গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। ব্যস্ত সময়ে সাড়ে চার মিনিট পরপর চলবে ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে একসঙ্গে ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহণের সুযোগ থাকবে। ঢাকার বিভিন্ন অংশকে এমন যোগাযোগের আওতায় আনতে যাচ্ছে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন।
১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল প্রকল্প আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য রাখা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তবে একনেকের কার্যতালিকায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির প্রায় সব প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে যাওয়ায় একনেকে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইং প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সূত্রের ভাষ্য, এমআরটি-৫-এর আগে অন্য একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশের অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় থাকা দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। পাশাপাশি এমআরটি-৫-এর পরামর্শক নিয়োগে যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এসব কারণে প্রকল্পটির অনুমোদন নিয়ে শেষ মুহূর্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পাতালেই ১৩ কিলোমিটার
ডিপিপি অনুযায়ী, গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে মেট্রোরেলটি।
পুরো রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথ। থাকবে মোট ১৫টি স্টেশন। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।
শুরুতে ছয়টি কোচের ১৯টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিএমটিসিএলের হিসাবে, মেট্রোরেলটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে পাতালপথের পরিমাণ বেশি হওয়ায় প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয়ও বড়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহামদ বলেন, ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেলের কোনো বিকল্প নেই। পর্যায়ক্রমে সব মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে হাঁটতে হবে। তবে এর সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন সব রুট চালু হবে।
কমেছে ব্যয়, বাদ যায়নি দায়
প্রকল্পটির ব্যয় শুরুতে আরও বেশি ছিল। পতিত সরকারের সময়ে নেওয়া পরিকল্পনায় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি পুনরায় পর্যালোচনা করে বিভিন্ন খাতের ব্যয় কমানো হয়। সর্বশেষ প্রস্তাবে তা নেমে এসেছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।
অর্থাৎ আগের হিসাবের তুলনায় ব্যয় কমেছে ৯ হাজার ১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
তবে ব্যয় কমার পুরোটা প্রকৃত সাশ্রয় নয়। বিদেশি ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জের মতো কিছু দায় প্রকল্প ব্যয় থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর পরিশোধযোগ্য সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জ বাবদ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা প্রকল্পের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় অর্থ বিভাগ এ অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় কম দেখালেও সরকারের ওপর থেকে ওই দায় যাচ্ছে না।
গত ১৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায়ও ব্যয় কমানো হয়। ওই সভায় ৪৭ হাজার ৬৩৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রস্তাব থেকে ২ হাজার ১৩১ কোটি ৪ লাখ টাকা বাদ দেওয়া হয়। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জ ছাড়াও জমি অধিগ্রহণ, যানবাহন, পরামর্শক, সম্মানি ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করা হয়েছে। জমির প্রয়োজনও কমানো হয়েছে। শুরুতে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমি প্রয়োজন ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে প্রয়োজন হবে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর। এতে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমবে।
তবে পুনর্বাসনে বরাদ্দ থাকছে বড় অঙ্কের অর্থ। এ খাতে রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা।
ঋণের বড় অংশ বিদেশি অর্থায়নে
এমআরটি-৫ বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বৈদেশিক ঋণ হিসাবে নেওয়া হবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এই ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ)। এডিবি সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির সঙ্গে মিল রেখে ধাপে ধাপে ঋণ ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। এরই মধ্যে এডিবির কারিগরি সহায়তায় প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক ও বিস্তারিত নকশা, দরপত্রে সহায়তা এবং জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়েছে।
এখন একনেকের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে প্রকল্পটি। অনুমোদন হলে অর্থায়ন চুক্তি, জমি অধিগ্রহণ ও ঠিকাদার নিয়োগসহ পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা যাবে। আর তখনই আগের সরকারের সময়ে পরিকল্পিত এই মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তবায়নপর্ব শুরু হবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে।
ঊষার আলো-এসএ
