কখনও কখনও একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতে উঠে যায় একটি দেশের পতাকা। একটি ঘুষি শুধু ভেঙে দেয় দীর্ঘ অপেক্ষার দেওয়াল। বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তেমনই এক মুষ্টিবদ্ধ হাতের নাম মোশাররফ হোসেন।
১৯৮৬। সিউল। দশম এশিয়ান গেমস। বাংলাদেশের পদকের খাতা তখনও সাদা। অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে, এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে যাওয়ার স্মৃতিও আছে, পদক নিয়ে ফেরার গল্প নেই। সেই অচেনা গল্পের প্রথম পাতা লিখেছিলেন রাজশাহীর এক বক্সার। লাইট হেভিওয়েট বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতে মোশাররফ হয়ে গিয়েছিলেন এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদকজয়ী। ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়াডে তাঁর ব্রোঞ্জই ছিল বাংলাদেশের প্রথম পদক। আজও এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তিগত পদক হিসেবে যার আলাদা মর্যাদা।
সিউলের গল্প তো সিউলে শুরু হয়নি। শৈশবে অ্যাথলেট ছিলেন মোশাররফ। দৌড়েছেন, লাফিয়েছেন, শটপুট ছুড়েছেন। তারপর এক দিন পর্দায় দেখলেন মুহাম্মদ আলী আর জর্জ ফোরম্যানের সেই বিখ্যাত লড়াই। ঘুষির শব্দের ভিতর নিজের ভবিষ্যতের ডাক শুনেছিলেন। অ্যাথলেটিকস থেকে ধীরে ধীরে চলে এলেন বক্সিং রিংয়ে। ১৯৭৬ সালে যোগ দিলেন বাংলাদেশ আর্মি সার্ভিসেস টিমে। তারপর রিং হয়ে উঠল তাঁর ঘর, গ্লাভস হয়ে উঠল তাঁর পরিচয়।
দেশের রিংয়ে তখন তাঁর রাজত্ব। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯। টানা জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার মঞ্চেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৮৫ সালের সাফ গেমসে জিতেছিলেন স্বর্ণ। পরের দুটি সাফে, ১৯৮৭ ও ১৯৮৯তে গলায় উঠেছিল ব্রোঞ্জ। আর সিউল তাঁকে দিয়েছিল এমন এক ব্রোঞ্জ, যার আলো আজও বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নিভে যায়নি। জাতীয় পর্যায়ে ১৯৮১-১৯৯০ পর্যন্ত টানা ১০ বছর স্বর্ন জিতেছেন এই বক্সার।
সিউলকে কী করে ভুলবেন মোশাররফ?নেপালের প্রতিপক্ষকে মাত্র ৩৮ সেকেন্ডে নকআউট করে পদক নিশ্চিত করেছিলেন।মোশাররফের স্মৃতিতে আজও সেই মুহূর্ত ঝলমল করে। বিদেশি কয়েকজন খেলোয়াড় তখন তাঁকে বলেছিলেন, দেশের প্রথম পদক এনে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই দেশ তাঁকে অনেক কিছু দেবে। মোশাররফও বিশ্বাস করেছিলেন। বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন হ্যাঁ, অনেক কিছু পাব।
কী পেয়েছিলেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তরটিই বোধ হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ নীরবতা। রিং থেকে সরে যাওয়ার পরও বক্সিংকে ছাড়েননি মোশাররফ। রেফারি হয়েছেন, তরুণদের হাতে গ্লাভস তুলে দিয়েছেন, রাজশাহীর সিটি বক্সিং ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে জাতীয় হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন জাহাঙ্গীর আলমের নামও আছে। ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। যে শরীর এক দিন রিংয়ে প্রতিপক্ষকে নকআউট করত, সেই শরীরই একসময় পক্ষাঘাতের আঘাতে থমকে গেল। হাঁটার শক্তি হারালেন। এক চ্যাম্পিয়ন তখন নিজের ঘরেই বন্দি। রাজশাহীর সেই বাড়িতে শুয়ে তাঁর কণ্ঠে জমেছিল অভিমান।দেশকে প্রথম এশিয়ান পদক এনে দেওয়া মানুষটির খবর নেওয়ার মতো কেউ কি নেই?
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে তালাইমারীর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র। দিয়েছিলেন নগদ এক লাখ টাকা সহায়তা। বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাসিক ভাতা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন।
তার কয়েক মাস পর রাষ্ট্রের দরজাও খুলেছিল। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অসুস্থতা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা বিবেচনা করে সরকার তাঁকে দিয়েছিল ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। আজ সেই সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকাতেই কোনোরকমে সংসারের চাকা ঘোরে। পদকের আলোয় যে মানুষটি এক দিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন, তাঁর পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন সেই সঞ্চয়পত্রের সামান্য সুদ।
তালাইমারীর বাবর আলী রোডে এখন তাঁর ঠিকানা। বাড়িটা খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক একটি পৃষ্ঠা।
সংসারে এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলে মাহবুব হোসেন প্রতিবন্ধী। দুই মেয়ের সংসারও তাঁর জীবনের আলাদা দুই অধ্যায়। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এখন বাবার বাড়ি, মোশাররফের বাড়িতেই থাকেন তিনি। ছোট মেয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ‘ল’ পাস করেছেন। তাকেও বিয়ে দিয়েছেন মোশাররফ।
এক সময় তিনি দেশকে দিয়েছেন। আজ নিজের পরিবারটুকু নিয়ে বেঁচে থাকাই তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই। তবু আশ্চর্য, এত অভিমান, এত অভাব, এত দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তাঁর চোখে বক্সিংয়ের স্বপ্নটি মরেনি।
মোশাররফ স্বপ্ন দেখেন কোনও এক এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের কোনও বক্সার রিংয়ে নামবেন। তাঁর সিউলের ব্রোঞ্জকে রূপ দেবেন স্বর্ণে। যে পদক তিনি একদিন মুষ্টিবদ্ধ হাতে এনে দিয়েছিলেন, কোনও এক উত্তরসূরি সেটিকে আরও উজ্জ্বল করে ফিরিয়ে দেবেন দেশে। হয়তো সেই দিন রিংয়ের পাশে বসে থাকবেন মোশাররফ। বয়স তাঁর গ্লাভসের ওজন কমিয়ে দিয়েছে, শরীর কেড়ে নিয়েছে আগের শক্তি। কিন্তু চোখ দুটো তখনও হয়তো তরুণ বক্সারের ঘুষির সঙ্গে সঙ্গে উঠবে নামবে।
কিছু মানুষ রিং থেকে অবসর নেন।বক্সিং তাঁদের থেকে কখনও অবসর নেয় না।
সিউল তাঁকে আরও একটি অদ্ভুত স্মৃতি দিয়েছে। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদক জেতার সেই শহরের নামেই ছেলের নাম রেখেছিলেন’সিউল’। যে শহর তাঁকে দিয়েছিল জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরব, সেই শহরের নামই তিনি ঘরে এনে রেখেছিলেন।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদকের সংখ্যা অনেক। এসেছে ক্রিকেটের স্বর্ণ, কাবাডির পদক, দলীয় সাফল্যের নানা গল্প। সিউলের সেই ব্রোঞ্জের জায়গাটি আলাদা। কারণ প্রথমের কোনও দ্বিতীয় হয় না। বাংলাদেশের এশিয়ান পদকের ইতিহাসের প্রথম দরজা খুলেছিল যে মুষ্টিবদ্ধ হাতে, সেই হাতের নাম মোশাররফ হোসেন।
আর তাই তাঁর গল্প শুধু একজন বক্সারের গল্প নয়।
এক পাশে সিউল।আলো, পতাকা, ব্রোঞ্জের ঝিলিক।অন্য পাশে তালাইমারীর বাবর আলী রোড।একটি সংসার, প্রতিবন্ধী ছেলে, বিধবা মেয়ে, নাতনি, দুই মেয়ের বিয়ের স্মৃতি আর সঞ্চয়পত্রের সুদে টিকে থাকা দিন।
মাঝখানে শুধু একজন মানুষ।
মোশাররফ হোসেন। যে হাত এক দিন দেশের জন্য মুষ্টিবদ্ধ হয়েছিল, আজ সেই হাত হয়তো আগের মতো ওঠে না। কিন্তু তাঁর চোখে এখনও একটি ঘুষি বেঁচে আছে একটি স্বর্ণপদকের ঘুষি। তিনি শুধু চান, কোনও এক বাংলাদেশের বক্সার সেই ঘুষিটি মারুক।
সিউলের ব্রোঞ্জটি বদলে যাক স্বর্ণে।তখন হয়তো দূরে কোথাও বসে মোশাররফ হোসেন মৃদু হেসে বলবেন,’এই তো, আমার স্বপ্নটা শেষ পর্যন্ত কেউ পূরণ করল।’
ঊষার আলো-এসএ
