ঊষার আলো রিপোর্ট : ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো পৃথিবীব্যাপী তামাক মহামারীর কারণে সৃষ্ট সংকট ও মৃত্যুর হার পর্যালোচনা করে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। ১৯৮৮ সাল থেকে দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশেও দিবসটিকে ঘিরে থাকে নানা আয়োজন। গত বছর থেকে করোনা মহামারীর কারণে সেভাবে বাইরে কোন কর্মসূচি পালন করা সম্ভব না হলেও ভার্চুয়ালী সীমিত পরিসরে সরকার এবং তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো দিবসটির উদ্দেশ্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালনে অন্যতম উদ্দেশ্য নিকোটিন উৎপাদনকারী কোম্পানীর তরুনদের তামাকের দিকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা সম্পর্কে অবহিত করা এবং তামাকের ক্ষতিকর স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরীর বিষয়টি জনগনের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। তামাক সেবনের কারণে সৃষ্ট রোগ ও মৃত্যু হার কমিয়ে আনাও দিবসটি পালনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এবছর ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে “Commit to Quit.” বাংলায় সরকারীভাবে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “ আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাচাতে তামাক ছাড়ি”।
তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত এবং প্রতিষ্ঠিত। তামাকের কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ এবং অন্যান্য অনেকগুরো দুর্বল রোগ হয়। যার ফলে প্রতিবছর লক্ষ-লক্ষ লোক অকালে মারা যায় এবং অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে। এধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করা জরুরী।
কোভিড ১৯ মহামারীর প্রকোপ থেকে সুরক্ষার জন্যও তামাক ছাড়া অত্যন্ত জরুরী। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে অধূমপায়ীর তুলনায় একজন ধূমপায়ীর কোভিড আক্রান্তে ঝুঁকি ১৪গুণ বেশী এবং মৃত্যু ঝুঁকিও বেশী। কোভিড ১৯ শ্বাসযন্ত্রের মারাত্বক ক্ষতি করে। তামাক ব্যবহার কোভিডে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এটিই সঠিক সময় তামাক ত্যাগ করার। কিন্তু আসক্তি তৈরী করা পদার্থ নিকোটিন তামাক ছাড়ার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্চ হয়ে দেখা দিতে পারে। যখন বিশ্বব্যাপী ১.৩ বিলিয়ন তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬০% তামাক ব্যবহার ছেড়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, এমন অবস্থায় মাত্র ৩০% কে পেশাদারভাবে সহায়তা করা সম্ভব হয়েছে। একারণে তামাক ছাড়তে আগ্রহীদের সহায়তা করা জরুরী। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য “Commit to Quit.” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত প্রচারাভিযানের লক্ষ্য তামাক ছাড়তে আগ্রহী মানুষদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরী করা। ১০০ মিলিয়ন মানুষকে তামাক ছেড়ে দিতে সহায়তা করা। আর দেরী নয়, আজই প্রতিজ্ঞা করুন, তামাক ছেড়ে দিন।
তামাকের মতো ক্ষতিকর পণ্য ছেড়ে দেবার জন্য শতাধিক যুক্তি রয়েছে। তামাক ছেড়ে দেয়ার সুবিধা প্রায় তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়। ধূমপান ছাড়ার মাত্র ২০ মিনিট পরে হার্টের ড্রপের হার কমবে। ১২ ঘন্টার মধ্যে, রক্তে কার্বন মনোক্সাইড স্তরটি স্বাভাবিক হয়ে যায়। ২-১২ সপ্তাহের মধ্যে, রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয় এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায। ১-৯ মাসের মধ্যে কাশি এবং শ্বাসকষ্ট হ্রাস পায। ৫-১৫ বছরের মধ্যে অধূমপায়ীর স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পায়। ১০ বছরের মধ্যে, ফুসফুস ক্যান্সারের মৃত্যুর হার ধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। ১৫ বছরের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি অধূমপায়ীর মতো কমে আসে। তামাক শুধু স্বাস্থ্যর ক্ষতি করে তা নয়। এটি অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা ব্যয় করতে গিয়ে অনেক পরিবার দরিদ্রতার সম্মুখীন হন। তামাক এমন একটি পণ্য যা তার ভোক্তাকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এগুলো ছাড়াও তামাক ছেড়ে দেয়ার জন্য আরো বহু যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।
অধিক হারে তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও ঝুঁিকতে রয়েছে। গ্লোবাল এডাল্ট টোবাকো সার্ভে ২০১৭ এর তথ্যানুসারে দেশের ৩৫.৩% (৩৭.৮বিলিয়ন) প্রাপ্তবংস্ক জনগোষ্ঠী তামাক সেবন করে। তামাকজনিত ব্যধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সুতরাং যে পণ্যের ক্ষতি ছাড়া কোন ভালো দিক নেই সেটি পরিত্যাজ্য হওয়াই বাঞ্চনীয়। এসকল কারনে তামাক ত্যাগ করার জন্য আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাঁচাতে তামাক ছাড়ি।
লেখক : সৈয়দা অনন্যা রহমান, কর্মসূচী ব্যবস্থাপক, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট
(ঊষারা আলো-এমএনএস)
