একাত্তরে খুলনার রণাঙ্গণে গর্বিত তিন সেনানী

সর্বশেষ আপডেটঃ
118
0
গ্রাফিক্স সংগৃহিত

এম এন আলী শিপলু : নয় নম্বর সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ জেলা খুলনা। এখানে পাকিস্তান বাহিনী যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য প্রথমে একজন লেঃ কর্ণেলকে যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় একজন ফুল কর্ণেল এবং শেষদিকে একজন ব্রিগেডিয়ার দায়িত্ব পালন করে। বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা মহাকুমা নিয়ে একাত্তরের খুলনা জেলা। অসহযোগ আন্দোলনে, আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। শহরের বিভিন্নস্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। নয় মাস এ যুদ্ধে খুলনার তিন সন্তান গৌরবজ্জ্বোল ভূমিকা পালন করেছেন। যা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। তারপরও স্বাধীন বাংলার মাটিতে মুক্ত বাতাসের নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ অনেক সময় হয়নি। কারাগারে কাটাতে হয়েছে এ তিন বীর সেনানীকে। মুক্তিযুদ্ধে ত্যাগ, শ্রম, মেধা ও দেশপ্রেমের জন্য জাতি তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য গত চারযুগ যাবৎ দক্ষিাণাঞ্চলের মানুষ তাদেরকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন। বিজয়ের এ মাসে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ তিন বীর সেনানীর জীবনী।
শেখ কামরুজ্জামান টুকু : বাগেরহাট মহাকুমা সদরের সুনগর গ্রামে ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এস এম বদিউজ্জামান তার পিতা। মোসাঃ রউফুন্নেসা তার মা। পিতা বাগেরহাট তহশীলদার পদে চাকুরি করতেন। পিতার মৃত্যুর পর খুলনায় এসে জিলা স্কুলে লেখাপড়া করেন। চাচা যশোরের লোহাগড়ায় সিও (রেভিনিউ) পদে চাকুরি করতেন। লক্ষ্মীপাড়া হাইস্কুল থেকে ১৯৬২ সালে মেট্টিক পাশ করেন। বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে এইচএসসি ও খুলনার আযম খান কমার্স কলেজ থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৪ সালে খুলনা শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফা প্রচারের সময় তেজগাঁও থেকে তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর পাশের সেলে তার অবস্থান ছিল। কারাগারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি), ডাকসুর ভিপি রাশেদ খান মেননের সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের খুলনা জেলা শাখার প্রচার সম্পাদক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ৩ মার্চ শহীদ হাদিস পার্ক থেকে বের হওয়া ছাত্র-জনতার জঙ্গি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। যুদ্ধের জন্য কালীবাড়ি ও কেডি ঘোষ রোডের বন্দুকের দোকান লুট করেন। খুলনার ইউএফডি ক্লাবে পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা কলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আলিয়া মাদরাসার সামনে ছাত্রলীগ নেতা ইস্কান্দার কবির বাচ্চুর পৈত্রিক বাড়িতে বিপ্লবী পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি তার চেয়ারম্যান মনোনীত হন। বিপ্লবী পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন যুবনেতা জাহিদুর রহমান জাহিদ, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য স ম বাবর আলী, শেখ আব্দুল কাইয়ুম, ডাঃ আসিফুর রহমান ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এ্যাড. কে এস জামান। মুক্তিযুদ্ধে জনমত সৃষ্টির জন্য একটি বেতার কেন্দ্রের প্রয়োজন হয়। গল্লামারীস্থ রেডিও পাকিস্তান খুলনা কেন্দ্র দখলের জন্য যুদ্ধের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ যুদ্ধের কমান্ডার ছিলেন সুবেদার মেজর জয়নাল আবেদীন। তিনি এ যুদ্ধে শহীদ হন। এরপর সঙ্গীদের নিয়ে ভারতে যেয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। মুজিব বাহিনীর খুলনা জেলার প্রধান হিসেবে সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুজিব বাহিনীর জেলা সদর দপ্তর ছিল পাইকগাছা থানার গড়ুইখালী ইউনিয়নের পাতড়াবুনিয়া গ্রামের রায় সাহেবের পরিত্যক্ত বাড়িতে। তার নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী নতুন নতুন এলাকা মুক্তাঞ্চল করে দ্রুত এগোতে থাকে। তার নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধগুলো হচ্ছে পাইকগাছা হাইস্কুল, বারোআড়িয়া, সুরখালী, চিলাবাজার, তালা, কপিলমুনি ও গল্লামারী রেডিও সেন্টার। স্বাধীনতার পর আযম খান কমার্স কলেজে মুজিব বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেন। স্বাধীনতার পর জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় দল ত্যাগ করেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদে যোগ দেন। তিনি এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক। ১৯৭৬ সালে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তার তত্ত্বাবধায়নে বিনয় ভূষণ চ্যাটার্জীর সম্পাদনায় ১৯৭২ সালে আহ্সান আহমেদ রোড থেকে সাপ্তাহিক ডাক দিয়ে যায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৯ সালে জাসদের মনোনয়নে খুলনা সদর আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। ৩২ বছর পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধ গবেষণা ফাউন্ডেশন নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৩ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জীবনী সম্বলিত ‘রক্তে রক্তে স্বাধীনতা’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। ২০০৫ সালে বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৪ বছর যাবৎ এ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমে মনোনীত হিসেবে বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
স ম বাবর আলী : পাইকগাছা থানার গজালিয়া নিজ গ্রামে জন্ম, ৩০ জুন ১৯৪৯। আকবর আলী সরদার তার বাবা ও আয়শা খাতুন তার মা। গজালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু। তারপর লক্ষ্মীখোলা জুনিয়র মাদরাসা এবং আশাশুনি হামিদ আলী হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। খুলনা সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাশ। এরপর বিএল কলেজ থেকে এইচএসসি ও সেখান থেকেু ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন। ১৯৭৮ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলে পড়ার সময় মূলতঃ তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের এক সময়কার ভিপি আলী তারেক, শেখ আব্দুস সালাম, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, শেখ হারুনুর রশীদ, জাহিদুর রহমান জাহিদ, ইউনুস আলী ইনু ও একে ফিরোজ নুন তাকে রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা জোগায়। ১৯৬২ সালে শরীফ কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৬৭ সালে খুলনা শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৮ সালে বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে জেলা ছাত্রলীগের সম্পাদক এর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এক পর্যায়ে জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠন হয়। তিনি যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ২৫ মার্চ কালো রাত্রের পর বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন হলে তিনি তার সাথে সম্পৃক্ত হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে মে মাসের প্রথম দিকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রথমে ভোমরা ক্যম্পে অবস্থান করেন। সেখানে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর পাইকগাছা অঞ্চলের কমান্ডার মনোনীত হন। গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন তিনি ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৬ জুন সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার টাউন শ্রীপুরে যুদ্ধে অংশ নেন। এ যুদ্ধের প্রধান ছিলেন সাব-সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান মাস্টার। এছাড়া খানজিয়া ক্যাম্প, কালীগঞ্জ ক্যাম্প ও সখিপুর ক্যাম্পসহ বিভিন্নস্থানে সফল অভিযানে অংশ নেন। একপর্যায়ে আশাশুনি থানার হেতালবুনিয়ায় ক্যাম্প স্থাপন করেন। পরে হাতিয়ারডাঙ্গা গ্রামের বাছারবাড়িতে জেলা মুজিব বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এ ক্যাম্পের নামকরণ করা হয় বঙ্গবন্ধু ক্যাম্প। হাতিয়ারডাঙ্গা ক্যাম্প খুলনা সাব-সেক্টরে এফএফ বাহিনীর সদর দপ্তর বলে বিবেচিত হত। তিনি গোয়ালডাঙ্গা, তালা, মাগুরা, কেয়ারগাতি, চাপড়া, আশাশুনি, গড়ুইখালি, কপিলমুনি ও স্বাধীনতার ঊষালগ্নে গল্লামারী রেডিও সেন্টার যুদ্ধে অংশ নেন। ১৭ ডিসেম্বর সকালে তিনি সকালে শহীদ হাদিস পার্কে পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রেজাউল করিম ও গাজী রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাইকগাছা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের পর ২ বছর কারাবরণ করেন। ১৯৭৮-৮৪ খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগদেন। দীর্ঘ সময় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দখিনার প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৪ সালে নিজ গ্রাম গজালিয়ায় ১৬ বিঘা জমির ওপর গজালিয়া উদয়ন সংঘ ও থানা সদরে পাইকগাছা বনানী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৩ সালে তার সম্পাদনায় সনদপত্র নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান নামে খুলনার মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রথম ইতিহাসের রচয়িতা। এছাড়া দি লিবারেশন ওয়ার-৭১, স্পন্দন-৭১ এর লেখক। ২০০৫ সালে দি ল ইয়ার নামে গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি আইন ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত।
মোঃ ইউনুস আলী ইনু : ১৯৪২ সালের ১৮ এপ্রিল খুলনার দৌলতুপরের পাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াকুব আলী তার পিতা ও সখিনা খাতুন তার মা। ১৯৪৮ সালে বিনা পানি হাইস্কুল থেকে তার শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯৫৯ সালে দৌলতপুর মহসীন হাইস্কুল থেকে মেট্টিক ও ১৯৬৫ সালে বিএল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পাবলা গ্রামে মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম বিএ পাশ। ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬২ সালে শরীফ কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালে ছয় দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সরকার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬-৬৭ সালে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, কিছুদিনের জন্য জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে একজন দক্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ দৌলতপুর বিএল কলেজ প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে হাজার-হাজার মানুষের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। ২৬ মার্চ তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল গল্লামারীস্থ রেডিও পাকিস্থান, খুলনা কেন্দ্র দখলের যুদ্ধে অংশ নেন। ৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা সীমান্তের ভোমরা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৪-১৫ এপ্রিল সাতক্ষীরা ন্যাশনাল ব্যাংকের লুট করা টাকা জাতীয় পরিষদ সদস্য এম এ গফুরের সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নামে ভারতের ব্যাংকে জমা করেন। ভারতের দেরাদুনে পরবর্তীতে মেজর জেঃ ওভানের তত্বাবধানে ৪৫ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন বৃহত্তর খুলনা জেলার মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তালা, খলিশখালী, বুধহাটা, কেয়ারগাতি, কপিলমুনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ৪-৭ ডিসেম্বর কপিলমুনি যুদ্ধ তার জীবনে স্মরণীয়। স্বাধীনতা ঊষা লগ্নে গল্লামারী রেডিও স্টেশন যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে কমার্স কলেজে মুজিব বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করেন। মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডার স ম বাবর আলীর সহযোগিতায় ১৩টি মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প পরিচালনা করেন। ২২ ডিসেম্বর সার্কিট হাউসে পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় কমান্ডার লেঃ জেঃ জগজীৎ সিং অরোরার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক, সমাজকল্যাণ সম্পাদক, পরবর্তীতে জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মহানগর শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দৌলতপুরের পাবলা দক্ষিণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত পাবলা সবুজ সংঘের সভাপতি পরবর্তী দৌলতপুর প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর তিন বছর আত্মগোপনে ছিলেন। জেঃ এরশাদের সামরিক শাসনের পর তাকে গ্রেফতার করে যশোর সেনানিবাসে অমানসিক নির্যাতন করেন। তিনি ১ বছর কারাভোগ করেন। ১৯৭৩ সালে মেরিনা খানমকে বিয়ে করেন। ইমতিয়াজ মোঃ রাসেল, লিপি, লাকি ও নুরুন্নাহার তার সন্তান। বঙ্গবন্ধু, তোফায়েল আহমেদ ও আমির হোসেন আমু তার প্রিয় নেতা। পাবলার কারিগর পাড়ার কমান্ডার বাড়িতে নিরব নিস্তব্ধে তার দিন অতিবাহিত হচ্ছে। তিনি মাঝেমাঝে কথা বলেন। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তবে কপিলমুনির যুদ্ধ তার স্মৃতি থেকে ভোলেননি। সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতি মাসে একবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। হার্ট, কিডনী ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। মিছিল মিটিং করার মতো মানসিক শক্তি তার আর নেই। বিজয় দিবসে লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর ইচ্ছের কথা বললে তার চোখ থেকে নিরবে অশ্রু পড়ে। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সোনলী দিনগুলো দেখার তার খুব ইচ্ছে। সুবর্ণ জয়ন্তীতে তিনি আবার লাল-সবুজের পতাকা তুলতে চান।
(সূত্রঃ প্রফেসর বি করিম রচিত দৌলতপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ড. শেখ গাউস মিয়া রচিত আলোকিত মানুষের সন্ধানে)

(ঊষার আলো-এমএনএস)

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ