তাত্ত্বিক চিন্তায় সনাতন ধর্ম (পর্ব-৬)

সামাজিক স্তরবিন্যাসঃ শ্রেণী বনাম বর্ণ

সর্বশেষ আপডেটঃ
প্রশান্ত কুমার রায়

সামাজিক স্তরবিন্যাস ( Social stratification) নিয়ে এর আগে মোটামোটি একটা আলোচনা রেখেছি। এবার বর্ণপ্রথার উপর আলোচনা করতে চাই। এই আলোচনা থেকে বর্ণের সাথে শ্রেণীর মৌলিক পার্থক্য বুঝা যাবে। আমি ভারতবর্ষের আলোচনায় আসছি। এখানে শ্রেণী বিভাজন আছে এবং তীব্র বর্ণপ্রথা আছে। আবার এলিট, নন-এলিট এর দ্বন্দ্বও আছে। তবে সেই দ্বন্দ্বের চেয়ে জাতপাতের গুরুত্ব বেশি। এই জাতপাত ও বর্ণভেদ হুবহু এক নয়। সে আলোচনায় পরে আসছি। কী বিচিত্র গোলমেলে ব্যাপার এসব। এলিট ক্লাসের সদস্য হলেই বর্ণভেদের খাড়া থেকে এখানে মুক্তি পাওয়া যায় না। রাজা বা জমিদার অভিজাততন্ত্রের শীর্ষে অবস্থান। তথাপি তিনি যদি বর্ণাশ্রমের চতুর্থ বর্ণ অর্থাৎ শূদ্র জাতীয় হন তাহলে তার অবমূল্যায়ন নিশ্চিত। বর্ণাশ্রমের তৃতীয় অবস্থানে থাকলে কিছুটা বেশী মূল্যায়ন হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ মর্যাদাপ্রাপ্ত হন না। বর্ণাশ্রমের প্রথম বর্ণ হলো ব্রাহ্মণ, দ্বিতীয়টি ক্ষত্রিয়। এই দুই বর্ণের মধ্যে মর্যাদা ও স্বার্থের লড়াই সুদীর্ঘ কালের। শৌর্যে বীর্যে ধন সম্পদে ক্ষত্রিয়রা সবার উপরে থাকলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য থেকে তারাও মুক্তি পায়নি। জনসংখ্যায় ব্রাহ্মণরা অপ্রতুল হওয়া সত্বেও তারাই সমাজের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলো। তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং কুটকৌশলের কাছে সমাজের সকলেই পরাভূত হয়েছে। সৃষ্টি হয় ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা। আজও তা চলমান।

ভারতবর্ষের প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাই আমরা বেদ থেকে। ঐতিহাসিকদের মতে বৈদিক সমাজের জন্ম আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ৪০০০ বছর। ঋগ্বেদের সময়ে ভারতে শ্রেণীর উদ্ভব হয়। তবে সেই শ্রেণী আর বর্ণ কিন্তু এক নয়। বর্ণ বৈদিক সমাজে পরবর্তীকালের সংযোজন। বৈদিক যুগে শ্রেণীগুলির মধ্যে মেলামেশা ও বিবাহের সম্পর্ক প্রচলিত ছিলো। ঋগ্বেদে মঘবন্ , মহাকুল প্রভৃতি শব্দের উল্লেখ আছে যার অর্থ ধনবান, উচ্চশ্রেণী অর্থাৎ ইউরোপীয় সমাজে যাদের অভিজাত বা এরিস্টোক্রাট বলা হয়েছে। এই ধনবান উচ্চশ্রেণী থেকে ধীরেধীরে পুরোহিত শ্রেণী বা ব্রাহ্মণের উৎপত্তি। শৌর্য বীর্য ও ধন সম্পদের মালিকেরা হলো ক্ষত্রিয়। এরপর শুরু হয় ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেণীগত প্রাধান্যের সংঘর্ষ। বেধে যায় যুদ্ধ এবং তা চলে দীর্ঘ দিন। পুরাণে ভার্গব(ব্রাহ্মণ) ও হৈহয় (ক্ষত্রিয়) পরিবারের এই যুদ্ধ বর্ণিত আছে। ব্রাহ্মণদের নেতা পরশুরাম পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয়দের সম্পূর্ণ বিনাশ করতে ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তারপর থেকে ব্রাহ্মণদের উত্থান শুরু হয়। শাসক ক্ষত্রিয় ও পুরোহিত ব্রাহ্মণেরা প্রথমটায় পরস্পরের মধ্যে কলহ করলেও পরে উভয়ের স্বার্থের সমন্বয় হয়। ক্ষত্রিয়দের শ্রেষ্ঠত্বের দাবী আমরা বৌদ্ধ যুগেও দেখেছি। গৌতম বুদ্ধ নিজেও কয়েকবার বলেছিলেন যে, ক্ষত্রিয়ই শ্রেষ্ঠ বর্ণ। নিজে রাজার ছেলে ছিলেন বলে বোধ হয়। ব্রাহ্মণ্য বিরোধী বৌদ্ধ ধর্ম ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে প্রসার লাভ করতে থাকে। তারা ব্রাহ্মণের অনুশাসন মানতো না। তাই তাদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অনার্য বলে প্রচার করতো। বৌদ্ধধর্ম প্রথমে মগধদেশে ব্যাপক প্রচারলাভ করে সম্রাট অশোকের হাত ধরে। তার প্রপিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শূদ্র জাতীয় ছিলেন যিনি অত্যাচারী নাপিত সম্রাট নন্দ বংশের বিনাশের পর মগধের সম্রাট হয়েছিলেন। এই মৌর্য বংশের রাজগুরু ছিলেন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত বিষ্ণু গুপ্ত চাণক্য। তিনি ব্রাহ্মণ, কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলেন না। মৌর্যবংশের শাসন আমল ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শাসন আমল।

আনুমানিক খ্রিষ্ট পূর্ব ১৫০০ সনে সনাতন ধর্মের গীতায় চতুর্বর্ণের তত্ত্ব প্রচার করা হয়। সেখানে চারটি বর্ণের উল্লেখ করা হয় মানুষের গুণ ও কর্মের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু শাসক শ্রেণী তার সফল অপব্যবহার করে তীব্র বর্ণবাদী সমাজ ব্যবস্থা তৈরী করলো। ধর্মের অজুহাতে সমাজ বিভাজিত হলো। ঋগ্বেদে পুরুষ সূক্ত অনুপ্রবিষ্ট করে বর্ণাশ্রমের কাল্পনিক কাঠামো তৈরী করা হলো। ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণের, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়দের, পেট থেকে বৈশ্যের আর পা থেকে শূদ্রের। এই আজগুবি তত্ত্ব প্রচারে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকায় ছিলো “মনুসংহিতা”। সনাতন ধর্মের বিষ বাষ্প। এই মনুই সনাতন ধর্মের কবর রচনা করেছিলো। শূদ্রজাতির জাগতিক সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো। তাদের শিক্ষার অধিকার, সম্পদের অধিকার, ধর্মের অধিকার, নৈতিক অধিকার, জীবীকার অধিকার সব কেড়ে নেয়া হয়েছিলো এই মনু সংহিতার মাধ্যমে ।

তীব্র বর্ণ বিভাজনের পরে আসে জাতপাত প্রথা, কৌলিন্য প্রথা। ভারতবর্ষের শেষ হিন্দু রাজবংশ হলো সেন বংশ। বৌদ্ধ সম্রাট পাল বংশের পরে সেন বংশ ক্ষমতায় আসে। তারাই মূলতঃ পেশা ভিত্তিক জাতপাত প্রথার প্রচলন করে। বর্ণপ্রথার আরেক ধাপ উপরে এই জাতপাত প্রথা। অসংখ্য উপ ভাগে তা বিভাজিত হয়। পেশার কারণে মানুষের জাতপাত নির্ধারণ করা হলো। কুম্ভকার, স্বর্ণকার, জেলে, মুচি, নাপিত, ধোপা, বামুন, কর্মকার ইত্যাদি পেশার বিভাজনে জাতির নামকরণ করা হলো। সেই অনুসারে উচু নীচু স্তর নির্ধারণ করাও হলো। ধানচাষী কৃষকশ্রেণীকে গীতায় বৈশ্যের মর্যাদা দেয়া হলেও বল্লাল সেনের জাতপাত ব্যবস্থায় শূদ্র করা হয়েছে। একজন কৃষক পান চাষ করে আর একজন কৃষক ধান চাষ করে। এদের মধ্যে পানচাষী বৈশ্য আর ধানচাষী শূদ্র। যৌক্তিকতার মানদন্ড বুঝে দেখুন এখানে। সনাতন ধর্মের অবক্ষয়ের মূলে এই নিকৃষ্ট জাতপাত ব্যবস্থা। এর বিনাশের উপায় নিয়ে পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে।

লেখক: প্রশান্ত কুমার রায়, সদস্য, ট্যাক্সেস এপিলেট ট্রাইব্যুনাল, বেঞ্চ-৪, ঢাকা।