পর্ব-২

সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি

সর্বশেষ আপডেটঃ
প্রশান্ত কুমার রায়

বিশ্বের প্রাচীন ধর্ম সনাতন। এই ধর্মের নানা বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশ হবে জনপ্রিয় অনলাইন দৈনিক ঊষার আলোতে। আজ দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো।

সনাতন ধর্মের তৃতীয় ভিত্তি হলো উপবাস। মুনি ঋষিগণ সুদীর্ঘকাল পর্যবেক্ষণ করে এবং তিথি নক্ষত্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে একাদশী, পূর্ণিমা, অমাবস্যা এই জাতীয় কিছুদিনে খাদ্যগ্রহণের ব্যাপারে কিছু নিয়ম কানুন ও ব্রত পালন করা দরকার। এই ব্রতকে উপবাস বলা হয়। উপবাস এক ধরনের যজ্ঞ। গীতায় যজ্ঞকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দ্রব্য যজ্ঞ, তপোযজ্ঞ, যোগযজ্ঞ, স্বাধ্যায় যজ্ঞ ও বেদজ্ঞান যজ্ঞ । উপবাস হলো তপোযজ্ঞ। উপবাসকে মূলতঃ তিনটি কারণে পরিপালন করতে বলা হয়েছে। কারণগুলো হলো : ১. পরিপাক তন্ত্রের বিশ্রাম। উপবাসের জন্য নির্ধারিত দিনগুলোতে পরিপাক যন্ত্রকে বিশ্রাম দিতে হবে। এটি শারীরিক প্রয়োজন। ২. অনাহার বা স্বল্পাহারের মাধ্যমে আহার্য সামগ্রীর স্বল্প ব্যবহার এবং তা পঞ্চ মহাযজ্ঞে নিবেদন। এটি জগতের কল্যাণে প্রয়োজন। ৩. অনাহারীর বেদনা উপলব্ধি। আহার ঈশ্বরের দান তা অনুভব করা এবং তার জন্য ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। আত্মোপলব্ধির জন্য এটা প্রয়োজন।

সনাতন ধর্মের চতুর্থ ভিত্তি হলো তীর্থ। বৈদিক যুগে এই চতুর্থ ভিত্তি ছিলো যজ্ঞ। পরবর্তী কালে এটি পরিবর্তন করে যজ্ঞ স্থলে তীর্থপালনকে চতুর্থ ভিত্তি করা হয়। এখানে একটি সংগত প্রশ্ন দেখা দেয়, তা হলো যে ধর্মের এই বিধি বিধান পরিবর্তন করা যায় কি না। এখানে স্মরণযোগ্য যে সনাতন ধর্মে সংস্কারের বিধান আছে। আর আছে বলেই তার অভিযোজন ক্ষমতা আছে। এই ধর্ম কাল জয়ী, যুগোপযোগী। সময়ের পরিবর্তনে অবস্থার প্রেক্ষিতে জনজীবনের স্বার্থে তাকে পরিবর্তন করা যায়। সেই পরিবর্তন কে করতে পারে? পরিবর্তন, যুগোপযোগিতা, দুষ্টের দমন ও সুধী জনের রক্ষায় ঈশ্বরের প্রতিনিধি মানব রূপে অবতার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। এই অবতার তত্ত্ব সনাতন ধর্মের আরেকটা বিশেষ দিক, যা পৃথিবীর অন্য সব ধর্ম তত্ত্ব থেকে তাকে স্বতন্ত্র করেছে। ধর্মের আধুনিকায়নে এই তত্ত্বের কোনো বিকল্প নেই। আজ থেকে আরো দশ হাজার বছর পরের কথা ভাবুন। তখন মানুষের আচার, ব্যবহার, রুচি, প্রয়োজন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনবোধ, রীতিনীতি কোনোটাই আজকের অবস্থানে থাকবে না। কিন্তু ধর্মকে যদি তখনো টিকে থাকতে হয় তবে তার ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন হবে। সনাতন ধর্মের সেই অভিযোজন ক্ষমতা আছে। গীতার সেই বিখ্যাত শ্লোকটি এখানে স্মর্তব্য। “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভতি ভারত। অভুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানাং সৃজাম্যহম, পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্, ধর্ম সংস্থাপার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে”।।এই শ্লোকটি হলো সনাতন ধর্মের আধুনিকায়নে মুক্তির মহামন্ত্র। তীর্থের মূল উদ্দেশ্য হলো সনাধন ধর্মের মুনি ঋষি, দেব দেবীর পবিত্র ভূমিতে গিয়ে তার মাহাত্ম্য অনুধাবন করা এবং তা জীবনে চর্চা করা।

সনাতন ধর্মের পঞ্চম ভিত্তি হলো দান। এই দানকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সনাতন ধর্মে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে দেখা যায় সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি তার তিন ধরনের পু্ত্রদের উপদেশ দিচ্ছেন একটি মাত্র অক্ষর বলে। তিনি বলছেন “দ”। এই “দ” এর মানে দম্মত, দয়ধ্বম ও দত্ত। দত্ত বা দান হলো মানুষের জন্য ভগবানের নির্দেশ। মহাভারতের একটি বিখ্যাত চরিত্র দাতা কর্ণ। তিনি দানের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। রাজা হরিশ্চন্দ্র রাজত্ব দান করে দিয়েছিলেন। কঠ উপনিষদে গাভী দান ও পুত্রদানের কাহিনী আছে। প্রাচীন কাল থেকেই যজ্ঞ শেষে দানের বিধান আছে। তবে এই দান আবার নিঃস্বার্থভাবে হতে হবে। কোনো কিছু প্রতিদানের আশায় দান করলে সে দানের মর্যাদা হানি হয়। এইরূপ নিঃস্বার্থ দান হলো সাত্ত্বিক দান। অবজ্ঞা সহকারে দান করলে সে দান হয় তামসিক দান। আর প্রতিদানের প্রত্যাশায় দান হলো রাজসিক দান। শাস্ত্রে সাত্ত্বিক দান করতে বলা হয়েছে। (চলবে)

লেখক: প্রশান্ত কুমার রায়, সদস্য, ট্যাক্সেস এপিলেট ট্রাইব্যুনাল, বেঞ্চ-৪, ঢাকা।