করোনা দুর্যোগ কেটে যাক, ঈদ আনন্দ হোক ঘরে ঘরে

সর্বশেষ আপডেটঃ
Koushik_Avajon

বিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি। সংবাদকর্মীদের দুটি বড় ছুটির মধ্যে এটি অন্যতম। অপর বড় ছুটিটি ‘ঈদুল আযহায়। দুটি ছুটি তিনদিনের, এবার ৩০টি রোজা হওয়ায় ঈদুল ফিতরের ছুটি বেড়ে চারদিন হয়েছে। এ যে মহা আনন্দ! প্রতি বছর ঈদুল ফিতর আসলেই ৩০টি রোজা পূরণের প্রত্যাশা করি, যাতে গ্রামের বাড়িতে একদিন বেশী থাকতে পারি। কিন্তু এবার সেই আশা পূরণ হলেও মনে খুব একটা আনন্দ নেই। করোনা অতিমারী সব আনন্দে বিষাদের ছায়া ফেলেছে। গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। অনেকটাই নগর জীবনের কর্মব্যস্ততার জীবন। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব দূরে যাওয়া ব্রাত্য। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৌঁড়ঝাপের অন্ত নেই। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে চলমান লকডাউন সত্ত্বেও ঘরে ফেরা মানুষের স্রোত কিছুতেই কমছে না। এ যেন মহামিছিল, বাড়ি ফিরতেই হবে। এ যেন এক যুদ্ধ। আর যুদ্ধের মিছিলে দুর্ভোগের কমতি নেই। আমরা সব মানুষেরা ছুটছি জীবন হাতে মুঠোয় রেখে। ট্রাক, মুরগীর খাঁচায় ছুটছে মানুষ! আবার অন্যদিকে চোখ রাঙাচ্ছে করোনা অতিমারী। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। অর্থসংকট, গরীব থেকে গরীব হওয়ার প্রতিযোগিতা। তারপরও আমরা ছুটছি তো ছুটছি। শহরের মার্কেটগুলোতে মানুষের ভিড় কোনভাবেই আমাদের এতো সংকট আঁচ করা যাচ্ছে না। কী হবে সত্যিই বলা মুশকিল, ভবিষ্যতবাণীও অনিশ্চিত।
মনেপড়ে ছেলেবেলার কথা। মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান। রোজার শেষ দিনে সত্যিই এক আনন্দ দিতো। পূর্বাকাশে এক ফালি চাঁদ যেন আনন্দের বন্যা বয়ে দিতো। বন্ধু-প্রতিবেশীদের এ আনন্দ- আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হতো। সকাল হলে বন্ধুরা নতুন পোষাকে আতর মেখে ঈদের নামাজ আদায় করতো। তাঁরা বাড়ি ফিরলেই হতো মিষ্টিমুখ। দুধ-সেমাই রান্নার সেই স্বাদ যেন আর পাইনা। দুপুর বেলা মোরগের মাংশ, ডিমের কোরমা, জর্দ্দাভাত সাথে লাচ্ছা সেমাই; রাতের নিমন্ত্রণতো ছিলই। আমার বড়মা (জেঠিমা/কাকী), দিদিদের হাতের রান্নার স্বাদ সত্যিই ভোলার নয়। যতদিন বেঁচে থাকবো-এসব ভুলে যাওয়ার নয়। এখন সময় পাল্টেছে; নানা রকমারী, অভিজাত রান্নার স্বাদ মনে তৃপ্তি দেয়না। পেট ভরে, কিন্তু মন ভরে না। ছোটবেলা থেকে আমরা বড় হয়েছি মিশ্র ধর্মীয় আবহে। আমরা বন্ধুরা যে ধর্মের মানুষই হইনা কেন, সকল উৎসব-আনন্দ হতো সম্মিলিত। পাশাপাশি বাড়ি, পাশাপাশি ঘর; বিপদ-আনন্দ-বেদনায় আমরা একসাথে সামিল হতাম। এ এক অন্যান্য প্রাপ্তি, অন্যরমক সুখ। আহা সেই দিনগুলি কোথায় কোথায়…।
বিগত দুই-তিন দশক আমাদের জীবনযাত্রা অনেকটা পাল্টে গেছে। এখন আমরা আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক হচ্ছি। প্রযুক্তি আমাদের জীবনটাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ছাত্রজীবনে বাড়ি থেকে বাবার পাঠানো টাকার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় কতদিন কাটিয়েছি, সেই হিসেব এখন নেই। প্রচুর সংখ্যক চিঠি লিখতাম; মা-বাবার কাছে, ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছে। কখনো পোস্টকার্ডে আবার কখনো খামে। আজ আর কেউ এমন অপেক্ষা করেনা। মুহূর্তেই কোটি কোটি টাকা পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশে। মোবাইলে স্কীনের ছোট একটু ছোঁয়ায় প্রিয়জনের দেখা মিলছে, আরও কত কী।
বলছিলাম ঈদুল ফিতরের আনন্দ নিয়ে। ২০২০ সাল, আমি বলি, বিষে ভরা বছর। একুশ সালে এসে অনেকটাই মুক্তির ছোঁয়া পেয়েছিলাম। বিগত বছর শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা বিশ্বে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান উৎসবের আমেজ পায়নি। স্বজনহারা বেদনা, একটি ছোট ভাইরাসের প্রচন্ড দাপট সবকিছু ম্লান করে দিয়েছে। তাই একুশের নতুন দিনে আমার মতো অনেকেই মুক্তির আনন্দ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সব প্রত্যাশা ও স্বপ্ন সুফল এনে দেয় না। এবারও তেমনটি ঘটে গেল। অচেনা করোনা অতিমারী আমাদের ওপর ফের চড়াও হয়েছে। এ চড়াও হওয়া গেল বছরের তুলনায় আরও দাপুটে, আরও শক্তিশালী। তাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ অনেকটাই ম্লান।
শুধু বাংলাদেশই নয়, করোনা গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে থমকে দিয়েছে। দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে অনাহারী-কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। আমাদের সরকার এই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রথম থেকেই সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, কর্মহীন-দরিদ্র মানুষকে সহায়তা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক কঠোর পরিশ্রম করছেন। মূলত: এসব অতিমারীর ক্ষেত্রে সরকারের গৃহিত উদ্যোগ ও সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর। নাগরিকগণ সরকার গৃহিত নির্দেশনা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনা সংক্রমণ বা এই অতিমারী থেকে রেহাই পাওয়া কিছুটা হলেও সম্ভব। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। কেউ কেউ বলছি, করোনা ঠেকাতে গেলে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে, তাই তারা সবকিছু মানতে পারছে না। আবার কেউ বলছে, সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত। আর বাস্তবতা হচ্ছে ‘শাঁখের করাত’ অবস্থা। বাঁচার চেষ্টা নিজেকেই করতে হবে। বেঁচে থাকলে অর্থনীতি বাঁচতে, উৎসব হবে, আনন্দ হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময় আশাবাদী। আমাদের ‘ঘোর অমানিশা’ একদিন কেটে যাবে। নতুন ভোরের সূচনা হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে মানুষ আবার আনন্দ-উৎসবে রঙিন হবে। কর্মহীন বেকার মানুষগুলো কাজ ফিরে পাবে। অর্থনীতির চাকা ঘুরবে। নতুন নতুন মিলকারখানা গড়ে উঠবে। আমাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে। পবিত্র ঈদুল ফিতর যেন আমাদের সেই সুদিনের যাত্রা শুরু করে। বিষাদের কালো ছায়া মুছে, প্রতিটি ঘর যেন আনন্দমুখর হয়ে ওঠে- এমন প্রত্যাশাই করতে চাই। সকলকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা।
লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা, দৈনিক কালের কণ্ঠ।