পর্ব-৩

সনাতন ধর্মের নাম বিভ্রাট

সর্বশেষ আপডেটঃ
প্রশান্ত কুমার রায়

বিশ্বের প্রাচীন ধর্ম সনাতন। এই ধর্মের নানা বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে জনপ্রিয় অনলাইন দৈনিক ঊষার আলোতে। আজ তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো।

সনাতন ধর্মের লোকদের ধর্মজ্ঞান যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তারা তাদের ধর্মের নামটিই ঠিকমতো বলতে পারে না। তার মানে  তাদের আত্ম পরিচয়ে গলদ রয়ে গেলো। ধর্ম একটি পরিচয়ের নাম। সেই পরিচিতিটুকু সবার আগে  সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার।  নামেই যদি বিভ্রান্তি থাকে তবে তো গোড়ায় গলদ থেকে যায়। তাহলে আমাদের প্রথমেই নাম বিষয়ক বিভ্রান্তি দূর করা দরকার।  এই ধর্মের প্রকৃত নাম কী : সনাতন না হিন্দু। বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি সনাতন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে রয়ে গেছে। কেউ বলছে সনাতন ধর্ম কেউ বলছে হিন্দু ধর্ম। কোনটি সঠিক সেই বিষয়ে এখানে  আলোচনা করা হলো। ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম তাতে কোনো সন্দেহ  নাই। তাহলে হিন্দু  কী বা কারা এবং এর উৎপত্তির উৎস কী? মূলতঃ এটি অন্যের দেওয়া নাম। কিভাবে সেই নামটি এলো তাই একটু আলোচনা করা যাক।

রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ থেকে একদল মানুষ উন্নত জীবনের সন্ধানে সিন্ধু নদীর তীরে এসে বসতি স্থাপন করে। তখন রাষ্ট্রের কোনো ধারণাই তৈরী হয়নি। জীবীকার সন্ধানে সবাই সর্বত্র যেতে পারতো। সিন্ধু নদীর তীরে কী উন্নত জীবনের সুযোগ ছিলো?  আমি আজ থেকে ছয় হাজার বছর আগেকার কথা বলছি। সেই সময়ে উন্নত জীবীকা মানে পর্যাপ্ত  পশুচারণ ক্ষেত্র থাকা ও উপযুক্ত কৃষি জমির পর্যাপ্ততা থাকা। এ দুটোই সিন্ধু নদীর অববাহিকায় বিরাজমান ছিলো। তখনকার মানুষ যাদের মধ্যে কিছুটা সভ্যতার উন্মেষ হয়েছিলো তারা কেউ কেউ পশুপালন করে জীবীকা অর্জন করতো এবং

আরেক দল কৃষি কাজ করতো। উরাল পর্বত মালার পাদদেশ থেকে যারা এখানে এলো তারা মূলতঃ পশুপালক ও কৃষিজীবী। তারা ছিলো আল্পীয় ও নর্ডিক আর্য জাতি। বলা হয় আর্যরা বহিরাগত, কিন্তু তখন কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো দেশ বা তার কোনো সীমানা নির্ধারিত ছিলো না। ফলে জীবন ও জীবীকার জন্য সবাই সর্বত্র অবাধে বিচরণ করতে পারতো এবং বসতি স্থাপন করতে পারতো। আর্যরা  আসার আগে এখানে অস্ট্রীক জাতি ও তারপরে দ্রাবিড় জাতির বসবাস ছিলো। আর্য জাতির আগমনের ফলে তারা কোনঠাসা  হয়ে পড়ে। ফলে আদিবাসী জনগণের সাথে আর্যদের সংঘর্ষ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে অনার্য দেবতা দেবাদিদেব মহাদেবকে আর্যগণ তাদেরও দেবতা হিসেবে মেনে নেয়। হর আর হরির মহামিলন হয়ে যায়। ফলে আর্যজাতি ভারতবর্ষে সমহিমায় টিকে যায়। আর্য

অনার্যের এই মহামিলন হলো পৃথিবীর প্রথম সংস্কার। সংস্কারের মনোভাব না  থাকলে কখনো  আধুনিকায়ন সম্ভব হয় না। নূতন চিন্তাধারাকে ধারণ করতে না পারলে যে কোনো সত্তা জড়ে পরিণত হয়। সনাতন ধর্মে প্রচুর পরিবর্তন ও বিবর্তন সেই জন্য সম্ভব হয়েছে। ফলে অনেক কুসংস্কার মুক্ত হয়েছে।

সে যাই হোক, আর্যরা সিন্ধু নদীর তীরে একটি উন্নত জীবন ব্যবস্থার সূচনা করলো। তাদের শিক্ষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনবোধ,  আচার, ব্যবহার, নৈতিকতা, ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি, পশুপালন,যাতায়াত ব্যবস্থা  সবকিছু মিলিয়ে একটি উন্নত সমাজের জন্ম হলো। আর্যদের ভাষা ছিলো সংস্কৃত।  তারাই বৈদিক সমাজের জনক। তাদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম। এই সনাতন ধর্মের নাম পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়েছে। ভারতবর্ষের বাইরের লোকেরা এই উন্নত জনপদের সাথে  ব্যবসার প্রয়োজনে আসা শুরু করলো। কোনো

কোনো জাতি ভারত আক্রমণের জন্যও উদ্যত হয়েছিলো।  তারাই সিন্ধু নদীর তীরে বসবাসকারী জনগণকে হিন্দু বলে অভিহিত করতো। বিশেষতঃ পারসিকদের বর্ণমালায় “স” না থাকায় তারা সিন্ধুকে হিন্দু বলতো। আস্তে আস্তে সিন্ধু নদীর তীরবর্তী জনগণ হিন্দু নামেই পরিচিতি পেতে থাকে।

এই আলোচনা থেকে এই দাঁড়ালো যে, হিন্দু একটি বিশেষ এলাকায় বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠীর জন্য অন্যের দেয়া নাম। এটি তার নিজস্ব নাম নয়। এই নামটি একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসরত মানুষের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ এই দাঁড়ালো যে হিন্দু একটি অঞ্চলবাসীর নাম, কোনো ধর্মের নাম নয়। ফলে হিন্দু শব্দকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাম হিসেবে চিহ্নিত করা ভুল। হিন্দু হলো তারা যারা সমগ্র ভারতবর্ষকে পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি বলে মনে করে। তিনি আস্তিক,  নাস্তিক, প্রতিমা পূজক, নিরাকারবাদী, সাকারবাদী,

তরুলতা, জীবজন্তু পূজারী যাই হন না কেন। হিন্দু কোনো সাধন সম্প্রদায়ের নাম নয়, এটি এটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপকতার অর্থে ব্যবহৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাজা রাম মোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ,  ক্ষিতি মোহন সেন প্রমুখ মনীষী হিন্দুকে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেছেন।

প্রফেসর দান্ডকারের মতে হিন্দু ধর্ম  

আংশিকভাবে ধর্মীয়, আংশিকভাবে সামাজিক,  আংশিকভাবে দার্শনিক আংশিকভাবে আনুষ্ঠানিক এবং আংশিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গিগত। হিন্দু শব্দটি বেদে নাই। রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, মনু সংহিতা  কোথাও নাই। এটি পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছে যার বিবরণ উপরে আলোচনা করা হলো। কিন্তু সুদীর্ঘকাল ব্যবহৃত সেই ডাক নামটি কখন যেন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে হিন্দু,

হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সভ্যতা সমার্থক হয়ে গেছে। এর জন্য সনাতন ধর্মকে এক জটিল বিবর্তন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়েছে। বেদ পূর্ববর্তীকালের  সভ্যতা ছিলো সিন্ধু সভ্যতা, বেদের কালে প্রচারিত হয় আর্য ধর্ম বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, বেদের পরবর্তীকালে আসে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম। এই সবগুলের সমন্বিত ও সংশ্লেষিত রূপ হলো হিন্দু ধর্ম। হিন্দু হলো বহু ধর্ম ও মতবাদের সংঘ বা সমবায়। যেমনঃ শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, জৈন,বৌদ্ধ, শিখ, মতুয়া, সৎসংগ, ব্রাহ্ম, সাকারবাদী,  নিরাকারবাদী ইত্যাদি।

লেখক: প্রশান্ত কুমার রায়, সদস্য, ট্যাক্সেস এপিলেট ট্রাইব্যুনাল, বেঞ্চ-৪, ঢাকা।