টিকিট কেলেঙ্কারিতে ফাঁসছেন খুলনা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার

সর্বশেষ আপডেটঃ

ঊষার আলো প্রতিবেদক : খুলনা রেলস্টেশনে টিকিট সিন্ডিকেট, নানা অনিয়ম ও স্টেশনের বিভিন্ন বাতি জ্বালানোর জন্য বরাদ্দ তেলের টাকা ভাগাভাগিতে এবার নিজেই ফেঁসেছেন স্টেশন মাস্টার মানিকচন্দ্র সরকার। প্রতি মাসে ১৪০ লিটার কেরোসিন তেলের টাকা ‘স্বচ্ছ পন্থায়’ ব্যয় না করা ও কর্মচারীদের অনুক‚লে বরাদ্দ দু’ ভাগ টিকিটের ‘অস্বচ্ছ বণ্টনের’ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। গত ১২ আগস্ট কমিটি ৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের (পাকশী) সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা-১ মো. সাজেদুল ইসলাম ১৫ সেপ্টেম্বর মানিকচন্দ্র সরকারকে দেওয়া চিঠিতে এ নির্দেশ দিয়েছেন।

জানা যায়, এর আগে ১৬ মে নিয়মবহির্ভূত ভিআইপিদের নামে টিকিট বরাদ্দ নিয়ে উচ্চমূল্যে বাইরে বিক্রির অভিযোগে দু’ সহকারী স্টেশন মাস্টারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রেলওয়ে থানায় জিডি করেন স্টেশন মাস্টার মানিকচন্দ্র সরকার।
এতে বলা হয়- সহকারী স্টেশন মাস্টার আশিক আহম্মেদ ও জাকির হোসেন, শ্রমিক নেতা (টিএক্সআর) বায়তুল ইসলাম, ট্রলিম্যান জাফর ইকবাল এবং তোতা মিয়া সরাসরি টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত। এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে ১৯ মে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মো. শাহীদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত আদেশে সহকারী দু’ স্টেশন মাস্টারসহ শ্রমিক নেতা বায়তুল ইসলাম, জাফর ইকবাল ও স্টেশন মাস্টারের ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠজন’ বলে পরিচিত লোকো খালাসি পপিদুর রহমানকে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে ডিআরএম-পাকশী টিকিট কালোবাজারি দুর্নীতি অনিয়ম তদন্তে গত ৩ জুন তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন।

সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন ডিআরএম-পাকশী বরাবর দাখিল করা হয়েছে। কমিটির আহŸায়ক এইএন-যশোর সহকারী প্রকৌশলী ওয়ালিউল হক তমাল তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- স্টেশন মাস্টার মানিকচন্দ্র সরকার তথ্য আলামত ছাড়া সহকারী স্টেশন মাস্টারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে জিডি করে রেলওয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন। রেলওয়ে স্টেশনের জন্য বরাদ্দ ১৪০ লিটার কেরোসিনের মূল্য বাবদ প্রতি মাসে ১১ হাজার ২০০ টাকা মানিকচন্দ্র সরকার উত্তোলন করেছেন ও স্বচ্ছ পন্থায় তা ব্যয় করা হয়নি। রেলওয়ে কর্মচারীদের অনুক‚লে দু’ভাগ সংরক্ষিত টিকিট অস্বচ্ছভাবে বণ্টন করেছেন। এদিকে তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিবেদন দাখিলের পর বদলি করা দু’ সহকারী স্টেশন মাস্টার আশিক আহম্মেদকে খুলনা জংশনে ও জাকির হোসেনকে বেনাপোল স্টেশনে, বায়তুল ইসলামকে বেনাপোল ও জাফর ইকবালকে খুলনা স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহŸায়ক সহকারী প্রকৌশলী ওয়ালিউল হক তমাল জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে রেলওয়ের যে কর্মকর্তার নামে টিকিট বরাদ্দ হচ্ছে তাঁকে ফোন দিয়ে যাচাই করা ও দায়িত্বরত অবস্থায় বুকিং ক্লার্কদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার নিরুৎসাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা নেবেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কালক্ষেপন করছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি টিকিট কালোবাজারি রোধে পাঁচটি সুপারিশমালা পেশ করেন। সুপারিশগুলো হচ্ছে-টিকিট যার, ভ্রমন তার নিশ্চিত করা, প্রত্যেক বুকিং ক্লার্ক কর্তৃক টিকিট ইস্যু করার সময় ন্যাশনাল আইডি কার্ড-এর ফটো কপি সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। সংগৃহীত ফটোকপিতে উক্ত টিকিট প্রার্থীর জন্য প্রদানকৃত ট্রেনের নাম্বার, ভ্রমণের তারিখ এবং আসন নাম্বার লিখে রাখতে হবে। টিকিট কাউন্টারের বাইরের অংশে সিটিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। দায়িত্বরত অবস্থায় বুকিং ক্লার্কগণ কর্তৃক ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার রহিত করতে হবে। যে সকল স্টেশনে কম্পিউটারাইজড টিকিট সিস্টেম চালু আছে সে সকল স্টেশনেসমূহে ২% রক্ষিত টিকিটের সুষ্ঠুবন্টন নিশ্চিত কল্পে সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টার এবং অন্য বিভাগীয় আরো ততোধীক কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রত্যহ বিকেলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারের কাছে আগতদের তালিকা যাচাই বাছাই পূর্বক অনুমোদনের জন্য দায়িত্বরত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করবেন।

স্টেশন মাস্টার মানিকচন্দ্র সরকার জানান, খুলনায় টিকিট কালোবাজারি বন্ধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তিনি জিডি করেছিলেন। এখন তাঁকেই ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। এত দিন তেলের বরাদ্দের টাকা নিয়ে কোনো কথা হয়নি, কিন্তু টিকিট সিন্ডিকেটের বিষয় ধামাচাপা দিতে এ ঘটনা সামনে আনা হয়েছে।

রেলওয়ে জেনারেল ম্যানেজার (রাজশাহী) অসীম কুমার তালুকদার বলেন, ষ্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকারের ওপর কড়া নজরদারী করা হচ্ছে। তার বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। প্রতিবেদনের ৮০% সুপারিশ স্টেশনে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকী ২০ ভাগ বাস্তবায়নে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।