UsharAlo logo
, |

নতুন সরকারের সামনে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কঠিন চ্যালেঞ্জ

ঊষার আলো ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬ ১২:৫৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশে রমজান মাসের আগমন সবসময়ই আধ্যাত্মিক উৎসবের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও নিয়ে আসে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। ২০২৬ সালের রমজান, যা ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হতে যাচ্ছে, নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর গঠিত এই সরকারকে বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব, আমদানি ব্যবস্থার জটিলতা এবং চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশের সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বরের তুলনায় বেশি। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতিও বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা রমজানের আগে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ইতোমধ্যে তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে এবং রমজানের চাহিদা বাড়লে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও গত বছরের তুলনায় আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে, তবুও বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

রমজানের অন্যতম প্রধান পণ্য খেজুরের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকার গত ডিসেম্বরে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করলেও বাজারে এর প্রভাব তেমন দেখা যায়নি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানের খেজুর বর্তমানে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাজারে জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা, ডাব্বাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা, বরই খেজুর ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা এবং সুক্কারি ৮০০ টাকা প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া ছোলা, ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, মশলা ও মাংসের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৬০ টাকা, চিনি ১০০ টাকা, স্থানীয় রসুন ১২০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানে ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টনে পৌঁছায়, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেট বলতে ব্যবসায়ীদের এমন একটি সংগঠিত চক্রকে বোঝায়, যারা পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আমদানি বাড়লেও বাজারে পণ্য মজুত করে রাখা, সরবরাহ আটকে রাখা এবং সমন্বিতভাবে মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হয়। চাল, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এই ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ের কারণে এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, যা রমজানের মতো সময়ে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা, অ্যান্টি-কার্টেল টাস্কফোর্স গঠন, আকস্মিক অভিযান পরিচালনা, সরবরাহ চেইনের নিয়মিত মনিটরিং এবং হোর্ডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ। পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, কৃষকদের সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ বৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার ইতোমধ্যে আমদানি বৃদ্ধি, শুল্ক হ্রাস এবং বন্দরে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে মূল্য নিয়ন্ত্রণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সার্বিকভাবে, রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার যদি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সফল হয়, তাহলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। অন্যথায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ঊআ- এসডি