UsharAlo logo
, |

রপ্তানি বাড়লেও পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পিছিয়ে, বাড়ছে অসন্তোষ

Mohon Chowdhury
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১২:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নিজস্ব প্রতিবেদক: নানা সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। তবে রপ্তানি আয় ও ব্যবসার পরিধি বাড়লেও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পোশাকশ্রমিকেরা।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্ক—এই সাত দেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এই মজুরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০১ ডলার।

এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। তবে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, সময়মতো মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা, কম দামের পোশাক এবং সীমিত মুনাফার কারণে মজুরি বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের মতে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খাবারের খরচ কমানো এবং সংসার চালাতে ঋণগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।

অন্যদিকে নানা সংকটের মধ্যেও দেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ শিল্প। ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর এ খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৮২ কোটি মার্কিন ডলার।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের হিস্যা ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের হিস্যা ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভিয়েতনামের ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৩ শতাংশ এবং তুরস্কের ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের করসুবিধা ও প্রণোদনা পেয়ে আসছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত করপোরেট কর বাবদ ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ছাড় পেয়েছে। সাধারণ পোশাক কারখানার করপোরেট করহার ১২ শতাংশ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ। পাশাপাশি নগদ সহায়তা ও বন্ড সুবিধাও ভোগ করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকদের জীবনমান ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিল্পের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ, সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবি জোরালো হচ্ছে।

ঊআ-মোচৌ