বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই জন্ম শরীয়তপুর জেলার

সর্বশেষ আপডেটঃ
।। মো. আজিজুল হক (আজিজ মল্লিক) ।।
লেখক আজিজ মল্লিক

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল পদ্মাপাড়ের ঐতিহ্যবাহী জেলা শরীয়তপুরের। কিন্তু সে ইতিহাস অনেকেরই অজানা। কালের পরিক্রমায় আড়ালে পড়ে গেছে জেলা গঠনে তাঁর ভূমিকার কথা। কেউ কেউ জানলেও এ বিষয়ে কাউকে কথা বলতে দেখা যায়না। এমনকি এ বিষয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের নিরবতা শরীয়তপুরের ইতিহাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। এ জেলা গঠনের পেছনে যারা কাজ করেছেনে তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। সেজন্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জেলা গঠনের প্রকৃত ইতিহাস। অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে আজকের প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধুর একজন কর্মী এবং শরীয়তপুর জেলা গঠনের একজন জীবন্ত স্বাক্ষী হিসেবে আমি ৯৩ বছর বয়সে আজ তুলে ধরছি আমাদের প্রিয় জেলা গঠনের অজানা অধ্যায়।

মহকুমা গঠনে বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন : ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুই প্রথমে তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার পাঁচটি থানা (বর্তমানে উপজেলা) ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট, নড়িয়া ও পালং নিয়ে শরীয়তপুর মহকুমার অনুমোদন দেন। তিনি শরীয়তপুরের সদর দফতরের স্থান হিসেবে ভেদরগঞ্জ থানার মহিষারের দিগাম্বরীর নামও নির্বাচন করেন। তবে তিনি তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। সরকারীভাবে ঘোষনা আসার আগেই ১৫ আগষ্ট ঘাতকের বুলেটের আঘাতে স্বপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আর শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে দেখে যেতে পারেননি। তার নির্দেশ অনুযায়ী মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে মহিষারের দিগাম্বরীতেও হয়নি জেলার সদর দফতর।

উপেক্ষিত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ : বঙ্গবন্ধু শাহাদাতবরণ করার পর অনেক যড়যন্ত্র ও দেন-দরবার করে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে ১৯৭৭ সালের ১০ই আগস্ট জিয়াউর রহমানের সময় সরকারীভাবে ঘোষিত হয় শরীয়তপুর মহকুমা এবং এইচএম এরশাদের সময় ৭ই মার্চ ১৯৮৩ সালে শরীয়তপুর মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে মুছে ফেলার জন্য তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী শরীয়তপুরের সদর দফতর মহিষারের দিগাম্বরীতে না করে পালংকে বেছে নেয়া হয়। পাঁচটি থানার সাথে যোগ করা হয় জাজিরাকে। এভাবেই শরীয়তপুর জেলা গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভুমিকাকে আড়াল করে ফেলা হয়।

পেছনের ইতিহাস : এবার আসি শরীয়তপুর মহকুমার সৃষ্টির প্রেক্ষাপট ও পেছনের ইতিহাসে। ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে ঢাকায় বসবাসকারি তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার পূর্বাংশের ৫টি থানার (ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট, নড়িয়া, পালং ও জাজিরা) লোকজনকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য ডামুড্যা নিবাসি জনাব খোদাবক্সকে সভাপতি ও নড়িয়া নিবাসি জনাব এসএমকে জয়নাল আবেদিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে কোষাধ্যক্ষ করে ৩৩-সদস্য বিশিষ্ট পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতি নামে একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এই সমিতির প্রথম উপলদ্ধি ছিল পিছিয়ে পড়া এ জনপদের উন্নয়ন এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি আলাদা মহকুমা করা প্রয়োজন। তাই সমিতির গঠনের পর থেকেই মাদারীপুর মহকুমার পূর্বাংশের ৫টি থানা নিয়ে একটি আলাদা মহকুমা সৃষ্টির দাবি তোলা হয়।

পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতি গঠনের প্রেক্ষাপট : ষাটের দশকে ঢাকাতে ’ফরিদপুর মজলিশ’ নামে একটি একটি জেলা সমিতি ছিল। এর সভাপতি ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন গোপালগন্জের জনাব সায়েদুর রহমান। ১৯৬০ সালে আমি এই সমিতির কার্যকরি সদস্য ছিলাম। ১৯৬২ সালে সমিতির দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও নিবার্চনে পূর্ব মাদারীপুরের লোকজন ইষ্টার্ণ ফেডারেল ইন্সুরেন্স কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ডামুড্যা নিবাসি জনাব খোদাবক্স সাহেবকে সভাপতি পদে দাঁড় করিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। অন্যদিকে, পুলিশের সাবেক আইজি ফরিদপুরের ইসমাইল সাহেবও সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেন। মাদারীপুর মহকুমায় ভোটার সংখ্যা অনেক বেশী ছিল। কিন্তু মাদারীপুরের ভোটাররা পূর্ব মাদারীপুরের খোদাবক্সকে ভোট না দিয়ে ইসমাইল সাহেবকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেন। সেখান থেকেই মাদারীপুরের পূর্বাংশের লোকদের মধ্যে পশ্চিমাংশের লোকদের প্রতি বিরুপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই পূর্ব মাদারীপুরের লোকদের মধ্যে একটি আলাদা মহকুমা করার চিন্তা জাগ্রত হয়। তখন আমি এবং নারায়নপুরের আর্টিস্ট কুদ্দুস সাহেব ঢাকায় অবস্থানরত এ এলাকার লোকদের বাসায় বাসায় গিয়ে পূর্ব মাদারীপুরের লোকদের নিয়ে একটি আলাদা সংগঠন করার সমর্থন যোগাতে কাজ করি। অবশেষে ভেদরগঞ্জের আবদুল গণি মাষ্টারের সভাপতিত্বে এক সভায় পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতি গঠন করা হয়।

বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি : ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে উক্ত ৫টি থানা (ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট, নড়িয়া, পালং ও জাজিরা) নিয়ে একটি আলাদা মহকুমা করার জন্য পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন সভা সমাবেশ থেকে এবং সংবাদপত্রে চিঠিপত্রের মাধ্যমে জোরদার হতে থাকে এই দাবি। কিন্তু পাকিস্তান আমলে বারবার দাবি তোলা সত্ত্বেও আমাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ সাড়ে নয় মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয় এবং বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমাদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়ে ১৯৭৫ সালে মাদারীপুর পূর্বাংশের ৫টি থানা নিয়ে একটি আলাদা মহকুমা করার অনুমোদন দেন।

দুই নেতাকে সংবর্ধনা : বঙ্গবন্ধু শরীয়তপুরের কৃতি সন্তান জাতীয় নেতা আবদুর রাজ্জাককে বাকশালের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করায় এবং সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবেদুর রেজা খান, এমএনএকে মাদারীপুর মহকুমার গভর্ণর নিয়োগ দেয়ায় তাদের দু’জনকে ইনিস্টিটিউট অব ইন্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ মিলনায়তনে বড় আকারে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এতে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ও ৬২ জন গভর্ণরের মধ্যে অধিকাংশই উপস্থিত ছিলেন। সভায় আমাকে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তারা ৫টি থানা নিয়ে আলাদা মহকুমা গঠনের দাবি জানান।

মহিষারে সদর দফতর চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু : পূর্ব মাদারীপুরের ৫টি থানা (ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট, নড়িয়া ও পালং) নিয়ে নতুন মহকুমা অনুমোদন হওয়ার পর পরই বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানানোর জন্য জাতীয় নেতা জনাব আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে এডভোকেট আবিদুর রেজা খান, লাকার্তা নিবাসী চুন্নু মিয়া ও জনাব কবির শিকদার, জনাব সামিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, নারায়ণপুরের জনাব আবদুর রশিদ মুন্সি এবং আমিসহ আরো কয়েকজন বাকশাল অফিসে যাই। বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতকালে তিনি আবদুর রাজ্জাককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মহকুমা তো অনুমোদন দিলাম কিন্তু নতুন মহকুমার সদর দফতর কোথায় করবি?”

রাজ্জাক সাহেব উত্তরে বললেন, “আপনি তো আমাদের এলাকা সবই চিনেন, আপনি যেখানে বলবেন সেখানেই হবে।” এ সময় বঙ্গবন্ধু বললেন, “রাজ্জাক, ফাতেমা জিন্নাহর ইলেকশনের সময় ঐ যে একটা বিরাট দিঘী তুমি দেখাইলা, ওখানে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ছিল, মেলা হতো, পাঠা বলি হতো, ওখানকার হিন্দুরা প্রায় নাকি ভারত চলে গেছে। ওখানেতো অনেক পরিত্যাক্ত বাড়ি, জায়গা রয়েছে। ওখানে সদর দফতর হলে মধ্যখানে হয়।”রাজ্জাক সাহেব বললেন, ঐ জায়গার নাম মহিষার দিগাম্বরী খোলা। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন ওখানে সদর দফতর করো। সংস্থাপন বিভাগের একজন অফিসার নিয়ে জায়গাটি দেখাও।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কিছুদিন পর রাজ্জাক সাহেব সংস্থাপন বিভাগের একজন উপসচিবসহ এলাকা পরিদর্শন করেন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মহিষারে নতুন মহকুমার সদর দফতর হবে বলে জনসন্মুখে ঘোষনা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার নতুন মহকুমার সদর দফতর সরকারীভাবে ঘোষনা দেয়ার আগেই ঘটে গেলো ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম ঘটনা। একটি কুচক্রিমহল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। পাল্টে যায় প্রেক্ষাপট থেমে যায় নতুন মহকুমা গঠনের কার্যক্রম।

ডামুড্যায় সদর দফতর করার চেষ্টা : বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী মহিষারে যাতে সদর দফতর না হয় সে জন্য ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে ডামুড্যার কিছুসংখ্যক লোক নতুন মহকুমার সদর দফতর ডামুড্যাতে করার জন্য দাবি তোলে। তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ডামুড্যায় সদর দফতর করার দাবির ব্যাপারে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক জনাব আবদুল মুহিদ চৌধুরীর মতামত চেয়ে পত্র দেন। চিঠির জবাবে জেলা প্রশাসক ডামুড্যাতে বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা থাকার যুক্তি দেখিয়ে সেখানে সদর দফতর করার পক্ষে জোড়ালোভাবে মতামত দেন। এরই প্রেক্ষিতে ডামুড্যাতে সদর দফতর করার বিষয় আলোচনার জন্য কেবিনেট মিটিংয়ের এজেন্ডাভুক্ত করা হয়।

মহিষারে সদর দফতরের দাবিতে ঐক্য : এদিকে নতুন মহকুমার সদর দফতর এক কর্ণারে ডামুড্যাতে হচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে ভেদরগন্জ, নড়িয়া ও পালং থানার জনগণ মহিষারে সদর দফতর করার দাবিতে একাট্টা হয়ে যায়। ঢাকায় বসবাসকারি এই তিন থানার গন্যমাণ্য ব্যক্তিগণ লাকার্তার জনাব মশিউর রহমান শিকদারের বাসায় এক জরুরী সভার আয়োজন করে। সভায় সকল বক্তা নতুন মহকুমার সদর দফতর এক কোণে ডামুড্যাতে করার তীব্র বিরোধীতা করেন এবং মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে মহিষারে সদর দফতর করার পক্ষে ঐকমত্য পোষন করেন। সভায় কর্ণেল শওকত আলী, এডভোকেট আবেদুর রেজা খান, জনাব সামিউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, লাকার্তার আমিনুর রহমান শিকদার ওরফে চুন্নু মিয়া, চামটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আমির হোসেন, পালং এর চেয়ারম্যান রথীন্দ্রনাথ ঘটক, বিনোদপুরের চেয়ারম্যান জনাব নাসিরউদ্দিন কালুও মহিষারকে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। এসব থানার গণ্যমান্য লোক, পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা মহিষারে সদর দফতর করার দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেন এবং টেলিগ্রাম পাঠান। এছাড়া ভেদরগঞ্জ, নড়িয়া ও পালং থানার সকল ইউপি চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষরিত এক আবেদনেও মহিষারে সদর দফতর করার দাবি জানানো হয়। জাতীয় নেতা জনাব আবদুর রাজ্জাক তখন কারাগারে ছিলেন। আমি নতুন মহকুমার সদর দফতরের ব্যাপারে তার মতামত নিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর নির্ধারিত স্থান মহিষার ছাড়া তিনি অন্য কোথাও সমর্থন দেবেননা। শেষ পর্যন্ত একটি সাইট সিলেকশন কমিটি গঠনের মাধ্যমে পূর্বের পাঁচটি থানার সাথে জাজিরা থানা যোগ করে মোট ছয়টি থানা নিয়ে নতুন মহকমা করার প্রস্তাব করা হয়। কমিটি পালং থানার সদর দফতরকে মহকুমার সদর দফতর হিসেবে নির্ধারণ করেন।

শরীয়তপুর মহকুমার উদ্বোধন : কামেল পীর ফরায়েজী আন্দেলনের নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নাম অনুসারে এই মহকুমার নামকরণ করা হয় শরীয়তপুর। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর শরীয়তপুর নবগঠিত মহকুমার উদ্বোধন করেন তৎকালিন খাদ্য মন্ত্রনালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপদেষ্টা আবদুল মোমেন খান। নতুন মহকুমা ঘোষনার পর পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতি পূনর্গঠনের প্রয়োজন হয়। আমাকে এ ব্যাপারে একটি সভা ডাকার দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৮ সালের ১৭ অক্টোবর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে আমি এক সভার আয়োজন করি। সভায় ঢাকায় বসবাসকারি ৬ থানার লোকজন মহকুমার উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে নেয়ার জন্য জনাব মশিউর রহমান শিকদারকে সভাপতি ও আবুজর গিফারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জনাব জহুরুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩১-সদস্য বিশিষ্ট শরীয়তপুর মহকুমা জনকল্যাণ সমিতি গঠন করা হয়।

জেলায় উন্নয়ন : মহকুমা হওয়ার মাত্র সাত বছর পর জেনারেল এইচএম এরশাদের সময় ১৯৮৩ সালের ৭ মার্চ শরীয়তপুরসহ সবক’টি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। অতপর ১৯৮৫ সালে ঢাকায় জাজিরার সাবেক এমপি জনাব আমিনুল ইসলাম দানেশের সভাপতিত্বে এক জরুরী সভা আহবান করা হয়। সভায় কার্তিকপুরের জনাব সামিউদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে সভাপতি এবং আমাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৩-সদস্য বিশিষ্ট শরীয়তপুর জেলা উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়। চার বছর পর পূনরায় সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম দানেশকে সভাপতি ও আমাকে সাধারণ সম্পাদক পূনর্নিবাচিত করা হয়। আমি ১১ বছর একই পদে বহাল থেকে জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে ভুমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।

আড়ালে পড়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর অবদান : ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সময় শরীয়তপুর মহকুমা সরকারীভাবে ঘোষনা করা হয় এবং ১৯৮৩ সালে এরশাদের সময় তা জেলায় উন্নীত হয়। কিন্তু এর অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু নতুন মহকুমার অনুমোদন দিয়েছিলেন, এমনকি মহিষারকে এর সদর দফতর হিসেবে স্থান নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তুু দুঃখজনকভাবে সে ইতিহাস আজ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সেজন্য জেলা গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রয়োজন সরকারীভাবে উদ্যোগ গ্রহনের।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করি। ঢাকার গোপীবাগ-নারিন্দা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৯৭ সালে আবদুর রাজ্জাক পানিসম্পদ মন্ত্রী থাকাকালে শরীয়ত মহকুমা গঠন ও এর উন্নয়নে ভূমিকাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডের স্বীকৃতি হিসেবে আপনার সরকার আমাকর জেলার শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে গুনীজন সংবর্ধনা প্রদান করে। এছাড়া মহানগর আওযামীলীগের একজন কর্মী হিসেবে ১৯৭০ ও ১৯৭৩ এর জাতীয় নির্বাচনের সময় টিকাটুলির কামরুনেচ্ছা গার্লস হাইস্কুল কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচণী পুলিং এজেন্ট হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছি। তাই বঙ্গবন্ধু তনয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে শরীয়তপুর জেলাবাসির পক্ষে আবেদন অনুগ্রহ করে আপনি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য শরীয়তপুর জেলা গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদান রেকর্ড করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেবেন। একই সাথে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী ভেদরগঞ্জের মহিষারে সদর দফতর না হওয়ায় সেখানে তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য অবহেলিত জেলাবাসির জন্য সে স্থানে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। এতে জেলার মানুষ জেলার জন্য বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা চিরদিন কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করবেন। অন্যদিকে এলাকার ছেলে মেয়েরা ডাক্তার হয়ে দেশের জন্য ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। এগিয়ে যাবে অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্যসেবা।

(লেখক : শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা উন্নয়ন সমিতির সভাপতি)