ঊষার আলো প্রতিবেদক : খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মায়ের মরদেহ আটকে রেখে দু’ ছেলেকে পুলিশে দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। শনিবার (০৯ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে এলাকাবাসী সড়ক অবোরোধ: করে। পরে আটক দু’ ছেলেকে ছেড়ে দেয়া হয়। মায়ের লাশও দেয়া হয়।
লাশ আটকে রেখে দু’ ছেলেকে পুলিশে দেয়ার প্রতিবাদে সড়ক অবোরোধ, ১৩ ঘণ্টা পর মুক্ত ছেলেরা, পেলো মায়ের লাশও
হাসপাতাল ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নগরীর দৌলতপুরের পাবলা কারিকর পাড়ার মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী পিয়ারুন্নেছা (৫৫) শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে মায়ের মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ এনে ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসানের সঙ্গে বাকবিত-া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে ছেলে মো. মোস্তাকিমের। এ ঘটনায় পিয়ারুন্নেছার অপর দু’ ছেলেকে আটকে রেখে পুলিশের হাতে তুলে দেন চিকিৎসকরা।
রোববার (১০ এপ্রিল) সকালে মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার স্ত্রীর বুকে ব্যাথা ও পায়খানা-প্রসাব না হওয়ায় ৮ এপ্রিল রাতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ১১-১২ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সে রাতে চিকিৎসা করা হয়েছে। শনিবার রাতে আমার স্ত্রীর অবস্থা গুরুতর হলে আমার ছেলে চিকিৎসককে ডাকতে গেলে কেউ আসেননি। উল্টো রোগীকে নিয়ে যেতে বলে। তখন ছেলে বলে রোগীকে কী করে আনব, তিনি তো মোটা মানুষ, আনা সম্ভব নয়। চিকিৎসক তখন কাগজপত্র আনতে বলেন। এরপর কাগজপত্র নিয়ে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসক তা দেখে বলেন, সব তো ঠিক আছে। কিন্তু রোগীকে দেখতে কোনো চিকিৎসক আসেননি। এরপর ওই রাতেই ছটফট করতে করতে আমার স্ত্রী মারা যায়। মায়ের এমন মৃত্যুতে আমার ছেলে মো. মোস্তাকিম গিয়ে চিকিৎসকের কাছে জানতে চায় তারা কেন দেখতে আসলেন না। এ নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয় চিকিৎসকের। আমি বিষয়টি জানতে পেরে চিকিৎসকের হাত-পা ধরে মাফ চাই। বলি আপনারা তো বোঝেন মা মারা গেছে তাই ওদের মাথা ঠিক নেই, আপনারা মাফ করে দেন। এসময় একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক আমার গায়েও আঘাত করেন এবং অপর দুই ছেলে মো. তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকে পুলিশে দেন। তারা বর্তমানে সোনাডাঙ্গা থানায় আটক রয়েছেন। আর আমার স্ত্রীর মরদেহও হাসপাতালে আটকে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামছুদ্দিন আহম্মেদ প্রিন্স এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আসলে তাদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের ভাইপো মামুন বলেন, আমার চাচীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাই মোস্তাকিমের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসান ও তার সঙ্গীদের সামান্য হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় তারা অপর চাচাতো ভাই সাদ্দামকে মেরে জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং মো. তরিকুল ইসলাম কাবিরকে গালাগালি দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। আমরা চাচীর মরদেহের কাছে যেতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেলা ১১টা পর্যন্ত আমাদের ভিতরে যেতে দেয়নি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমি তো পরে এসেছি। আমি ওই ইউনিটের ডাক্তার নই। মনিশ কান্তি দাস ও প্রীতম কর্মকারের সঙ্গে রোগীর স্বজনের হাতাহাতি হয়েছে। আমি ইন্টার্নী চিকিৎসক পরিষদের পক্ষ থেকে এসে কথা বলেছি। আমরা অনেক আগেই মরদেহ ডিসচার্জ করে দিয়েছি। পুলিশ তার ২ ছেলেকে আটক করেছে, এখন তারা তদন্ত করে দেখবে। সেখানে তো আমাদের কিছু করার নেই। ’
আর খুমেক হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, মানুষ মারা গেলে একটি প্রসিকিউট আছে। সে অনুযায়ী মরদেহ ছাড়তে হয়। মরদেহ আটকে রাখার কিছু নেই। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো জিডি বা মামলা করিনি।
অপরদিকে ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামছুদ্দিন আহম্মেদ প্রিন্স বলেন, আমরা অনেক দিক থেকে চেষ্টা করেও মরদেহ ও আটকদের ছাড়াতে ব্যর্থ হই। পরে সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের কাছে যাওয়ার পর তিনি বলেন আইনি ব্যবস্থা নেবে নিক, আগে আটকদের ছেড়ে দাফনের ব্যবস্থা করুক। কিন্তু থানা থেকে ছাড়ছে না। থানায় গেলে পুলিশ বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তো ছাড়তে বলছে না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা মামলা করবে। তাই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলেও কোনো সমাধানে আসতে পারিনি।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রতিবাদ ও সড়ক অবোরোধ করে। অবশেষে সড়ক অবরোধের পর খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত মায়ের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং থানায় আটক দু’ ছেলে মো. তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকেও ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত ৩টায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মায়ের মরদেহ আটকে রেখে দুই ছেলেকে পুলিশে দেয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নগরীর দৌলতপুরের পাবলা কারিকর পাড়ার মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের (৬৭) স্ত্রী পিয়ারুন্নেছা (৫৫) শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে মায়ের মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ এনে ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসানের সঙ্গে বাকবিত-া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে ছেলে মো. মোস্তাকিমের। এ ঘটনায় পিয়ারুন্নেছার অপর দুই ছেলেকে আটকে রেখে পুলিশের হাতে তুলে দেন চিকিৎসকরা।
ঘটনার ১৩ ঘণ্টা পর রোববার (১০ এপ্রিল) বিকেল ৪টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত পিয়ারুন্নেছার লাশ হস্তান্তর করেছে এবং সোনাডাঙ্গা থানায় আটক তার দু’ ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের প্রতিবেশি আলফাত হোসেন লিটন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, মায়ের লাশ ও আটক ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে দুপুর ৩টা থেকে সাড়ে ৩টায় মহানগরীর নতুন রাস্তার মোড়ে খুলনা-ঢাকা মহাসড়ক আধা ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে রেখেছিলাম এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে। সড়ক অবরোধের সময় আটকদের নি:শর্ত মুক্তি ও লাশ ছেড়ে না দিলে দুর্বার আন্দোলনের হুশিয়ারী দেওয়া হয়। এরপর থানা পুলিশ আমাদের ডেকে আটককৃতদের ছেড়ে দিয়েছে। এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ হস্তান্তর করেছে।
এর আগে মৃত পিয়ারুন্নেছার স্বামী মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামছুদ্দিন আহম্মেদ প্রিন্সসহ পরিবারের সদস্যরা খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের কাছে গিয়েও কোন লাভ হয়নি।
মুক্তি পাওয়ার পর মো. তরিকুল ইসলাম কাবির বলেন, রাতে মা ছটফট করতে থাকে। আমার ভাই বার বার যাওয়ার পরও ইন্টার্ন ডাক্তার আসেনি। মাকে সাথে নিয়ে তার রুমে আসতে বলে। হাসপাতালে থাকা অন্যান্য রোগীর স্বজনরা অনেক অনুরোধ করার পর ডাক্তার মাকে দেখতে আসেন। কিন্তু মাতো ততক্ষণে মারা গেছেন। এরপর আমার ছোটভাই উত্তেজিত হয়ে ডাক্তারদের সাথে বাকবিতন্ডায় জাড়ায়। পরে এসে ছোট ভাইয়ের পক্ষ থেকে আমি ও আমার আরেক ঢাকা থেকে আসা অসুস্থ ভাই মাফ চাই। কিন্তু তারা আমার অসুস্থ ভাইটিকেও মারধোর করে। এমনকি আমার বৃদ্ধ বাবাকেও ইন্টার্নী টিকিৎসকরা মারধোর করে। পরে অন্যায়ভাবে আমাদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়। যারা আমার মায়ের ও আমাদের ছাড়ানোর জন্য কষ্ট করেছেন আন্দোলন করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
