ঊষার আলো প্রতিবেদক : খুলনায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ধাক্কায় উপকূল অঞ্চলে সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের ১শ’ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, সাত হাজার মৎস্য ঘের, অর্ধলক্ষাধিক বাড়িঘর ও ফসলি জমি।
কয়রা-পাইকগাছার সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। বাঁধ মেরামতে সহযোগিতা করা হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী শুক্রবার (২৯ মে) সোলাদানা ইউনিয়নের নুনিয়াপাড়া, পতন, পারিশামারি, বেতবুনিয়াসহ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় বেড়িবাঁধ মেরামত কাজ তদারকি ও আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন তারা।
ইউএনও খালিদ হোসেন বলেন, ১০ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় কমবেশি অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২৬ মে ঝড়ের পর এলাকার বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। ২৭ মে’র জোয়ারে কয়েক এলাকা নতুনভাবে প্লাবিত হওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়। তবে আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারব।
কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহা. হুমায়ুন কবির বলেন, ভেঙে যাওয়া বাঁধের মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ির পবনা, দশহালিয়া ও উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরগেরি বাঁধ এখনও বাঁধা সম্ভব হয়নি। তবে দক্ষিণ বেদকাশি ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া বাঁধ কোনো রকম বাঁধা গেছে। তবে এসব বাঁধ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন।
উপজেলা কয়রার চারটি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে লোনা পানিতে। কপোতাক্ষ, কয়রা, শাকবাড়িয়া নদীর পানি ৬-৭ ফিট বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার ১১ স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ উপচে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। লোনা পানি ঢুকে ফসলি জমি, মৎস্য, গবাদিপশুসহ প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন জানায়।
এর মধ্যে মৎস্য ঘের ডুবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। দুই হাজার ৫৫০ ঘের ও পুকুর ডুবে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে। দশহালিয়ার তিন কিলোমিটার, মঠবাড়ি, তেতুলতলার চর, আংটিহারা, মঠবাড়ি, গোবরা ঘাটাখালী, কয়রা সদরের তহশিল অফিস সংলগ্ন বেড়িবাঁধ, কাটকাটা, কাশির হাটখোলা, কাটমারচর, ২ নম্বর কয়রা, ৪ নম্বর কয়রা, পবনা, কাশির খালের গোড়া, হোগলা, উত্তর বেদকাশি গাতির ঘেরি, শাকবাড়িয়া, সুতির অফিস, নয়ানি, খোড়লকাটি, জোড়শিংসহ কয়েক স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকেছে।
মহারাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দশহালিয়া গ্রামে স্বেচ্ছাসেবীরা ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামত করেছিলেন। কিন্তু বেড়িবাঁধের অসংখ্য জায়গা ভেঙে প্লাবিত হয় লোকালয়। বাঁধ সংস্কারের জন্য চেষ্টা করেও যথাসময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কাজের অনুমতি না পাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নূরুল ইসলাম বলেন, শাকবাড়িয়া নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কাটকাটা, কাটমারচর, কাশির হাটখোলা, হরিয়ারপুর গাতির ঘেরি এলাকা দিয়ে পানি ঢুকে চিংড়ি ঘের ভেসে যায়।
মহারাজপুরের পশ্চিম দেয়াড়া একতা সংঘের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন বলেন, আম্পানের ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি মানুষ। এরপর আবার প্লাবিত হলো। কয়রাবাসীকে রক্ষা করতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাগর হোসেন সৈকত বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে ৩৫ গ্রাম প্লাবিত হয়। এরপরে আরও কয়েক গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। ৩৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করেছি আমরা।
তিনি বলেন, উপজেলার সাত ইউনিয়নের কমবেশি সব এলাকায় ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘর ভেঙে গেছে। কিছু এলাকায় ঘরের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা সাত হাজার ৫০। এর মধ্যে ৫০ ঘর সম্পূর্ণ, এক হাজার ২শ’ আংশিক ও পাঁচ হাজার ৮শ’ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।
উপজেলা (ভারপ্রাপ্ত) মৎস্য কর্মকর্তা এসএম আলাউদ্দিন হোসেন বলেন, জরিপ অনুযায়ী প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর মৎস্য ঘের ও পুকুর প্লাবিত হয়েছে। চাষিদের ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি টাকার বেশি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, বাঁধ বাঁধার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে অনেক বাঁধ মেরামত সম্ভব হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করা হবে।
সদর ইউনিয়নের লঞ্চঘাট এলাকার আব্দুল গণি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক দফায় ঘর ভেঙেছে। আম্পানেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। আশপাশে সাইক্লোন শেল্টার না থাকায় আমাদের বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে হয়।
পাইকগাছার সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুল মান্নান গাজী বলেন, ২৬ মে সোলাদানা ইউনিয়নের কয়েক স্থানের বাঁধ ভেঙে সোলাদানা বাজার, চার আবাসনসহ ইউনিয়নের কয়েক এলাকা প্লাবিত হয়। ২৭ মে হরিখালী এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে আরও কয়েক এলাকা প্লাবিত হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইমরুল কায়েস বলেন, ২৬ মে’র চেয়ে ২৭ মে নদীর পানি কয়েক ফুট বৃদ্ধি পায়। এতে লতা ইউনিয়নের কাঠামারি এলাকার বাঁধ ভেঙে কয়েক গ্রাম প্লাবিত হয়।
পাইকগাছার সিপিপি টিম লিডার ইব্রাহীম সানা বলেন, ২৭ মে দুপুরে বোয়ালিয়া সেতু সংলগ্ন রাড়ুলী ইউনিয়নের কয়েক গ্রামে লোনা পানি ঢোকে। মালোপাড়ার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কপিলমুনি ইউনিয়নের আগড়ঘাটা বাজার সংলগ্ন পদ্মপুকুর এলাকার বাঁধ ভেঙে কয়েক গ্রাম প্লাবিত হয়। পৌরসভার শহররক্ষা বাঁধ উপচে থানার সামনের চত্বরসহ পৌর বাজারের কয়েক স্থান তলিয়ে যায়।
পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১০ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার ৮৬ কিলোমিটার রাস্তা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ এবং ২৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬৬০ হেক্টর চিংড়ি ঘের তলিয়ে এক কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। প্লাবিত এলাকায় ভেঙে পড়ে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। সবমিলে দুই কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১০ হাজার।
সোলাদানা ইউনিয়নের কয়েকটি আবাসন প্রকল্পের কয়েকশ’ পরিবার পানিতে বসবাস করছে। রাস্তাঘাট, পুকুর জলাশয়, নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে মানুষ।
পতন আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা সালমা বেগম বলেন, আমাদের জীবনযাপন এখন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে মিশে গেছে। জোয়ার হলেই ঘরের ভেতর ২-৩ ফুট পানি বৃদ্ধি পায়। আমরা সরকারের কাছে ত্রাণ চাই না, বাঁধগুলো টেকসই করা হোক।
ভ্যাকটমারি গ্রামের মমতাজ বেগম বলেন, ওয়াপদার সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে পরিবার নিয়ে কোনো রকমে বসবাস করছিলাম। ঘূর্ণিঝড় ঘরটা নিয়ে গেছে।
ডুমুরিয়ায় প্রায় দেড় হাজার ঘের প্লাবিত হয়। বাঁধ উপচে ও স্লুইসগেট দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে মাগুরাখালি, শরাফপুর, শোভনা, সাহস, খর্নিয়া, রুদাঘোরা ইউনিয়নের চিংড়ি ও মাছের ঘের ভেসে গেছে।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ছয় ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের দুই হাজার ৬৫০ ঘের ভেসে গেছে। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দাকোপ উপজেলায় ২শ’ হেক্টর মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। ৩৪ কিলোমিটার সড়ক, ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, ১৫ মসজিদ, পাঁচ মন্দির, দুই হাজার ৮২৮ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলে ১১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতির হিসাব করেছে উপজেলা প্রশাসন।
বানীশান্তা, লাউডোব, বাজুয়া, কৈলাশগঞ্জ ও দাকোপ ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা চেয়ারম্যান মুনসুর আলী খান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু বিশ্বাস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের। তারা বানীশান্তা যৌনপল্লীর অধিবাসীসহ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ত্রাণ শাখা সূত্রে জানা যায়, সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবী ৮-৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৫শ’, ৩-৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫০, নলিয়ান ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ২৭৫ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২০৫ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কামারখোলা ইউনিয়নের কালিনগর বাজারের ২২০ ও জালিয়াখালীর ৪৬ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানখালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা পিচের মাথা, জাবেরের খেয়াঘাট, পুরাতন ফেরিঘাট, মৌখালী এবং খোনা ওয়াপদার বাইরের ২১০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের ৩২, বাজুয়া ইউনিয়নের ৫৫, লাউডোব ইউনিয়নের ১৫, দাকোপ ইউনিয়নের সাহেবের আবাদ গ্রামের ১০, চালনা পৌরসভার ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বানীশান্তা ইউনিয়নের বানীশান্তা বাজার, ব্রথেল, রেখারি ওয়াপদার বাইরে বসবাসরত ৪৫০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(ঊষার আলো-এমএনএস)
