সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং ডিভাইসের মাধ্যমে একটি নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক নেশাজাতীয় উপাদানের বিস্তারের তথ্য সামনে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব ভেপিং লিকুইডে MDMB-4en-PINACA নামের শক্তিশালী একটি সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে, যা সাধারণ গাঁজা বা প্রাকৃতিক ক্যানাবিসজাত দ্রব্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জব্দকৃত নমুনা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যে জানা গেছে, MDMB-4en-PINACA একটি Synthetic Cannabinoid Receptor Agonist (SCRA), যা মানব মস্তিষ্কের CB₁ রিসেপ্টরের ওপর অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউরোপীয় মনিটরিং সংস্থা EMCDDA-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এই শ্রেণির রাসায়নিক পদার্থ অল্প মাত্রাতেই তীব্র ও অনির্দেশ্য সাইকোঅ্যাকটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। প্রাকৃতিক THC-এর তুলনায় এগুলো অনেক বেশি বিষাক্ত ও প্রাণঘাতী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেপিং ডিভাইসকে এই মাদকের বাহন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কৌশলগতভাবে। ভেপিং লিকুইড সাধারণত স্বচ্ছ বা সুগন্ধিযুক্ত হওয়ায় এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো সহজ এবং ব্যবহারকারীর পক্ষে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি ই-সিগারেটকে এখনও অনেকেই ধূমপানের তুলনায় কম ক্ষতিকর বলে মনে করেন। এই ভুল ধারণাকে কাজে লাগিয়েই অপরাধচক্র বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীসমাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া কিছু ভেপিং কার্ট্রিজ ও লিকুইডের উৎস বিদেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। যদিও পুরো সরবরাহ চেইন এখনও উন্মোচিত হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক মাদক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের উৎপাদন ও পাচার নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সংগঠিত ও গতিশীল। আইন এড়াতে এসব পদার্থের রাসায়নিক গঠন নিয়মিত পরিবর্তন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, MDMB-4en-PINACA ব্যবহারের ফলে তীব্র উদ্বেগ, বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন, আচরণগত অস্বাভাবিকতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, খিঁচুনি এমনকি আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো—অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা ও সাইকোসিসের লক্ষণ দেখা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, ভেপিংয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করলে এই পদার্থ দ্রুত ফুসফুস হয়ে রক্তে মিশে যায়, ফলে এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও তীব্র হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে একটি ‘নীরব মাদক মহামারি’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভেপিং ডিভাইস সহজলভ্য, তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সামাজিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে কম সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এর ফলে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই নেশার বিস্তার ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য, অপরাধপ্রবণতা ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও দেশে ই-সিগারেট আমদানি ও বিপণনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান রয়েছে, বাস্তবে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের মতো নতুন রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করা আইন ও ফরেনসিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই সংকট মোকাবিলায় কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক ল্যাব সক্ষমতা, নিয়মিত রাসায়নিক নজরদারি এবং ব্যাপক জনসচেতনতা।
বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে সচেতনতা কর্মসূচি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাস্টমস ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত উদ্যোগে ভেপিং লিকুইড পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং চিকিৎসকদের জন্য সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড বিষক্রিয়া শনাক্ত ও চিকিৎসার নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ভেপিংয়ের আড়ালে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের বিস্তার নিছক একটি মাদক সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সাম্প্রতিক দেশীয় উদ্ধার তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—সময় থাকতেই নীতি, আইন ও সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
লেখক : কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশকর্মী।
ঊআ-মোহন চৌধুরী
