এবারও চাঁদ উঠবে না অর্থনীতির আকাশে

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো ডেস্ক : বছরের একটা মৌসুম চাঙ্গা থাকে দেশের অর্থনীতি। সেই মৌসুম দরজায় কড়া নাড়লেও উৎকণ্ঠার ছাপ ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে। দেশের দোকান মালিক সমিতি সূত্রে দেখা গেছে, ২৫ লাখ দোকানে ঈদ মৌসুমে কেনাকাটা হতো দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু গতবছরের মতো এ বছরের চিত্রও একই। ব্যাবসায়ীদের আশঙ্কা, করোনার কারণে তলানিতে ঠেকতে পারে এবারের ঈদ-বাণিজ্য। আগেরবারের চেয়ে লেনদেন কমে যেতে পারে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার।
ঈদকে ঘিরে অর্থনীতির সব খাতেই গতি আসে। চাকরিজীবীরা এবার ১২ হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস তুলবেন। এর পুরোটাই যাওয়ার কথা ঈদের বাজারে। জাকাত-ফিতরার কারণে দরিদ্রদের পকেটেও কিছু টাকাকড়ি জোটে। প্রবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠান বেশি। সে টাকাও আসার কথা ঈদের বাজারে। শপিং মল বা মার্কেটগুলোর বাইরে কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউসগুলোয় বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। অথচ এবার মন্দার হাওয়া সব খাতেই।
এফবিসিসিআই-এর তথ্যমতে, ঈদে পোশাকসহ যাবতীয় বস্ত্র খাতে ৬০-৭০ হাজার কোটি টাকা, জুতা-কসমেটিকস খাতে তিন হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্যে সাত হাজার কোটি, জাকাত-ফিতরা ও দান-খয়রাতে ৩৮ হাজার কোটি, যাতায়াতে ১০ হাজার কোটি, সোনা-হীরার গহনায় পাঁচ হাজার কোটি, পর্যটনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিকসে চার হাজার কোটি, স্থায়ী সম্পদে এক হাজার কোটি, ওমরাহ পালনে লেনদেন হয় তিন হাজার কোটি টাকার।
এ ছাড়া ফার্নিচার, গাড়ি ও আবাসন শিল্পেও বড় লেনদেন হয়। অনেকে ঈদের কেনাকাটা করতে বিদেশে যেতেন। এর প্রভাবও ছিল স্থানীয় বাজারে। বিত্তশালীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা জাকাত প্রদান করার কথা এ বছর। যার পুরোটা ঈদ উপলক্ষে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও তা না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
দোকান মালিক সমিতি সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশের ২৫ লাখ দোকানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন কেনাবেচা হয় তিন হাজার কোটি টাকার। রোজার মাসে তিনগুণ বেড়ে যেতো অংকটা। এবার তা তো হচ্ছেই না, উল্টো আরও কমেছে।
মহামারির ধাক্কা সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে, কেউ কমিয়েছে বেতন-ভাতা। কারও বেতন পড়ে আছে বাকি। লাখ লাখ মানুষের আয়ও কমেছে। জমানো টাকায় চলছেন কেউ, কেউ আবার বিপদের কথা ভেবে খরচের কথা ভাবছেন না। এদিকে দোকানপাটও সেভাবে খুলছে না। ৪ এপ্রিল থেকে সারামাস ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত বন্ধই ছিল। কদিন আগে বৈশাখেও বিক্রির মুখ দেখেননি ব্যবসায়ীরা।
২৫ এপ্রিল রবিবার থেকে দোকান ও শপিং মল খোলার অনুমতি দিলেও সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ফলে ঈদের বাজার ও অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে না সহসা। বেঁধে দেয়া সময়ের কারণে ঠিকমতো বেচাকেনা হচ্ছে না ব্যবসায়ীদের।
দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, গতবছর রোজার ঈদে দোকানগুলোতে বেচাকেনা হয়েছিল অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকার। আশঙ্কা করা হচ্ছে গতবছরের চেয়ে ব্যবসা এবার কম হবে। এবারও লোকসান গুনবেন ব্যবসায়ীরা।
তবে ঈদের আগে সরকার দোকান ও মার্কেট খুলে দেয়ায় দেশের ৫৬ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কোনোমতে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবেন বলে মনে করেন হেলাল উদ্দিন। সরকারের এই উদ্যোগের কারণে তাদের অন্তত হাত পাততে হবে না বলে জানান তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্যান্য বছর ঈদ উপলক্ষে অর্থের বড় একটা যোগান আসে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস থেকে। এ ছাড়াও অন্যতম উৎস প্রবাসীদের পাঠানো টাকা। তবে এবছরও বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বোনাস দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস ঠিক থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আগের মতো কেনাকাটা করতে পারবেন না। নিম্ন মধ্যবিত্তরা নিত্যপণ্য জোগাড়েই ব্যতিব্যস্ত। কেনাকাটার চিন্তা তারা ঘুর্ণাক্ষরেও করছেন না। দরিদ্র ও দুস্থরা পুরোপুরি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ওপর এখনও নির্ভরশীল। মার্কেটগুলোর সামনে ও রাস্তায় তাদের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। টাকার হাতবদল না হলে অর্থনীতির চাকা যে চলবে না, সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবারও।
এতো কিছুর প্রভাব পড়তে চলেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত ও ঋণের অংশ হিসেবে গ্রামের অংশ শহরের তুলনায় বেশ কম। গ্রাম থেকে যতো আমানত নেয়া হচ্ছে, তার অর্ধেক বিনিয়োগ হচ্ছে শহরে। কিন্তু ঈদে সচরাচর এর বিপরীতটা দেখা যায়। শহরের মানুষ হয় গ্রামমুখী। এতে সারা বছর স্তিমিত থাকা গ্রামের হাট-বাজারও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এবার সেই উৎসবমুখ হাটও চোখে পড়বে না। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

(ঊষার আলো-এমএনএস)