উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, শরতের মৃদু হাওয়ায় ভোর থেকেই কৃষি সরঞ্জাম হাতে ধানখেতে নেমে পড়ছেন কৃষকরা। কেউ ধানের চারা পরিচর্যা করছেন, কেউ সার ও কীটনাশক প্রয়োগে ব্যস্ত। বিকেল গড়ালে ঘরের টানে ফিরছেন বাড়িতে। ধানখেতে পুরুষের পাশাপাশি নারী কৃষকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।
কৃষকদের ভাষায়, ‘এবার ধান ভালো হয়েছে। যেদিকে তাকাবা, দেখবা ধান আর ধান। ঝড়-বৃষ্টি না হলেই ধানে পুষিয়ে যাবে।’
উপজেলার সুতারখালী গ্রামের কৃষক প্রদীপ মিস্ত্রী বলেন, ১২ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। তবে খেতের ধানের অবস্থা দেখে তিনি আশাবাদী। প্রতি বিঘায় ১৭ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
একই রকম আশার কথা শোনালেন পারচালনা গ্রামের কৃষক মফিজুর সানা। বর্গা নিয়ে দুই বিঘা জমিতে বিআর-২৩ জাতের ধান চাষ করেছেন তিনি। মফিজুর সানা বলেন, ধানের গোছা ভালো হয়েছে, ফলনও বেশ ভালো মনে হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার মাঠজুড়ে ভালো ধান পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দাকোপে প্রায় ১৯ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বিআর-২৩, বিআর-১০, বিআর-১১, ব্রি-৩০, ব্রি-৪৯, ব্রি-৫১, ব্রি-৫২, ব্রি-৭২, ব্রি-৭৩, ব্রি-৭৬ ও ব্রি-৭৭সহ স্থানীয় কিছু উচ্চমূল্যের জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। গত বছর উপজেলায় ১৯ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছিল। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির ফসল।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্য বছরের তুলনায় এবার আমনের অবস্থা বেশ ভালো। মৌসুমের ভরা সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় ধানখেতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সেচ দেওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হলে সেই সংকট অনেকটাই কেটে যায়। বর্তমানে মাঠে মাঠে ধানের ভালো অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট কৃষকরা। খেতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে তা সমাধান করছেন তাঁরা।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলী মজুমদার বলেন, আমননির্ভর দাকোপ এখন নানা ফসলের সমাহারে শস্যভান্ডারে পরিণত হয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে গতবারের তুলনায় এবার আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় কৃষকদের নতুন নতুন জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আবহাওয়াজনিত কারণে ধানখেতে পোকার উপদ্রব দেখা দিলে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়েই পোকা শনাক্ত ও দমনে আলোক ফাঁদ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, এ মৌসুমে কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে সার পান, সে জন্য সার বিক্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধে ডিলারদের তিন ধাপে বিঘাপ্রতি ছয় কেজি করে সার সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কৃষকদের কৃষিযন্ত্র কেনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের ধান চাষ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শে দাকোপের মাঠে এবার আমনের ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন কৃষকদের প্রত্যাশা, শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাধা না এলে গোলাভরা ধান নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন তাঁরা।
ঊআ- মোচৌ
