসের প্রথম দিনটি ঈদুল ফিতর হিসেবে পালিত হয়। করোনার চোখ রাঙানিতে গেল ২ বছর ঈদ ছিল প্রচলিত আয়োজনহীন। এবার স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় সারা দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে।
করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গেলো দুই বছর ঈদের নামাজে জনসমাগম রোধের পাশাপাশি কোলাকুলি-করমর্দন না করার নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। করোনার ভয়াবহতায় মানুষজনও স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। সম্প্রতি দীর্ঘ বিধিনিষেধ ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার মধ্য দিয়ে ক্ষীণ হয়েছে করোনা সংক্রমণের হার। ঈদের আগ দিন পর্যন্ত টানা ১১ দিন করোনায় কারও মৃত্যু হয়নি সারা দেশে। এবার আর কোন বিধি নিষেধ আরোপ করেনি সরকার। ফলে স্বরূপে ফিরেছে ঈদের আনন্দ আয়োজন।
রাজধানীসহ সারা দেশে ঈদের জামাত শেষে চেনা-অচেনা সবাই শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন কোলাকুলি করে। সৌহাদ্যের চিত্র দেখা মিলেছে ঈদগাহ ময়দানে। ঈদের নামাজ আদায়ের পর মুসল্লিদের মধ্যে পারস্পারিক কোলাকুলি-করমর্দনের ধুম পড়ে যায়।শুধু ঈদগাহ নয়, ঈদের এ সময়ে পরিচিত জনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে কোলাকুলি-করমর্দন প্রাচীন রেওয়াজ।
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন আবির আলম। তিনি বললেন, গত দুই বছর বিধি নিষেধ ছিলো। মানুষজনও শঙ্কা থেকে কোলাকুলি করতে চাইতো না। এবার ভালো লাগছে যে সেই শঙ্কা নেই। বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে কোলাকুলি করতে পেরেছি।
সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গিয়ছেন আব্দুল ওয়াদুদ। ৫ বছরে নাতির সঙ্গে কোলাকুলি করছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। দাদা আব্দুল ওয়াদুদের মধ্যে উৎসাহ থাকলেও নাতি ভুগছেন অস্বস্তিতে। আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ওতো সবে মাত্র বুঝতে শিখছে, গেলো ২ বছর তো ও কোলাকুলি দেখেনি, ফলে স্বস্তি বোধ করছে না। এই মহামারি আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যেসেও প্রভাব ফেলেছে। অথচ আমরা ছোট বেলায় প্রতিযোগিতা করতাম কোলাকুলি নিয়ে। ঈদের দিনে কে কতজনের সাথে কোলাকুলি করতে পেরেছে।
কোলাকুলি শুধু বাংলাদেশে মধ্যে প্রচলিত রেওয়াজ নয়। ধর্মীয় ভাবেও ঈদের দিনে কোলাকুলির গুরুত্ব রয়েছে। সামাজিক সম্প্রতিতেও কোলাকুলি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, একদা নবী কারিম (স.) এর কাছে হাসান (রা.) আসলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলাকুলি করলেন। রাসুল (স.) দীর্ঘদিন পরে কারও সঙ্গে সাক্ষাতে কোলাকুলি করতেন।
কোলাকুলির মজার স্মৃতিস্মরণ করে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের চারপাশে অনেক শ্রদ্ধেয় মুরুব্বি থাকেন যাদের সামনে দাড়াতেও আমরা সংকোচ বোধ করি, সাহস পাই না। অথচ এ এলো তাদের সঙ্গে কোলাকুলিতে কোন বাঁধা নেই।
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা স্কুলে থাকতে বন্ধুরা বাজি ধরতাম, কে হেড স্যারের সাথে কোলাকুলি করবে, কে চেয়ারম্যান চাচার সাথে কোলাকুলি করবে। প্রথম প্রথম ভয় লাগতো, কিন্তু কোলাকুলি করার পর ভালোই লাগতো। আব্বা যখন বুকে জড়িয়ে ধরতো তখন মনে হতো, সারা বছর কেন আব্বাকে এতো ভয় লাগে। সেই দিনগুলো হয়তো ফিরে পাবো না, কিন্তু কখনও ভুলবোও না।
বৈজ্ঞানিকভাবেও কোলাকুলির উপকারিতার তথ্য রয়েছে। বলা হয়, কোলাকুলি করার সময় আমাদের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন নামে এক হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই হরমোনটির মাত্রা যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, তত আমাদের মন ভাল হতে শুরু করে। ফলে যার সঙ্গে কোলাকুলি করছেন, তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সেই সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতাও বৃদ্ধি পায়। নর্থ ক্যারোলাইনা মেডিক্যাল স্কুলের মনোবিজ্ঞানী ক্যারেন গ্রুজেন বলেন, ‘কোলাকুলি করলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল মান হ্রাস করে এবং বাড়িয়ে দেয় ‘ভালো লাগা’ হরমোন ডোপামিন ও সেরোটনিন।’ (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন)

ঊআ-বিএস