UsharAlo logo
, |

তামাক নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী অগ্রগতি: ২০২৫ সালের সংশোধনী আইন কেন সময়োপযোগী

ঊষার আলো ডেস্ক
জানুয়ারি ৮, ২০২৬ ৭:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন হিসেবে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। ২০১৩ সালের সংশোধনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলেও সময়ের ব্যবধানে নতুন ধরনের তামাক ও নিকোটিন পণ্যের বিস্তার, বিজ্ঞাপনের ধরন পরিবর্তন এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আইনটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই বাস্তবতায় ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটির ব্যাপক ও কাঠামোগত সংশোধন আনা হয়েছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০০৫ সালের আইন এবং ২০১৩ সালের সংশোধনীতে পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য জরিমানা ছিল যথাক্রমে ৫০ টাকা ও ৩০০ টাকা, যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির তুলনায় অত্যন্ত কম বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছিল। তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকলেও ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্মসহ নতুন ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কঠোর বিধান ছিল না। একইভাবে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, পাউচ বা হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের মতো নতুন পণ্যের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তিমূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

২০২৫ সালের সংশোধনীতে প্রথমবারের মতো ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট ও অন্যান্য ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টের ব্যক্তিগত ব্যবহার সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন ধারা ৬গ অনুযায়ী, এসব পণ্য ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পূর্বের আইনে এসব পণ্যের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতার বাইরে থাকায় এই সংযোজন একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।

নতুন আইনে ই-সিগারেট ও ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্ট উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় বা পরিবহণের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কোম্পানির ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর—ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি এবং লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ২০১৩ সালের আইনে ছিল না।

২০২৫ সংশোধনীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধান শিশু-কিশোরদের তামাকের সহজলভ্যতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে প্রথমবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন সংশোধনীতে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে ৭৫ শতাংশ জায়গা জুড়ে রঙিন ছবি ও লেখাসংবলিত স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোম্পানির মালিক, ব্যবস্থাপক বা দায়ী ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি এবং উৎপাদন ও বিক্রয় লাইসেন্স বাতিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে—যা করপোরেট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি।

এ ছাড়া পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের জরিমানা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা এবং নিষিদ্ধ স্থানে ধূমপানের জরিমানা ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকে আরও কার্যকর ও নিরুৎসাহমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, যেখানে ২০০৫ ও ২০১৩ সালের আইনে শাস্তির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং নতুন পণ্যের বিষয়ে স্পষ্টতা ছিল না, সেখানে ২০২৫ সালের সংশোধনী আইনটিকে আরও বিস্তৃত, কঠোর ও যুগোপযোগী করেছে। ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও কোম্পানি—সব পর্যায়েই শাস্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্ত বার্তা বহন করে।

বর্তমানে অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়া এই সংশোধনীকে স্থায়ী ও পূর্ণ কার্যকর করতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনটি দ্রুত অনুমোদন দেওয়া জরুরি। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশু-কিশোরদের তামাক আসক্তি থেকে রক্ষা এবং নতুন নিকোটিন পণ্যের বিস্তার রোধে এই আইন বিলম্ব ছাড়াই সংসদে পাস হওয়াই সময়ের অপরিহার্য দাবি।

ঊআ-মোহন চৌধুরী