বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড: নেপথ্যের অন্যতম তিন কুশিলব কিসিঞ্জার, ভূট্টো ও জিয়া

সর্বশেষ আপডেটঃ
।। শেখ ফরহাদ হোসেন ।।

৪৭ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ভোর রাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্ব-পরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন দেশি-বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে এই নৃশংস ঘটনাকে সেনা অভ্যূত্থান বলে প্রচার করা হলেও আসলে এটা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রেও সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এর প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্থান প্রেমিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যার নেতৃত্বে ছিল ইর্ষাাকাতর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তৎকালীন উপ-সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই ইর্ষা শুরু ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন থেকে। ভাষা আন্দোলনের কারণে বঙ্গবন্ধু তখন জেলখানায়। খন্দকার মোশতাকের সরাসরি বিরোধীতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিমলীগের যুগ্ম-সম্পাদক হলেন। অপর দিকে এই নিষ্ঠুর এই হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিল চাকুরীরত ও চাকুরীচ্যুত নানা কারণে হতাশাগ্রস্থ্য কিছু সেনা সদস্য। ৪৬ ব্রীগেডের দুইটি ইউনিট ১৫ই আগষ্টে পৃথিবীর নিষ্ঠুর ও বর্বরতম হত্যাকান্ড চালায়। যার নেতৃত্বে ছিল মেজর ফারুক ও মেজর রশিদ।

অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে বৃহত্তর নিরক্ষর গোষ্ঠির দুঃখ দুর্দশা লাঘব, সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যের অবসান, দেশের সম্পদ মানুষের মাঝে সুষমভাবে বন্টনের জন্য সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাকশাল সৃষ্টি করেন। দেশ যখন একটা স্থিতিশীল অবস্থায় যায় তখন বঙ্গবন্ধুকে স্ব-পরিবাওে হত্যা করা হয়। তখন যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করা হতো, আজ দেশ ইউরোপ আমেরিকা হতো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে।
গত ৪৭ বছরে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ছিল দেশিয় ও আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্রের ফসল। বিদেশী বর্বর নেপথ্যের কুশীলবদের মধ্যে ছিল তৎকালিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরী কিসিঞ্জার এবং পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো।

কিসিঞ্জার কোন ভাবেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভূদ্যয়কে মেনে নিতে পারেননি। বাংলাদেশের অভ্যূদয়কে নিজের পরাজয় মনে করতেন। বঙ্গবন্ধু আমেরিকা এবং তার অনুগ্রহ ভাজন সমস্ত শক্তিকে অবজ্ঞা করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। ড. হেনরী কিসিঞ্জারের বিদেশী শত্রুর তালিকায় তিন জন ছিল সবচেয়ে ঘৃনিত ব্যক্তি। এরা হলেন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউ এবং বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এই শত্রুর তালিকায় বঙ্গবন্ধু ছিল অন্যতম। কিসিঞ্জারের প্রাক্তন স্টাফ এ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিস ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেওয়া এক স্বাক্ষাতকারে শেখ মুজিবের প্রতি ড. হেনরী কিসিঞ্জারের তীব্র ঘৃনার কথা প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে দেশি-বিদেশী চক্রের জড়িতথাকার বিষয়টি দুইজন বিদেশী সাংবাদিকের লেখা গ্রন্থ্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রথমজন হলো মার্কিন সাংবাদিক লরেন লিফশুলজের বই বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভ্যূলেশন এবং দ্বিতীয় বইটি হলো মার্কিন সাংবাদিক, গবেষক, লেখক স্ট্যানলি ওলপার্টের বই জুলফি ভূট্টো অব পাকিস্থান: হিজ লাইফ এন্ড টাইমস। ১৯৭৯ সাল থেকে মার্কিন সাংবাদিক লরেন লিফশুলজ অব্যহতভাবে লিখে আসছেন যে, খুনিদের সাথে ঢাকাস্থ্য মার্কিন দূতাবাসের পূর্বযোগাযোগ ছিল। মার্কিন অবমুক্ত করা দলিল থেকে জানা যায়, মেজর ফারুক-রশিদরা বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের জন্য ১৯৭৪ সালের ১৩ মে বাংলাদেশের উচ্চতর সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে মার্কিন প্রশাসনের কাছে, বাংলাদেশী আমেরিকান দূতাবাসের মাধ্যমে সু-নির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছিলেন। তৎকালিন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ২১৫৮ নং গোপন তারবার্তার মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের ১৫ মে অবহিত করেছিলেন। এই ঘটনার ৫ মাসের মাথায় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরী কিসিঞ্জার ঢাকা সফর করেন। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা ফুড পলিট্রিক্স এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারের উৎখাতের জমিন তৈরী করেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারী মাসে আমেরিকার কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স কর্তৃক প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্সে মুদ্রিত এক গবেষনামূলক নিবন্ধে এম রথচাইল্ড বিভিন্ন সরকারী দলিলপত্রের মাধ্যমে প্রমান করেন ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দূর্ভিক্ষের জন্য মার্কিন প্রশাসন দ্বায়ী ছিল।

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। জাতির জনক হত্যাকান্ডে কিসিঞ্জার ভূট্টোর ঘৃনিত ভূমিকার কথা মার্কিন অবমুক্তকরা দলিলে আবারও উঠে এসেছে। এমনকি ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুর ৩২নম্বর বাড়িতে খুনিরা আক্রমন করে তখন সুদূও আমেরিকা থেকে কিসিঞ্জার খোজখবর রাখছিলেন। ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সালে শুক্রবার সকাল ৮টায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে স্টাফ সভায় মিলিত হন। শুরুতে তিনি বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ বিষয় নিয়ে কথা বলবো এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সম্পর্কে বলেন এটা হচ্ছে সুপরিকল্পিত ও নিখুতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যূত্থান। কিসিঞ্জার জানতে চান মুজিব জিবিত না মৃত? আথারটন বলেন, মুজিব মৃত। তার নিকটজন সহ পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছে। কিসিঞ্জার তখন বলেন, আমি এর থেকে ভালো খবর ব্যুরো অফ ইন্টিলিজেন্স থেকে পেয়েছি। ব্যুরো পরিচাক জি. হিল্যান্ড কিসিঞ্জারকে জানান আমি যখন আপনার সাথে কথা বলেছি তখনও শেখ মুজিব নিহত হননি। কিসিঞ্জার বলেন তার কিছু পরে তাকে হত্যা করা হয়? তখন আথারটন বলেন, আমরা সবকিছু জেনেফেলেছি বলতে পারিনা। তবে ইঙ্গিত ছিল তাকে হত্যা পরিকল্পনা বিষয়ে। খুনিরা তার বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করে এবং তাকে হত্যা করে।
এমনকি ১৫ আগষ্ট ভোর রাতে তৎকালীণ বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোষ্টারকে ঢাকার রাস্তায় তার গাড়িতে ঘুরতে দেখা যায়। ভয়েস অব আমেরিকা থেকে ১৫ আগষ্ট ভোর সাড়ে পাঁচটায় বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রচারিত হয়, তখনও বঙ্গবন্ধু জীবিত। ভোর ৬টার কিছু আগে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকন্ডে পাকিস্থানের জড়িত থাকার প্রমানের জন্য সে সময়ের পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টোর বিভিন্ন রাজনৈতিক, কুটনৈতিক তৎপরতা, কিছু লেখকের গবেষনা মূলক বই এবং মার্কিন অবমুক্ত করা দলিলই যথেষ্ট। মার্কিন অবমুক্ত করা দলিল থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরী কিসিঞ্জার এক ঘন্টারও বেশি সময় নিয়ে বৈঠক করেন। উক্ত বৈঠকে ভূট্টো এবং কিসিঞ্জারের আলাপ আলোচনার আংশিক নি¤œরূপ:- কিসিঞ্জার ভূট্টোর নিকট জানতে চান মুজিব কি টিকতে পারবে? ভূট্টো উত্তরে বলেন “আমি এতে সন্দেহ করি”। কিসিঞ্জার তখন আবার জানতে চান তখন কি হবে? সেনাবাহিনী আসবে? উত্তরে ভূট্টো বলেন “হ্যা”। ভূট্টো আরো বলেন, “তখন তারা অব্যহতভাবে ভারত বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে”। উক্ত বৈঠকে কিসিঞ্জার আরো বলেন, চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে চায়, আমরা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছি। কারণ ভূট্টো কিসিঞ্জারকে জানিয়েছিল চীনের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুকূল সময় এখনও হয়নি। চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। ভূট্টোর নিকট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুকূল সময় মানের ১৫ আগষ্ট হত্যাযজ্ঞের পর। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর নিকট ভূট্টো যে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তাই’ই হলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলো। সেই সেনাবাহিনী নিয়ে খন্দকার মোশতাক অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি হয়, তারই ধারাবাহিকতায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে প্রায় পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এই জিয়া গংরা বাংলাদেশে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টাল রাজনীতির সূচনা করেন, যা এখনও চলমান। বঙ্গবন্ধুর হত্যার কয়েক ঘন্টার মধ্যে মোশতাকের অবৈধ ও অসাংবিধানিক সরকারকে সর্বপ্রথম তারবার্তার মাধ্যমে স্বীকৃতি ও অভিনন্দন জানান পাকিস্থানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো। খুশিতে আত্মহারা ভূট্টো ঘোষনা করেন পাকিস্থানের জনগনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগনের জন্য ৫০ হাজারটন চাউল, ১ কোটি গজ কাপড় (লং ক্লথ) ও ৫০ লাখ গজ সুতি কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইসলামী দেশগুলির প্রতি এবং তৃতীয় বিশে^র সকল দেশের প্রতি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ করছি।

“হু কিলড মুজিব” গ্রন্থে এ, এল খতিব লিখেছেন ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে পাকিস্থান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং জুন মাসে ভূট্টো ঢাকায় সফরের পর থেকে স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলি মুজিব বিরোধীতায় নামে। উক্ত গ্রন্থে উঠে এসেছে স্বাধীনতা বিরোধী চীনাপন্থী অতি বামপন্থী দলগুলির কথা। স্বাধীনতা বিরোধী চীনাপন্থী কমউনিষ্ঠ নেতা আব্দুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টোকে “আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী” সম্মোধন করে একটি পত্র লেখেন। উক্ত পত্রে বলেন, পুতুল মুজিব চক্র এখন জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও ওয়্যারলেস প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি। বাংলাদেশে ভূট্টোর আরেকজন এজেন্ট এর নাম আব্দুল মালেক দেশ বিরোধী তৎপরতা চালানোর জন্য সৌদি আরব যান। ১৯৭৫ সালের ২২ জানুয়ারী উক্ত মালেক ভূট্টোকে চিঠি লেখেন “আমার প্রিয় নেতা” সম্মোধন করে, উক্ত চিঠিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৬৫ মিলিয়ন মুসলমান তাদের মুক্তির জন্য আপনার নেতৃত্ব লাভের আশায় গভির উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ভূট্টো তৎকালীন পাকিস্থানের ধর্মমন্ত্রী কাওছারকে সৌদি আরব পাঠান। মার্কিন সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক স্টানলি ওলপার্ট তার বই জুলফি ভূট্টো অব পাকিস্থান : হিজ লাইফ এন্ড টাইমস এ উল্লেখ করেন, ভূট্টো তার স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে দুই বছর যাবত বাংলাদেশে মুজিব বিরোধী দলগুলিকে অর্থ সাহায্য করতেন এবং তার বিনিময়ে ফল লাভ করেছেন। ১৯৭৩ সালের ভূট্টো পাকিস্থানের সংবিধানে বাংলাদেশেকে পাকিস্থানের প্রদেশ হিসাবে উল্লেখ করেন। উল্লেখিত ঘটনাগুলি দৃঢ়ভাবে প্রমান করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে কিসিঞ্জার ও ভূট্টো জড়িত।

ইর্ষা জিয়াউর রহমানের মধ্যেও ছিল। একাত্তরের রণাঙ্গনে বিশেষ অবদান ও সাফল্যের জন্য জিয়াউর রহমানের চেয়ে দুই বছরের জুনিয়র জেনারেল শফিউল্লাহকে জেনারেল ওসমানির সুপারিশে সেনাপ্রধান করা হয়। এখান থেকে বিরোধীতা শুরু বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের। জিয়াউর রহমানের মধ্যে হীনমন্যতাও কাজ করতো। জিয়া যুদ্ধ শুরু করার প্রায় ৩২ ঘন্টা আগে তৎকালীন মেজর শফিউল্লাহ, মেজর রফিক ও মেজর সুবিদ আলী ভূঁইয়ারা পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। কুমিরার যুদ্ধে সুবিদ আলী ভূঁইয়ারা ব্যাপকভাবে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ক্ষতি সাধন করে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্থান থেকে আগত সোয়াত জাহাজ থেকে জিয়া যখন অস্ত্র খালাসের জন্য যায় তখন চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগ নেতা, এম, এ হান্নান, এম, এ আজিজ এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বেলাল মাহামুদ জিয়াকে রাস্তার থেকে ডেকে নিয়ে বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি ঘোষনা পাঠ করান এবং পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কথা বলেন। তার পর থেকে জিয়ার যুদ্ধ শুরু।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বাঙ্গালী সেনাকর্মকর্তারা যখন, পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর সাথে মরণপন যুদ্ধে লিপ্ত তখন জিয়া কেন পশ্চিম পাকিস্থান থেকে বাঙ্গালীদের মারার জন্য যে অস্ত্র আনা হয়েছে তা পাকিস্থানীদের জন্য খালাস করতে গেলো? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে জিয়ার মৃত্যু পর্যন্ত তথ্য প্রমাণ বলে, বাংলাদেশে কিসিঞ্জার-ভূট্টোদের আসল লোক ছিল জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের নয় দিনের মাথায় পুরষ্কার স্বরূপ ২৪ আগষ্ট ১৯৭৫ জিয়াকে সেনাপ্রধান এবং এরশাদকে বিধিবর্হিভূতভাবে দুটো প্রমোশন দিয়ে উপসেনাপ্রধান করা হয় তখন তিনি দিল্লিতে ট্রেনিং এ ছিলেন। ১৯৭১ সালে এরশাদ পাকিস্থান থেকে তিন বার বাংলাদেশে আসে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন নি। খন্দকার মোশতাককে ড্যামি হিসাবে ১৫ আগষ্ট রাষ্ট্রপতির গদিতে বসানো হয় এবং আশি দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানো হয় জিয়াকে। ১৯৭৫ সালে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্ণেল শাফায়াত জামিল তার বইয়ে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে ২০ মিনিট পর ঘাতক মেজর রশিদ তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলে আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি কোন প্রতিরোধের চেষ্টা করবেন না। শাফায়াত সঙ্গে সঙ্গে সেনা প্রধানকে ফোন করেন। তার বাসার পাশে ছিলো উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের বাসা শাফায়াত উপ-সেনাপ্রধানের বাসায় যান এবং দরজা ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুললেন স্বয়ং উপ-সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। একগালে শেভিং ক্রিম লাগানো, আরেকদিক পরিষ্কার। শাফায়েতের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা শুনে বল্লেন ÒSo What? President is dead, Vice President is there. Get your troops readz. Uphold the Constitution’’ অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছে তাতে কি হয়েছে? ভাইস প্রেসিডেন্ট আছেন, তুমি তোর তোমার সৈন্য প্রস্তুত করো, সংবিধান সমুন্নত রাখতে হবে। তিনি খুনিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বল্লেন না। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার ১৯৭৬ সালের ৩০ মে লন্ডনে দি সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে মেজর ফারুক বলেন ১৯৭৫ সালের আগষ্টে আমার ভায়রাভাই মেজর রশিদের প্রস্তাবে খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি করতে একমত হই। তবে আমি জিয়াকে সেনাপ্রধান করার জন্য চাপ দেই। একই বছর ২রা আগষ্ট লন্ডনে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মেজর রশিদ ও মেজর ফারুক ১৫ আগষ্ট হত্যা ষড়যন্ত্রে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার কথা তুলে ধরেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক এ্যান্থনি মাসকারেনন্সের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকাওে ফারুক-রশিদ দুজনে বলেন ১৫ আগষ্ট হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জিয়াউর রহমান আগে থেকে সবকিছু জানতেন। তারা বলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার ৫ মাস আগে ১৫ মার্চ ১৯৭৫ তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে মেজর ফারুক দেখা করেন। মেজর ফারুক সরাসরি বলেন দেশের অবস্থা ভালো না। তারা জুনিয়ররা সরকার পরিবর্তনের জন্য তার সহযোগিতা চান। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেন, একজন সিনিয়র অফিসার হিসাবে তার পক্ষে জড়িত থাকা সম্ভব না। তবে জুনিয়রা এ ব্যাপাওে আগ্রহী হলে অগ্রসর হতে পারে। ফারুক-রশিদের এই সাক্ষাৎকার জিয়ার শাসন আমলে বহুবার প্রচারিত হয়, জিয়া কোনদিন এর প্রতিবাদ করেননি। ঢাকায় ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে এক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধীতে ১৯৯৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেজর ফারুক বলেন জেনারেল জিয়া বিভিন্ন সময়ে মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার ব্যাপারে আমাদের ইনোস্টিগেট (প্ররোচিত) করেছেন। মার্কিন সাংবাদিক লরেন লিফশুলজ কর্ণেল আবু তাহের হত্যা মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে ১৪ মার্চ ২০১১ সালে একটি বিবৃতি দেন। আদালতে তিনি বলেন শেখ মুজিব হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমান পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। জিয়া আগষ্ট অভ্যূত্থানের মুখ্য খেলোয়াড়দের অন্যতম। লিফশুলজ ২০০৫ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছেন মেজর রশিদ এক বৈঠকে প্রশ্ন তুললেন অভ্যূত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব কি হবে? জিয়া ও মোশতাক আলাদাভাবে বল্লেন তারা মার্কিনীদের মনোভাব যেনেছেন এবং দুজনের উত্তর ছিল একই রকমের পজেটিভ। জিয়া ১৫ আগষ্ট এর খুনিদের বিদেশী দূতাবাসে চাকুরী দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ ১৫ আগষ্টে নিহতদের বিচার করা যাবে না বলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে উক্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংসদে পাশের মাধ্যমে আইনে পরিনত হয়। জিয়াউর রহমানের পর সাত্তার, এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এই আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন।

উল্লেখিত তথ্য প্রমানে এটাই প্রমানিত হয় ১৫ আগষ্ট খুনিদের মদদদাতা, আশ্রয়দাতা, প্রশ্রয়দাতা ও পুরষ্কার দাতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। সবশেষে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ ১৫ আগষ্ট নিহত সবার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : সাধারণ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ফুলতলা, খুলনা।