বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের ৫০ বছর

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো ডেস্ক : ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিদের মুক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাবলির প্রতি সমগ্র্র দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধ চলমান থাকাকালে সে সময়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ও সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ পরিচালনা করছিল। তখন প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক ভারত, বাংলাদেশের জনগণকে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসহ সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা প্রভৃতিও করেছে ভারতের সরকার ও জনগণ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘মৈত্রী দিবস’ উদযাপন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর মৈত্রী দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল সে সময়ে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর যখন থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে তখন থেকে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের স্বর্ণালি সময়।

এ বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা সফরের সময় বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর যৌথ বিবৃতিতে ৬ ডিসেম্বর মৈত্রী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত প্রথম জানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র ১০ দিন আগে ভারত ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সে দেশের রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী ও অন্যান্য ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্ববর্গকে সম্মাননা জ্ঞাপন করছেন। ২০১৫ সালের ৭ জুন বঙ্গভবনে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে দেওয়া বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পদক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্রহণ করেন। অটল বিহারী বাজপেয়ীকে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননার সাইটেশনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ১৯৭১-এর ১ থেকে ১১ আগস্ট জনসংঘের যুবক স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণে এক জনসত্যাগ্রহ কর্মসূচি এবং ১২ আগস্ট ভারতীয় পার্লামেন্টের সামনে এক সমাবেশের আয়োজনে শ্রী বাজপেয়ীর নেতৃত্ব দানের কথা বলা হয়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকে অভিনন্দন জানিয়ে সে সময়ে শ্রী বাজপেয়ী ‘অর্গানাইজার’-এর সম্পাদকীয় লেখার কথা বলা হয়েছে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি, শ্রী বাজপেয়ীর সম্মাননা গ্রহণ করার সময় দেওয়া বক্তৃতায় এই সম্মাননাকে ভারতীয় জনগণের জন্য একটি মর্যাদাকর বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে সে সময়ের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জনসংঘ কর্তৃক ১৯৭১-এর আগস্টে দিল্লিতে আয়োজিত সত্যাগ্রহে তরুণ বয়সে তার অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করেন।

ঢাকা ও দিল্লি ছাড়া এবার মৈত্রী দিবস একসঙ্গে ১৮টি দেশে উদযাপিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- বেলজিয়াম, কানাডা, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্র। মৈত্রী দিবস উদযাপন হচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর ও অচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের প্রতিফলন যা রক্ত ও আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের অকৃত্রিম বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে ‘মৈত্রী’ বা ‘বন্ধুত্বের’ ভিত্তি রচিত হয়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত জোরালোভাবে বাংলাদেশ-ভারত ভাই ভাই হওয়ার কথা বলেন, যা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। এখন থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত ঝরা দিনগুলোর মধ্যেই ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত।

সবচেয়ে খারাপ গণহত্যা ও রক্তপাতের মাধ্যমে ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পাকিস্তানের মৃত্যুগহ্বর থেকে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পর ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া তাঁর প্রিয় স্বদেশ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নিজের স্বপ্নের মতো করে গড়ে তোলার ব্রতে মগ্ন হয়েছিলেন। এরপরই বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। তারপর থেকে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার ইতিহাস নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। একই সঙ্গে তারা ভারতবিরোধিতাকে তাদের রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ও দুঃসময়ের বন্ধু ভারতকে বাংলার মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

২০২১-এর মার্চে বাংলাদেশ সফরের সময় একটি জাতীয় দৈনিকে ইমাজিনিং অ্যা ডিফারেন্ট সাউথ এশিয়া উইথ বঙ্গবন্ধু শিরোনামে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের দিকে যখন আমরা ফিরে তাকাই তখন আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, আমাদের উপমহাদেশ দেখতে কেমন হতো, যদি আধুনিককালের এই মহামানবকে হত্যা না করা হতো? এটি খুব নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে বঙ্গবন্ধু কান্ডারি হলে বাংলাদেশ ও আমাদের এই অঞ্চল খুব ভিন্নভাবে আবর্তিত হতো। একটি সার্বভৌম, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চায়, বেদনাদায়ক যুদ্ধের ভস্ম থেকে উঠে আসছিল। যদি এই ধারা বজায় থাকত, সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশ সম্প্রতি যা অর্জন করেছে তা অনেক আগেই অর্জন করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ তিনি ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ও বাস্তবায়িত স্থল সীমান্ত চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এটিকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি জীবিত থাকতেন তাহলে অনেক আগেই এটি হতে পারত। আর তা যদি হতো তাহলে, সর্বসাকুল্যে আমাদের সহযোগিতা উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অংশগ্রহণমূলক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছত।

কৃষ্ণ চন্দ্র সাগর তার ওয়ার অব দ্য টুইনস শীর্ষক গ্রন্থে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার কর্তৃক পরিচালিত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাত থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিকে কূটনৈতিক মাস্টার স্ট্রোক হিসেবে গণ্য করা হয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিদানকারী দুটি রাষ্ট্র হচ্ছে- ভারত ও ভুটান। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বা কৌতূহলী মহলের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই জাগে আর তা হলো- ভারত এবং ভুটানের মধ্যে কোন রাষ্ট্র আগে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। বোঝা যায় কূটনৈতিক কৌশলগত কারণে ভারতের স্বীকৃতি দানের কয়েক ঘণ্টা আগে ভুটান স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অপরপক্ষে, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশকে ভারত স্বীকৃতি দানের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করে দেয়। দিল্লিতে পাকিস্তানি হাইকমিশন অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান এ সময় সুইজারল্যান্ডকে অনুরোধ করে ভারতে তাদের (পাকিস্তানের) অফিসিয়াল স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড দেখাশুনার জন্য।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনটিকে গত অর্ধশতাব্দী ধরেই পালন করা হচ্ছে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে। ২০২১ সাল থেকে ৬ ডিসেম্বর মৈত্রী দিবস উদযাপনের মাধ্যমে ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের ক্যালেন্ডারে যুক্ত হচ্ছে একটি গৌরবময় মাইলফলক। শোষণ থেকে মুক্তি ও স্বাধীন জীবনযাপনের জন্য বাঙালি জাতির দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে জন্ম হয় বাংলাদেশের। ইতিহাসে এই দিনটিকে যত্ন করে আগলে রাখতে দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ‘মৈত্রী দিবস’ লোগো ও ব্যাকড্রপ নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। লোগো ও ব্যাকড্রপ প্রতিটি ক্যাটাগরির নকশার জন্য বিজয়ী প্রতিযোগীদের জন্য আটটি করে ১৭টি আকর্ষণীয় সম্মানী পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম পুরস্কার হিসেবে ১০০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা অথবা ভারতীয় রুপি, দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে ৭০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা অথবা ভারতীয় রুপি, তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে ৫০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা অথবা ভারতীয় রুপি দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সব শেষে, ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। বঙ্গবন্ধু তখন তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘যদি আমি ভারতের সরকারের বিষয়ে না বলি, তাহলে অন্যায় করা হবে। আমার দেশের জনসাধারণ যখন প্রাণভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে, ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষে যায়, তখন ভারতের জনসাধারণ, পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং আসামের জনসাধারণ, বিশেষ করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। কারণ তারা আমাদের জনসাধারণকে বুকে টেনে নিয়েছেন। স্মরণ করি ভারতের সেনাবাহিনীর ওই সব জোয়ানদের, যারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করেছেন। আমি স্মরণ করি রাশিয়ার জনসাধারণ ও সরকারকে, যারা নিশ্চিতভাবে আমাদের সাহায্য করেছেন। তারা প্রকাশ্যে আমার গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। স্মরণ করি গ্রেট ব্রিটেনের জনসাধারণকে, পশ্চিম জার্মানির জনসাধারণকে, জাপানের জনসাধারণকে, এমনকি আমেরিকার জনসাধারণকে, যারা আমাদের আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। যারা যারা সমর্থন করেছিলেন, তাদের সবাইকে আমাদের এই গণপরিষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। এমনকি জাতিসংঘে রাশিয়া তিনটি ভেটো দিয়েছিল, তা না হলে সেখানে ষড়যন্ত্র চলছিল, তাতে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতো, তা বলতে পারি না।

যেসব পূর্ব ইউরোপীয় দেশ আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছিল, বিশেষ করে পোল্যান্ড, তাদের প্রত্যেককে এবং তাদের জনসাধারণকে এই পরিষদের মাধ্যমে ধন্যবাদ জানাতে চাই এবং স্মরণ করতে চাই।’ এ বছর ২০২১-এ এবং পরবর্তী বছরগুলোতে প্রতিবার ৬ ডিসেম্বর যখন মৈত্রী দিবস উদযাপন করা হবে তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুই দেশের জনগণ স্মরণ করবেন। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরই অংশ।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

(ঊষার আলো-এফএসপি)