তাত্ত্বিক চিন্তায় সনাতন ধর্মঃ পর্ব-৪

সনাতনীদের ধর্মজ্ঞান

সর্বশেষ আপডেটঃ
প্রশান্ত কুমার রায়

একটি ছোট গল্প দিয়ে আজকের আলোচনা শুরু করতে চাই। দুই বন্ধুর পথিমধ্যে দেখা। তারা দু’জনই শ্রবণ প্রতিবন্ধী (কানে কালা)। প্রথম জন দ্বিতীয় জনকে জিজ্ঞেস করলো – কোথায় যাচ্ছ বন্ধু? সিনেমা দেখতে? দ্বিতীয় জনের উত্তরঃ আরে না, একটু সিনেমা দেখতে যাচ্ছি। প্রথম জনঃ ও, আমি মনে করেছিলাম সিনেমা দেখতে যাচ্ছ। ইদানীংকালে ফেসবুকের কল্যাণে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের কিছু বিদগ্ধ আলোচনা দেখতে পাই। যিনি আলোচনা করছেন তার শাস্ত্রজ্ঞান, আর যারা কমেন্ট করছেন তাদের মন্তব্য দেখে উপরের গল্পটি বড় প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। সনাতন ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন না করে ভুল আলোচনায় সমাজে বিভ্রান্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশী। তাই যা জানি না তা নিয়ে অকারণ তর্ক যুদ্ধ বন্ধ হোক এই প্রত্যাশা। আমি কারো নাম উল্লেখ করিনি এখানে। শুধু বিনয়ের সাথে নিবেদন করি সনাতন ধর্মের ওপর যথেষ্ট অধ্যয়ন না করে মন্তব্য করা উচিত না। সনাতন ধর্ম কোনো একক গ্রন্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত না। একটি বিশাল বৈদিক লাইব্রেরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে শাস্ত্র যেমন আছে, অপশাস্ত্র তার চেয়ে বেশী আছে। হাজার হাজার বছর ধরে অসংখ্য শাস্ত্র প্রণীত হয়েছে। বহু কবি, লেখক তাদের রচনা সমগ্রকে শাস্ত্রের মর্যাদায় উন্নীত করার চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলি সম্রাট আকবর তাঁর বিখ্যাত “দ্বীন-ই-এলাহী” ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য একখানি শাস্ত্র প্রণয়ন করে তার নাম দেন “আল্লাপোনিষদ”। তিনি ঐ গ্রন্থকে উপনিষদের মর্যাদায় উন্নীত করতে চেয়েছিলেন। বহু অশাস্ত্রীয় গ্রন্থকে এমনভাবে উপনিষদ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ঋক বেদের মূল শ্লোকে কলম ধরা হয়েছে স্বার্থ হাসিলের জন্য। সেখানে পুরুষ সূক্তের চরিত্র হনন করা হয়েছে। মন গড়া লাইন সংযোজন করে অশাস্ত্রীয় বাণী অনুপ্রবিষ্ট করানো হয়েছে। এই ধর্ম কমপক্ষে ছয় হাজার বছর অতিক্রম করে এখনো ১৫০ কোটি অনুসারী নিয়ে পৃথিবীর বুকে স্বমহিমায় টিকে আছে। অসংখ্য অত্যাচার, অনাচার সহ্য করে টিকে আছে এই ধর্ম। অনেক পথ পরিক্রমা পাড়ি দিয়েছে। অনেক সংস্কার, অনেক বিবর্তনের পর আধুনিক হয়েছে। সুতরাং এই ধর্ম বুঝতে হলে প্রচুর চর্চা ও অধ্যয়ন দরকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতন ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা হওয়া দরকার। নইলে ভুল ব্যাখ্যায় ভরে যাচ্ছে। আমরা তো এখনো পর্যন্ত আমাদের ধর্ম গ্রন্থের নামগুলোই ঠিকমতো জানি না। আমার একজন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বন্ধু আমাকে প্রায়শঃ বলে থাকে- একখানা নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থের নাম বলো যা পড়ে আমি সনাতন ধর্মকে সহজে বুঝতে পারি। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম কোনো একখানা বইয়ের নাম তুমি আমাকে বলো যা পড়ে আমি মাষ্টার্স ডিগ্রিটা পেয়ে যেতে পারি। সে বলেছে তা তো সম্ভব না। তোমাকে প্রচুর বই পড়ে ঐ ডিগ্রি নিতে হবে। এই গল্পটি এখানে আনলাম কারণ অন্যান্য ধর্মের ন্যায় আমাদের লোকেরাও একখানা গ্রন্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাদের মনের মধ্যে একক গ্রন্থের ধারণা খুব শক্তভাবে প্রোথিত হয়েছে। কিন্তু সনাতন ধর্ম একক গ্রন্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত ধর্ম নয়। বৈদিক লাইব্রেরি এর ভিত্তি।

সনাতন ধর্মের শাস্ত্র সমূহ নিয়ে আলোচনাঃ বৈদিক যুগ থেকে সত্য নির্ধারণের তিনটি পথ। এই পথগুলোকে বলে প্রস্থান। প্রথমটি অনুভূতিলব্ধ, দ্বিতীয়টি জীবন স্মৃতির মাধ্যমে ব্যক্ত এবং তৃতীয়টি যুক্তিবিচারে সিদ্ধ। অনুভূতি, জীবন স্মৃতি ও যুক্তি বিচার এই তিনটি তত্ত্ব জ্ঞান লাভের তিনটি উপায়। বৈদিক লাইব্রেরির সকল শাস্ত্রপুস্তককে এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। শ্রুতি প্রস্থান, স্মৃতি প্রস্থান ও ন্যায় প্রস্থান। শ্রুতি প্রস্থান হলো সনাতন ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি। বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্ত, উপবেদ, উপাঙ্গ, গীতা এইগুলোই শ্রুতি শাস্ত্র। এগুলোর একটু বর্ণনার দরকার। (১) শ্রুতি প্রস্থানঃ এটি হলো বেদ যার অর্থ জ্ঞান। পৃথিবীর আদিমতম ধর্মগ্রন্থ এই বেদ। বেদ চার খানা। ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব। প্রত্যেকটি বেদের দুইটি ভাগ আছে। প্রথম ভাগঃ জ্ঞান কান্ড। জ্ঞান কান্ডের দুই অংশ। আরণ্যক আর উপনিষদ। দ্বিতীয় ভাগঃ কর্ম কান্ড। এর দুই অংশ যথা-সংহিতা আর ব্রাহ্মণ। এরপর আসে বেদাঙ্গ। বেদাঙ্গ ছয়খানা। শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। এরমধ্যে শিক্ষা হলো phonetics অর্থাৎ উচ্চারণ তত্ত্ব। নিরুক্ত হলো অভিধান আর কল্প যাগযজ্ঞ বিষয়ক। উপবেদঃ উপবেদ চারখানি। আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গন্ধর্ববেদ ও অর্থশাস্ত্র। বেদ উপাঙ্গঃ পুরাণ, ন্যায়, মীমাংসা, ধর্মশাস্ত্র। পুরাণ দুই প্রকার। মহাপুরাণ ও উপপুরাণ। মীমাংসা দুই প্রকার। কর্ম মীমাংসা ও ব্রহ্ম মীমাংসা। বেদান্ত হলো উপনিষদ। তত্ত্ব জিজ্ঞাসার আকর গ্রন্থ এইগুলি। ঈশ, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন, কেন, কঠ, মুন্ডক, মান্ডিক্য, কৌষিতকী, মৈত্রী, শ্বেতাশ্বতর এগুলো হলো উপনিষদ। গীতাঃ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ হলো গীতা। এখানে কর্মকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মকে যোগে পরিণত করতে বলা হয়েছে। কর্ম থেকে অহমিকা আর ফলাকাঙ্ক্ষা বাদ দিলে সেই কর্ম মহৎ কর্মে পরিণত হয়, তা যোগে পরিণত হয়। ১৮ অধ্যায় আর ৭০০ শ্লোক নিয়ে এই গ্রন্থখানি রচিত। আত্মজ্ঞানের আকর গ্রন্থ এটি। (২) স্মৃতি প্রস্থানঃ শ্রুতিতে যা বলা হয়েছে এখানে তা উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে । রামায়ণ, মহাভারত স্মৃতি শাস্ত্র। তত্ত্ব কথা প্রচারের জন্য রসালো, কাল্পনিক, বাস্তবিক বহু ধরনের উদাহরণ লাগে। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ না করতে পারলে মানুষ তা শুনতে চায় না, পড়তেও চায় না। উপাখ্যানের ব্যবহার সেই জন্য। সেক্ষেত্রে পশু পাখি, জীব জন্তুর উপাখ্যানাদিও ব্যবহার করা হয়েছে। এই সব উপাখ্যানের শেষে মূল তত্ত্বটি থাকে যাকে ইংরেজীতে বলে “মোরাল অব দি স্টোরি”। এখন moral of the story বাদ দিয়ে চরিত্রের বাস্তবতা নিয়ে টানাটানি করলে কাজ হবে? বাস্তবে তাই হচ্ছে। আমি আর একটু বুঝিয়ে বলি কচ্ছপ আর খরগোসের একটি বিখ্যাত গল্প আমরা সকলেই জানি। এই গল্পের মেসেজ হলো slow and steady wins the race. অর্থাৎ ধীর ও স্থির ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত জয় লাভ করে। এখন যদি কেউ বলে এরকম কোনো প্রতিযোগিতা আদৌ কখনো হয়নি। সুতরাং এই উপদেশের কোনো দাম নেই। রামায়ণ ও মহাভারতের বহু কাহিনীকে এভাবে পর্যুদস্ত করা হয়। সনাতন ধর্ম প্রতিকী অর্থে অনেক বাণী প্রচার করে যা মানুষ আদৌ বুঝে উঠতে পারে না। আর এই নিয়ে অকারণ তর্ক যুদ্ধ চলে। সনাতন ধর্মের এই দ্বিতীয় স্তম্ভটি প্রথমটির সহায়তা প্রদান করার জন্য। (৩) ন্যায় প্রস্থানঃ যুক্তিবিচার করা সনাতন ধর্মের অন্যতম ভিত্তি। ষড় দর্শনের মাধ্যমে এই ধর্মের মৌলিক নীতিমালার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা হয়। বিনা প্রশ্নে বিশ্বাসের কোনো সুযোগ নেই এই ধর্মে। কয়েকটি উপনিষদে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে জিজ্ঞাসা উত্থাপিত হয়েছে। তার উত্তরও সেখানে দেওয়া হয়েছে। ঈশ্বরের স্বরূপ নির্ধারণ করা হয়েছে। ষড় দর্শনে জ্ঞান মার্গের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সনাতন ধর্ম বৈদিক যুগে কর্ম প্রধান, উপনিষদ যুগে জ্ঞান প্রধান আর পৌরাণিক যুগে ভক্তি প্রধান। সেই অনুসারে শাস্ত্রগুলিও যুগোপযোগী ও পরিবর্তিত হয়েছে। এইরূপ পরিবর্তনশীল বলেই এই ধর্ম সনাতন। তাই সনাতন ধর্মের অসংখ্য শাস্ত্র। এই সকল শাস্ত্রে পড়াশোনা না থাকলে ধর্মালোচনা তার জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। সনাতন ধর্ম বিষয়ে প্রচুর অধ্যয়ন ছাড়া এই ধর্ম বুঝা সম্ভব না। তাই আসুন আগে পড়ি, তারপর বলি।

লেখক: প্রশান্ত কুমার রায়, সদস্য, ট্যাক্সেস এপিলেট ট্রাইব্যুনাল, বেঞ্চ-৪, ঢাকা।