কালের পথ পরিক্রমায় বর্ষবরণ

সর্বশেষ আপডেটঃ
nababarsha

|| এড. বিপ্লব কান্তি মন্ডল ||

জীবজগত প্রকৃতির অনুপম সৃষ্টি। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। প্রাকৃতিক নিয়মের ছন্দবদ্ধতার সাথে মানুষের এগিয়ে চলাতেই তার সভ্যতার আনন্দ। প্রকৃতির নিয়মকে না জানার অজ্ঞতাই মানুষের অগ্রসরতার অন্তরায়। বিপুলা বিশ্বের মহাকাশ অসীম এবং মহাকাল অনন্ত। কালের এই ব্যাপ্তি সত্ত্বেও আজ মহাকাল সুশৃঙ্খল নিয়মের অনুবর্তী এই নিয়মানুবর্তিতা সাধারণভাবে সময়ভিত্তিক। সৌরজগতের বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের অবস্থান নির্দেশ এবং প্রসঙ্গত কাল মান নির্ণয় বা সময় বিভাজন জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিপাদ্য বিষয়।

প্রাচীনযুগে কালমানের যত রকমের বিভাগ বা একক লক্ষ্য করা যায় তার মধ্যে কোনটি ছোট কোনটি দীর্ঘ, কোনটি ব্যবহারিক আবার কোনটি পুঁথিগত। পর্যবেক্ষণ এবং ব্যুৎপত্তির সাহায্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সময়কে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করেন এবং সেই অংশগুলির মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমস্ত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থে কালমান সম্পর্কে আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক সূর্য সিদ্ধান্তে কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কাল চেতন এবং অচেতন পদার্থের সৃষ্টি স্থিতি ও বিনাশকারী। এই কাল দ্বিবিধ, মহাকাল ও খন্ডকাল যা অশেষ এবং অনাদি তা মহাকাল, যার আদি ও অন্ত জানা যায় তা খন্ডকাল। খন্ডকাল ও দ্বিবিধ, মূর্ত এবং অমূর্ত। যে কাল প্রত্যক্ষত নিরুপণ করা যায়, তার নাম মূর্তকাল এবং যে কাল অতি সূক্ষ্ম অর্থাৎ যার অংশ পরিমাণ প্রত্যক্ষ করা যায় না তার নাম অমূর্তকাল।

প্রাচীনকালে মূর্তকাল গণনার কনিষ্ঠতম একক ছিল ‘পল’। দশ পলে এক প্রাণ। ছয় প্রাণে এক বিনাড়ী। দশ বিনাড়িতে এক নাড়ি। ষাট নাড়িতে এক অহোরাত্র। ত্রিশ নাড়িতে এক দিন। সাত অহোরাত্রে এক সপ্তাহ এবং দুই সপ্তাহে এক পক্ষকাল। দুই পক্ষকালে এক মাস। দুই মাসে এক ঋতু। তিন ঋতুতে এক অয়ন এবং দুই অয়নে এক বৎসর। বার বৎসরে এক যুগ, এরপর মহাযুগ, মন্বন্তর এবং কল্প।

জ্যোর্তিবিজ্ঞানী বরাহমিহিরের মতে, কাল নিরূপণের কনিষ্ঠতম একক পল এবং বৃহত্তম একক কল্প পর্যন্ত সময়কে পর্যায়ক্রমে বিন্যাস করে কাল নির্ণায়ক পঞ্জিকা সংস্কার করা হয়। ইতিপূর্বে আর্যভট্ট ব্যতিত কাল নির্ণয়ে আর কারো মতবাদ পরিদৃষ্ট হয় নাই। আর্যভট্টের সময়ে কাল নির্ণয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত ছিল। যার মধ্যে তার নিজ ভূভ্রমণবাদ সহ ভাস্করাচার্য্যের সিদ্ধান্ত শিরোমণি গ্রন্থের নিরুপিত তত্ত্বের সংশোধন ও সংযোজন করে বরাহমিহির “পঞ্চ সিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

প্রাচীনকালে কাল নির্ণয়ের জন্যে সময়ের বিভিন্ন প্রকার কনিষ্ঠতম এককের প্রচলন ছিল। যেমন নিমেষ বা পলক। অর্থাৎ চোখের পলক পড়তে যতটা সময় লাগে নিমেষ সেই পরিমাণ সময়। পনের নিমেষ সমান এক কাষ্ঠা। তিরিশ কাষ্ঠায় এক কলা এবং তিরিশ কলায় এক মুহূর্ত। তিরিশ মুহূর্তে এক দিন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী শ্রীপতিভট্টের “জ্যোতিষ রত্নমালা” গ্রন্থে এই তিরিশটি মুহূর্ত বর্ণিত হয়েছে। দিনের শুরু হত সূর্যোদয়ের মধ্যম অবস্থা থেকে। রাতের সূচনা সূর্য অস্ত গমনের মধ্যভাগ থেকে। যেহেতু দিন ও রাত পনেরটি মুহূর্ত বিশেষ সেজন্যে মধ্যদিন নির্দিষ্ট থাকতো দিবাকালিন অষ্টম মুহূর্তের মধ্য সময়টিতে। সেইভাবে মধ্যরাত্রি নির্দিষ্ট থাকতো রাত্রিকালিন অষ্টম মুহূর্তের মধ্যকালে। দিনের পনেরটি মুহূর্ত যথাক্রমে রুদ্র, অহি, মিত্র, পিতৃ, বসু, বারি, বিশ্ব, বেধস, প্রজাপতি, ইন্দ্র, ইন্দ্রাগ্নি, নিঋতি, বরুণ, অর্যমন, ভগ। রাত্রিকালিন পনেরটি মুহূর্ত যথাক্রমে শিব, অজপাদ, অহিবুধ্ন্য, পুষণ, অশ্বিন, যম, অগ্নি, বিধাতৃ, চন্দ্র, অদিতি, বৃহস্পতি, বিষ্ণু, সূর্য, ত্বষ্টৃ, বায়ু। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে কাল নির্ণায়ক দিনমান সাধারণভাবে চারটি পর্যায়ে বিভক্ত।

একটি নক্ষত্র পর্যায়, দ্বিতীয়টি সৌর পর্যায়, তৃতীয়টি চান্দ্র এবং চতুর্থটি সাবন পর্যায়। মাস ও বছর নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাচীনকালে এই চারটি পর্যায় লক্ষ্য করা যায়। সৌর পর্যায়ের ভিত্তিতে বাংলা বৎসর বা পঞ্জিকা গণনা করা হয়। কারণ সৌর দিন, মাস বা বৎসরের মান অনেকটা ত্রুটিমূক্ত এবং বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিশেষ করে যজ্ঞের কাল নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কালপঞ্জি উৎভাবনের প্রয়োজনবোধ করেন। পরবর্তীকালে কৃষিকাজ ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারীর খাজনা আদায় করা, খাজনা আদায়ের পুণ্যাহ অনুষ্ঠান, জমিদার ও রায়তের মধ্যে নতুন চুক্তি, পাট্টা ও কবুলতি প্রদান, দোল, দেউল উৎসব, মেলা, পার্বণ, এক কথায় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনই প্রবাহমান সময়কে কালপঞ্জির নিয়মে সন্নিবেশিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।  সুনির্দিষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে সময় গণনার পদ্ধতি হিসাবে পঞ্জিকার উদ্ভাবন হয়।

মোঘল সম্রাট আকবর প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করার সুবিধার জন্যে ফসলের মৌসুমে ফসলী সন হিসাবে সৌর পর্যায়ের ভিত্তিতে বাংলা সন চালু করেন। সম্রাট আকবরের সভাসদ আমীর ফতেউল্ল্যা সিরাজী আকবর প্রণিত বঙ্গাব্দ প্রণয়নের কাজ করেন। আকবরের রাজত্বকালে ৯৬৩ হিজরী সন চালু ছিল। তার সাথে সৌর বৎসর যোগ করে বঙ্গাব্দ চালু করা হয়।

প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন শাসকেরা বৎসর গণনার বিভিন্ন নিয়ম চালু করেন। যেমন ভারত সন, লক্ষণাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, পালাব্দ, কল্যব্দ, ত্রিপুরাব্দ, জালালী সন, সেকেন্দার সন, হিজরী সন, এলাজী সন, চৈতনাব্দ, বুদ্ধাব্দ ইত্যাদি। এর মধ্যে বঙ্গাব্দ দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্তিসংগত বিন্যাসের কারণে এই উপমহাদেরশের মানুষের কালপঞ্জি হিসাবে কার্যকর আছে।

বাংলা সন সৌর বৎসরের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং চন্দ্র, সূর্যের আবর্তন পথে সাতাশটি নক্ষত্রের ও বারটি রাশির মধ্য দিয়ে পরিক্রমণ করে। আশ্বিনী থেকে রেবতি পর্যন্ত সাতাশটি নক্ষত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বলতর যে নক্ষত্রে দাঁড়ায়ে চাঁদ পূর্ণিমা দেখায় সেই নক্ষত্রের নামানুসারে বাংলা মাসের নাম প্রবর্তিত হয়। এক নক্ষত্রকাল সময়কে মাস বলে এবং এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে উৎক্রমণের কালকে সংক্রান্তি বলে। বারটি উজ্জ্বলতর নক্ষত্রে তারকার অবস্থানকে কেন্দ্র করে বারটি রাশি নির্দেশিত হয়। যেমন সূর্য বৈশাখ মাসে মেষ রাশিতে থাকে। জৈষ্ঠ্য মাসে বৃষ রাশিতে, আষাঢ় মাসে মিথুন রাশিতে এভাবে কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ অবশেষে চৈত্র মাসে মিন রাশিতে অবস্থান করে।

অগ্রহায়ণ বাদে নক্ষত্রের নামানুসারে সকল বাংলা মাসের নাম প্রবর্তিত হয়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে বৈশাখ মাস, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের নামানুসারে জৈষ্ঠ্য মাস, আষাঢ়ার নামানুসারে আষাঢ় মাস, শ্রবণার থেকে শ্রাবণ, ভদ্রা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনি থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র এবং তদকালে অগ্রহায়ণ থেকে বাংলা মাস শুরু হত বলে ঐ মাসের নাম হয় অগ্রহায়ণ। অগ্র অর্থ প্রথম এবং হায়ণ অর্থ মাস। গ্রহের নামানুসারে সাতটি বারের নাম যথাক্রমে শুক্রবার, শনিবার, মংগলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং চন্দ্র বা সোম ও সুর্য্য বা রবি এর নামানুসারে প্রবর্তিত হয়।

প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চন্দ্র ও সুর্য্যকে গ্রহ বলে জানত। মহাবিশ্বে সূর্যই ঋতু নিয়ন্তা। অর্থাৎ সূর্যের প্রভাবেই প্রকৃতিতে ঋতুচক্র আবর্তিত হয়। এই ঋতুচক্রে প্রকৃতির রূপ ও পালাবদলের সাথে মানুষ তার ঋদ্ধ মন ও মননের অনুভুতি মিশিয়ে নববর্ষের উৎসব পালন করে। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে কাল পরিক্রমায় বাঙালী তার গৌরবময় ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে মহাকালের সাথে কালপঞ্জিকার বর্ষবরনের উৎসব পালন করে।

কোন কোন সময় এই উৎসব বাঙালী জীবনের চাপা ক্ষোভ ও বঞ্চনার রঙ এ রঞ্জিত হয়ে প্রতিবাদে রূপ নেয়। পহেলা বৈশাখে রুদ্র প্রকৃতির মধ্যে যা কিছু জীর্ণ পুরাতন তার মধ্যে থেকে সবুজ কলির বেড়ে ওঠার প্রত্যাশার সাথে বাঙালী মানসে অংকুরিত হয় নতুনকে বরণ করে নেয়ার স্বপ্নসাধ। বাঙালী স্বত্তার আয়নায় রবীন্দ্র নজরুল চেতনাকাল পঞ্জিকার বর্ষবরণে নব দ্যোতনায় আন্দোলিত করে বাঙালী মনকে। সময়ের প্রয়োজনে উজ্জিবীত বাঙালির উদ্দিপ্ত আহবানে প্রকম্পিত হয় প্রতিক্রিয়ার পুরাতন শাসন শোষণ। বঞ্চনার বেলাভূমে আমরা সম্ভাবনার সোনালী সূর্য প্রত্যক্ষ করি। অসত্য ও অন্যায়ের ছায়ায় বারবার আচ্ছাদিত হয় আমাদের গর্বিত সকাল।

বর্ষ পরিক্রমার মাহেন্দ্রক্ষণে প্রকৃতিতে জীর্ণতার অবসানে নতুনের আগমনীর সাথে মানুষের মনোজগতেও সূচিত হয় সৃষ্টিশীলতার অনুরনন। বাঙালীর মধ্যযুগের পুণ্যাহ, হালখাতা আর নবান্নের সাথে আজ প্রাণ ও প্রকৃতির জাগরণী উৎসবের আনন্দ ধারায় শুচিতার জয়গান গাইতে হবে। রবীন্দ্র চিন্তার অন্তর ও চিত্তের বিকাশের মন্ত্রে উজ্জিবিত ষাটের দশকে রমনার বটমূলে একদিকে স্বাদেশিকতা, অন্যদিকে সৌন্দর্যভাবনায় আমরা আন্দোলিত হয়েছি। পিছনের অনেকগুলি বৈশাখের সব প্রত্যাশা আমাদের পূরণ হয়নি। আমরা দ্রোহের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে সূর্যের মত আলো ছড়িয়ে দিতে চাই বাঙালীর অগ্রযাত্রার ইতিহাস রচনায়। ১৪২৯ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখের বিশাখা নক্ষত্রকে স্বাক্ষী রেখে আমরা শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমতা, সামাজিক নায্যতা ও মানবিক মর্যাদার সমাজ গড়ার গান গাইবো। আবারও গাইবো  “আমরা যৌবনেরই দূত”, “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো”
(লেখক : আইনজীবী ও রাজনীতিক)