মো. আশিকুর রহমান : রেল ক্রসিং সম্মুখে কোনো সাইনবোর্ড বা প্যানায় ‘মনে হয়নি ট্রেন আসছে’- শব্দটি কবলমাত্র ব্যবহার করা হয়েছে সাবধান বা সচেতন থাকতে তবুও মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে, কেউ হেডফোনে গান শুনতে শুনতে, কেউ আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডান বা বামে না তাকিয়ে হুটহাট করে রেল ক্রসিং পারাপার হতে গিয়ে হরহামেশাই চোখের সামনে মুর্হুতের মধ্যেই ঘটে ঘটে যায় বড়সড় দুর্ঘটনা, এমনকি ঝড়ে পড়ে তাজা প্রাণও, এই নজির নতুন নয়। তারপরও যেন কিছুতেই থামছে না ঝুঁকি নিয়ে রেলক্রসিং পারাপারের দৃশ্য।
মহানগর খুলনার বেশ কয়েকটি লেভেল ক্রসিং দিয়ে এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে অফিস-আদালতগামী কর্মব্যস্ত মানুষ, স্কুল কলেজ শিক্ষার্থী, বাজারে আসা ক্রেতা সহ ছোট-বড় যানবাহন। কর্মব্যস্ততা এতই বেশি, জীবন যেন প্রশ্নবিদ্ধ? ফলে সময় বাঁচানোর নামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অধিকাংশই পার হচ্ছেন রেলক্রসিং। প্রতিদিনই এমন ঝুঁকিপূর্ন পারাপারের কারণে যে কোন মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে জানা সত্ত্বেও সামান্য সচেতনা কাউকে স্পর্শ করেনি।
সরেজমিনে, নগরীর রেল কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট এ লেভেল ক্রসিংয়ে সিগন্যাল বার ও গেটম্যান থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেই সিগন্যাল বার বা গেট ম্যান। যার মধ্যে সরকারি বিএল কলেজ সম্মুখ রেলক্রসিং ( যদিও এটি একটি রেলের স্ট্রেবেজ বা স্টেশন), দৌলতপুর বাজার কাঁচা বাজার সংলঘœ, দৌলতপুর রেলস্টেশনের ওভারব্রীজ থাকা সত্ত্বেও রেল ক্রসিং দিয়ে অবাদে পারাপার, মানিকতলা রাজ্জাক সাহেবের গোডাউনের বিপরীতে খুলনা-যশোর মহাসড়কে পূর্ব পাশের ফুলবাড়ীগেট মাইলপোস্ট, বাদামতলার ভাঙ্গাগেট, শিরোমনি আলীম মাদরাসা, শিরোমনি তেতুলতলা, আফিলগেট চেকপোষ্ট সংলগ্ন মশিয়ালী, পথেরবাজার রেলক্রসিং চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম এই রেলক্রসিং দিয়ে অবাদে ছোট ছোট যানবহন, স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্রছাত্রী, সর্বস্তরের মানুষ ইচ্ছা স্বাধীন পায়ে হেটে পার হচ্ছেন। ট্রেন আসছে দেখেও অবলীলায় এই সকল স্থান ভয়ডর ছাড়াই রেলক্রসিং পার হচ্ছেন তারা। মাত্র কয়েক হাত দূরে ট্রেন দেখেও হুটহাট পার হচ্ছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আলামিন জানান, রেল কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট এই লেভেল ক্রসিংয়ে সিগন্যাল বার ও গেটম্যান থাকলেও দ্রুত ক্রসিং পারাপারের নেশায় সর্বস্তরের মানুষ সহ যানবহন মরিয়া হয়ে উঠে। যে কারণে হঠাৎ দৌড় দেওয়ার কারণে পড়ে দুর্ঘটনার কবলে। একশ্রেণির মানুষ আছে যারা আতঙ্কের মধ্যে লেভেলক্রসিং পার হয়ে থাকে।
ফুলবাড়ীগেট মাইল পোস্ট সংলঘœ এলাকার এক পথচারী জানান, এখানে লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান ও সিগন্যাল বারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সংশ্লিষ্টরা গুরুত্ব দিচ্ছে না। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে আমাদেরকে লেভেল ক্রসিং দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএল কলেজ শিক্ষার্থী জানান, বিএল কলেজ সম্মুখের রেল ক্রসিংটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে সর্বক্ষন রিপন আহমেদ বলেন, এখান দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই এ ধরনের চিত্র আমাদের চোখে পড়ে। মানুষ দ্রুত পার হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে পার হতে চায়। আর এ তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে নানা ধরনের দুর্ঘটনা।
স্থানীয়রা আরো জানান, একটি শহরের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রেলপথ। আর রেল বাহনের অংশ হলো রেল ক্রসিং। এই রেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিনই শত শত মানুষ চলাচল করে প্রাণকেন্দ্রে। পাশাপাশি এসব এলাকা থেকে কাজ শেষে প্রতিদিন নগরবাসি নিজ বাড়িতে ফিরেন এ রেল ক্রসিং পার হয়ে। কিন্তু এই রেল ক্রসিংয়ে ঝুকিপূণ ভাবে চলাচল করছে সর্বস্তরের মানুষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেভেল ক্রসিংয়ের লাইনম্যান বলেন, পথচারীরা সচেতন না হলে আমরা কী করতে পারি? আপনি তো দেখলেন, প্রতিবন্ধক নামানোর পরও যে যার মতো ক্রসিং পার হচ্ছে। কয়জনকে থামানো যায়?
খুলনা রেলওয়ে সুত্রে জানা যায়, যেসব ক্রসিং অবৈধ সেগুলোতে নিজ দায়িত্বে পার হওয়ার মতো সতর্কীকরণ সাইনবোর্ডে দেয়া থাকে। ওইসব রেলক্রসিং দিয়ে সাধারণ পথচারী তাদের নিজের দায়িত্বে দুইপাশ ভালোভাবে দেখে পার হতে হবে। এসব দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে রেলওয়ের কোনো ধরণের দায়ভার থাকে না।
উল্লেখ্য, নগরীর খানজাহান আলী থানার শিরোমনি তেতুলতলা সড়ক রেলক্রসিং ইজিবাইক যোগে পার হবার সময়ে ২০১৯ সালে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে এতে কেএমপি’র নারী কনস্টেবল সাথী আক্তারের মা দুলি বেগম ও সাথীর ৩ বছরের শিশু কন্যার ঘটনাস্থলে মারা যান। এই ঘটনার প্রায় দু’বছর অতিবাহিত হলেও সেখানে আজও গেটম্যান নিয়োগ করা হয়নি বলে জানান এলাকাবাসী। এছাড়া গত বছরের ১০ নভেম্বর আটরা শিল্প এলাকার আফিল গেটে মর্জিনা ও শেফালী নামে দুইনারী ট্রেনে কেটে ঘটনাস্থলে মারা যায় । একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নগরীর ফুলবাড়ীগেট এলাকায় ট্রেনে কেটে মারা যান আনোয়োর হোসেন ভোলা নামে এক ব্যক্তি।
খুলনা রেলওয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। রেলপথ মানুষের চলাচলের জন্য নয়। রেলের সব গেটে সাবধানতা চিহ্ন দেয়া থাকে। রেলপথ এলাকায় বেড়া দেয়া থাকে। এসব বেড়া ভেঙেও লোকজন প্রবেশ করে। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ থেকে বিরত থাকতে হবে। রেল লাইন আছে এমন এলাকাতে সতর্ক হয়ে চলাচল করার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
