ঊষার আলো ডেস্ক : টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়–য়া অন্তু রায়ের আত্মহননের দৃশ্যমান কারণ অর্থাভাব; এই অভাবের কথা আগে জানতেন স্বজনেরা, হয়তো দু’-একজন সহপাঠী বন্ধুও জানতেন। তবে এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেরও অনেকে জানে যে, মূলত: অর্থাভাবে অন্তু আত্মহত্যা করেছে। অন্তুর একটি ছোট বোন আছে। চৈতি রায়। তিনি এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাঁর লেখাপড়া যাতে নির্বিঘেœ চলতে পারে সে-কারণে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে দেশের খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা।
এই গ্রুপের অন্যতম প্রকাশনা দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর পাঠক সংগঠন শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ শুক্রবার (৮ এপ্রিল) প্রয়াতের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পিতা-মাতার সাথে দেখা করে বসুন্ধরা শিল্পগ্রুপের এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সেই সাথে নগদ সহায়তাও তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ বেলা এগারোটার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া গ্রামে প্রয়াত অন্তু রায়ের বাড়িতে যান। গুটুদিয়া বাসস্টান্ড হতে মাইলখানেক পশ্চিমে তাঁদের বাড়ি। প্রবেশ করার রাস্তার ডাইনে একঠি ছোট্ট ঘর। তার একপাশে রান্নার আয়োজন, একপাশে কেউ কেউ রাতও কাটান। তারই পাশে দক্ষিণমুখো একটি দোচলা কাঁচা ঘর। গোলপাতা ও টিনের ছাউনি। বারান্দাসহ আনুমানিক ১২ হাত প্রস্থ, পনেরো হাত দৈর্ঘ্যরে ঘরটিতে চাচ (দড়মা) দিয়ে ভাগ করে তিনটি কক্ষ তৈরি করা। এতেই অন্তুর বাপ-কাকাদের চারটি পরিবার বসবাস করেন।
তার সামনে এক চিলতে উঠোন। সেই উঠোনে বসেই অন্তুর মা গীতা রায় বিলাপ করছিলেন, ‘আমার বাবা (অন্তু) আমারে ছাইড়ে চইলে গেছে।’ তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন অন্তুর মেঝ মা (কাকিমা)। আশেপাশের বাড়ির আরও কয়েকজন নারী সদস্য ছিলেন। কারও মুখে কোন কথা নেই। সবারই মুখ থমথমে। মাঝে মাঝেই অন্তুর মায়ের বিলাপ ধ্বনি গোটা বাড়িটির নিরবতা ভেঙ্গে খানখান করে ভেঙ্গে পড়ছিল।
শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু সাঈদ খান তাঁর (অন্তুর মা) সাথে কথা বলতে গেলে তিনি হাইমাউ করে কেঁদে ওঠেন। প্রতিনিধি দলটির পক্ষ হতে কালের কণ্ঠ খুলনা ব্যুরো প্রধান গৌরাঙ্গ নন্দী অন্তুর বাবা-মাকে জানান, তাঁদের কন্যা চৈতি রায়ের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে বসুন্ধরা গ্রুপ সহায়তা করতে চেয়েছে। তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তা ছাড়াও প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিকাশ একাউন্টের মাধ্যমে তাঁদের কাছে পৌঁছে যাবে। নগদ সহায়তার পাঁচ হাজার টাকা অন্তুর বাবা-মা’র হাতে তুলে দেন শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখার সভাপতি বিপুল রায় চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু সাঈদ খান, সহ-সভাপতি দয়াল কৃষ্ণ সানা, কাজী মাহবুব রহমান ও নজির আহম্মেদ, যুগ্ম- সাধারণ সম্পাদক কার্তিক রুদ্র দাশ, সদস্য হেদায়েতুল্লাহ, কাজী ফজলে রাব্বী শান্ত ও কালের কণ্ঠ খুলনা ব্যুরোর নিজস্ব প্রতিবেদক কৌশিক দে।
অন্তুরা দুই ভাইবোন, বাবা, মা। নিজেদের মাত্র একটি কক্ষে বোন থাকতো। ঘরে বা বারান্দায় মা-বাবা রাত কাটাতেন। অন্তু বাড়ি এলে দিনের বেলায় ঘরে থাকলেও রাতে তার এক ফুফাতো ভাইয়ের সাথে থাকতো। ৩ এপ্রিল অন্তু বিশ^বিদ্যালয় হতে বাড়িতে আসে। ৪ এপ্রিল সকালে সে বাড়িতেই ছিল। মা-বাবা কাজে চলে যায়। বোনটি যায় পড়তে। ও ঘরেই ছিল। সেই ঘরের দরোজা খোলা রেখেই দরোজার আড়ালে ঘরের আড়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। ছোট বোন চৈতি এসে দেখে তারা দাদা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আছে। অন্তুর বাবা দেবব্রত রায় বলেন, ‘আমরা ধার-দেনা করে ওকে সহযোগিতা করতাম; কিন্তু ওযে আত্মহত্যা করবে এটা বুঝতে পারিনি।’ এর পিছনে অন্য কোন কারণ আছে কি-না, তা তিনি ভাবতে পারছেন না।
তাঁর মা গীতা রায় বলেন, ‘ও (অন্তু) যখন ক্লাস ফাইভি পড়ে তখন থেহে আমি পরের ক্ষেতে কাজ করি; আর দুটো বছর কি আমি ওরে সাহায্য করতি পারতাম না!’
অন্তুর মেঝ মা (চাচী) বলেন, ‘আমরা খুব গরীব। আমরা ক্ষেতে-খামারে কাজ কইরে জীবন কাটাই। ছেলেমেয়েগুলোর যাতে এসব না করতি হয়, তারই চেষ্টা ছিল। অন্তু খুব ভালো ছিল। ওর জন্যি আমাদের বাড়ি অনেক লোক আসতো। কারো বাড়ির ইলেকট্রিকের কোন ঝামেলা হলে অন্তুকে ডাকতো, অনলাইনে কোন ফরম পূরণের জন্যেও ছেলেডারে ডাকতো; সবার কাজ ও হাসিমুখে কইরে দিতো। সেই ছেলেডা আমাইগে ফেইলে চইলে গেলো।’
